রুমেল খান
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬ ২২:১৩ পিএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬ ২২:১৮ পিএম
এএফসি নারী এশিয়ান কাপে মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ম্যাচে প্রতিপক্ষ চীনের মুখোমুখি হওয়ার আগে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল। ছবি : বাফুফে
এই হারে বিন্দুমাত্র
গ্লানি নেই, বরং আছে লড়াই করার মতো একরাশ গর্ব। হ্যাঁ, বলা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় নারী
ফুটবল দলের কথা। এএফসি নারী এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে প্রথমবারের মতো খেলতে নেমেছিল
তারা। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি
স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বি-গ্রুপে নিজেদের প্রথম ঐতিহাসিক ম্যাচে তারা ২-০ গোলে হারে
চীনের (গোলদাতা : ৪৪ মিনিটে ওয়াং শুয়াং এবং ৪৫+১ মিনিটে ঝ্যাং রুই) কাছে। এর আগে
একই গ্রুপের অপর ম্যাচে উত্তর কোরিয়া ৩-০ গোলে হারায় উজবেকিস্তানকে।
নারী আসরে
এবারই প্রথম খেলছে বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিমত্তায়-অভিজ্ঞতায়-সফলতায় যোজন
ব্যবধানে এগিয়ে থাকা চীন, যারা বর্তমান ও রেকর্ড
৯ বারের এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন। তাছাড়া ফিফা র্যাংকিংয়ে এগিয়ে তারা (চীন ১৭, বাংলাদেশ
১১২)। 
‘স্টিল রোজেস’ খ্যাত এমন কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াইটা যে অসম ও একেপশে হতে
যাচ্ছে, এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন ফুটবলবোদ্ধারা। তাছাড়া বাফুফের ‘বিচক্ষণ’ কর্মকতাদের
বদন্যতায় যেহেতু এই আসরে কোনো ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলে প্রস্তুতিও নিতে পারেনি লাল-সবুজ
বাহিনী, সেহেতু হারের ব্যবধানটা যে বিশাল হবে, এমনটাই ছিল অনুমেয়।
কিন্তু তা হয়নি, হতে
দেয়নি ‘বেঙ্গল টাইগ্রেস’ খ্যাত বাংলাদেশ দল। হাজারো
সংকট, অসংখ্য সীমাবদ্ধতা নিয়েও তারা মাঠের সবুজ গালিচায় অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন
করেছে। ছড়িয়েছে মুগ্ধতা, আদায় করেছে প্রতিপক্ষ দলের সমীহ। প্রমাণ করেছে, সীমিত
সামর্থ্য নিয়েও তারা কঠিন প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়তে জানে। মাথা উঁচু করে মাঠ
ছাড়েন বাংলার বাঘিনীরা। 
বাংলাদেশ নির্ধারিত ৯০ মিনিট পজিটিভ ফুটবলই খেলেছে।
প্রথমার্ধের শেষ দুই মিনিট বাদ দিলে পুরো ম্যাচজুড়েই সাহসী ও সংগঠিত ফুটবল খেলেছে তারা।
বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তারের অভিষেক পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ
সেভ করেছেন। মনিকা চাকমা চমৎকার বল নিয়ন্ত্রণ ও ড্রিবলিং দক্ষতা দেখিয়েছেন। দ্বিতীয়ার্ধে
বাংলাদেশ আরও আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করে এবং বেশি পাসিং সুযোগ তৈরি করে। পুরো ম্যাচজুড়ে
দলের সামগ্রিক ফিটনেস ছিল দারুণ। সুইডেনপ্রবাসী ফুটবলার আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীর এই
ম্যাচে অভিষেক হয়েছে। ৮৬ মিনিটে শামসুন্নাহার
জুনিয়রের বদলি হিসেবে মাঠে নামলেও তেমন কিছু করতে পারেননি। 
ম্যাচের
পর সংবাদ সম্মেলনে চীনের কোচ আন্তে মিলিচ বলেন, ‘বাংলাদেশের কয়েকজন ইন্ডিভিজুয়াল
স্কিল ফুটবলার রয়েছে, যেমন মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা এবং ঋতুপর্ণা চাকমা দারুণ
খেলেছে।’ বাংলাদেশের নিয়মিত গোলরক্ষক রূপনা চাকমা। চীনের মতো প্রতিপেক্ষর বিরুদ্ধে
তাকে একাদশেই রাখেননি বাংলাদেশ কোচ পিটার বাটলার (দলীয় সূত্রে জানা গেছে, উচ্চতার
কারণে মিলিকে এই ম্যাচে বেছে নিয়েছেন কোচ)। এতে চাইনিজ কোচ বিস্মিত, ‘বাংলাদেশের
গোলরক্ষক নির্বাচনের সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছি। এই গোলরক্ষকও তাদের মতো (ঋতুপর্ণাদের)
অসাধারণ খেলেছে।’ স্কোরলাইন ও পারফরম্যান্স নিয়ে চাইনিজ কোচ বলেন, ‘বাংলাদেশ ইয়াং
টিম। চাপহীন থেকে ফ্রি খেলেছে। এ রকমই প্রত্যাশা করেছিলাম।’
বাংলাদেশের
গোলপোস্টের সামনে ‘চীনের মহাপ্রাচীর’ বনে যান মিলি। ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার ম্যাচে দল
হেরেছে বটে, কিন্তু মন জয় করে নেন মিলি। ১১টি অন টার্গেট শটের মধ্যে ৯টি শটই
ঠেকিয়েছেন। র্যাঙ্কিংয়ের ৯৫ ধাপ এগিয়ে থাকা দলের বিপক্ষে এমন পারফরম্যান্স
দেখাবেন ১৯ বছর বয়সী গোলরক্ষক, তাও নিজের প্রথম ম্যাচ- একেবারেই অকল্পনীয়।
মিলির
প্রশংসায় তাই ম্যাচ শেষে বাটলার বলেন, ‘বাংলাদেশের নারী ফুটবল গোলকিপিংয়ের দিক
থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ভুগেছে। মিলি অসাধারণ খেলেছে। কিছু ভুল করেছে এবং সামনেও ভুল
করবে, কিন্তু সে অনেক ভালো করেছে। দলে একটা নতুনত্ব আনতে চেয়েছিলাম। এ ধরনের
সিদ্ধান্ত নিতে মোটেও ভয় পাই না।’
মিলির
ভাষ্য, ‘আসলে আমরা এই ম্যাচটার জন্য অনেক পরিশ্রম-কষ্ট করছি। আমি সর্বোচ্চটা দিয়ে
চেষ্টা করছি, সে জন্য আজকে পেরেছি এতগুলো সেভ দিতে। এজন্য ধন্যবাদ দেব গোলকিপার
কোচ উজ্জ্বল স্যারকে।’
বাংলাদেশের
মেয়েরা যে লড়াকু মানসিকতা দেখিয়েছে, তাতে গর্বিত কোচ বাটলার, ‘ম্যাচের আগে মেয়েদের
বলেছিলাম- তারা যেন তাদের সেরাটা দেয়। আমরা এখানে শুধু রক্ষণ সামলাতে আসিনি।
সেভাবে কোচিং করাই না এবং আমার দলও সেভাবে খেলুক, তা চাইনি। মেয়েরা দেশের নাম
উজ্জ্বল করেছে, জার্সির মান রেখেছে। এর মাধ্যমেই বোঝা যায় আমরা কতটা এগিয়েছি।’
বল
পজেশন চীন ৫৯, বাংলাদেশ ৪১। পাস চীনের ৩৭৫টি, বাংলাদেশের ২৫৭টি। পরিসংখ্যানে
বাংলাদেশ হয়তো পিছিয়ে, তবে ৮ বার বিশ্বকাপ খেলা দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই
পরিসংখ্যান যথেষ্ট প্রশংসনীয়। 
চীনকে
৪২ মিনিট পর্যন্ত রুখে দেয় বাংলাদেশ। এটি তাদের রক্ষণভাগের অবিশ্বাস্য উন্নতিরই প্রমাণ।
মিলি যেভাবে ১২ মিনিটে ওয়াং সুয়াংয়ের নিশ্চিত গোল ঠেকান এবং পুরো ম্যাচজুড়ে
সাহসিকতার সঙ্গে গোলপোস্ট আগলে রাখেন, তা ছিল বিস্ময়কর।
বাংলাদেশের
আক্ষেপ ছিল ম্যাচের ১৪ মিনিটে। ঋতুপর্ণার বাঁ পায়ের দূরপাল্লার শট গোলপোস্টে
ঢোকার ঠিক আগমুহূর্তে চীনের গোলকিপার চেন চেন কোনোমতে না ঠেকালে ম্যাচের গল্প অন্যভাবে
লেখা হতো। ম্যাচের ২৪ মিনিটে যখন ওয়াং সুয়াং গোল করলে ভিএআর প্রযুক্তিতে অফসাইড
প্রমাণিত হওয়ায় সেই গোল বাতিল হয়। 
বাংলাদেশ
: মিলি আক্তার, শিউলি আজিম (হালিমা
আক্তার), শামসুন্নাহার সিনিয়র, আফঈদা খন্দকার (অধিনায়ক), কোহাতি কিসকু, নবীরন
খাতুন (স্বপ্না রানী), মারিয়া মান্দা, মনিকা চাকমা, ঋতুপর্ণা চাকমা, উমেহলা মারমা
(তহুরা খাতুন), শামসুন্নাহার জুনিয়র (আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী)।