কাল এশিয়ার সর্বোচ্চ স্তরে চীনের বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অভিষেক
রুমেল খান
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬ ২২:১৩ পিএম
প্রতিপক্ষ চীন ৯৫ ধাপ এগিয়ে, তার ওপর এশিয়ান সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রথম ম্যাচ, তারপরও নিজেদের সর্বোচ্চটা নিংড়ে ভালো ফল করতে দৃঢ়প্রত্যয়ী বাংলার বাঘিনীরা। ছবি : বাফুফে
একদিকে
রেকর্ড ৯ বারের এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন, ১৭ ফিফা র্যাংকিংধারী ও ‘স্টিল রোজেস’ খ্যাত চীন।
অন্যদিকে ২ বারের সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন, ১১২ ফিফা র্যাংকিংধারী ও ‘বেঙ্গল টাইগ্রেস’
খ্যাত বাংলাদেশ। অভিজ্ঞতা-শক্তিমত্তায় দুই দল একেবারেই বিপরীত প্রান্তে। তারপরও চীন
কি না সমীহ করছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শক্তির বাংলাদেশকে! এএফসি নারী এশিয়ান কাপের পর্দা উঠেছে গত রবিবার থেকে। বি-গ্রুপে
থাকা বাংলাদেশ দল কাল মঙ্গলবার (৩ মার্চ) তাদের প্রথম ম্যাচ খেলবে। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী চীন। খেলাটি সিডনির
ওয়েস্টার্ন স্টেডিয়ামে হবে (বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টায়)।
এই
ম্যাচের আগে সোমবার সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন দুই দলের কোচ এবং অধিনায়ক। বাংলাদেশ অধিনায়ক
আফঈদা খন্দকার বলেন, ‘চীন সব দিক দিয়েই ভালো। এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন এবং শক্তিশালী
দল হিসেবে তারা খেলছে। তবে তারা ভালো টিম বলে অবশ্যই মাঠের লড়াইয়ে ছেড়ে দিব না। আমরা
ফাইট করবো, ইনশাআল্লাহ ভালো কিছু হবে।’
আফঈদা
আরও বলেন, ‘চীনের সঙ্গে খেলতে পারাটাও সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাদের থেকে আমরা অনেক কিছু
শিখবো।’ এশিয়ার পরাশক্তি চীনের সঙ্গে এর আগে কখনও খেলেনি বাংলাদেশ। সেক্ষেত্রে তাদের
বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা নতুনই বলা যায়।
বাংলাদেশের
জন্য এশিয়ান মঞ্চটাই আসলে নতুন। এবারই প্রথমবার এশিয়ান কাপে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ায় দারুণ অভিজ্ঞতা হচ্ছে দলের। এ প্রসঙ্গে আফঈদার ভাষ্য, ‘এখানে বেশ
ক’দিন হয়েছে আসছি, সবাই অনেক উপভোগ করছি। পরিবেশ অনেক সুন্দর, প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডগুলা
অনেক সুন্দর।’ এবার মাঠে ভালো কিছু করার অপেক্ষায় ডিফেন্ডার আফঈদা, ‘চেষ্টা থাকবে
অবশ্যই আমরা ভালো কিছু করব। আমাদের প্রতিপক্ষ হচ্ছে চীন, উত্তর কোরিয়া, উজবেকিস্তান।
তারা অনেক শক্তিশালী টিম। আমরা ওদের সঙ্গে সেভাবেই খেলব কোচ আমাদের যেভাবে খেলতে বলবে।
চেষ্টা করব যেন ভালো কিছু করতে পারি।’
গত
বছরের জুলাইয়ে বাছাইপর্বে স্বাগতিক মিয়ানমারকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নারী এশিয়ান কাপের
মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। সে সময় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৭৩ ধাপ এগিয়ে
থাকা দলকে হারানো ছিল অবিশ্বাস্য ঘটনা। বাংলাদেশ কোচ পিটার বাটলারের কাছেও যা ছিল ধারণাতীত।
মিয়ানমারের
মেয়েদের হারানো কতটা কঠিন কাজ ছিল এবং সেটির মাহাত্ম্য কতটা বেশি তা বোঝাতে বাটলার
বলেন, ‘আমরা অনেকটা ‘সিংহের গুহায়’ গিয়ে খেলছিলাম।’ সেই বাংলাদেশ দল এখন অবস্থান করছে
অস্ট্রেলিয়ায়। এই ম্যাচের আগে দলের বর্তমান অবস্থান আর আগের অবস্থান মনে করে বাটলার
বলেন, ‘গুলিস্তানের ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশ দল এখন অস্ট্রেলিয়ায়।’ গুলিস্তানে যদিও বাংলাদেশ
নারী দল কোনো ক্যাম্প করে না। মতিঝিলের বাফুফে ভবনের চার তলায় ক্যাম্পকে বোঝাতে চেয়েছেন
হয়তো। দেশে থাকতে পল্টনের জাতীয় স্টেডিয়াম অনুশীলন করে বাংলাদেশ। স্টেডিয়াম এলাকা
অনেকের কাছেই পরিচিত গুলিস্তান হিসেবে। মনিকারা অনুশীলন করেছেন সিডনির জুবিলি স্টেডিয়ামে।
ছবির মতো সুন্দর এই মাঠ দেখে বাংলাদেশের মেয়েরা অভিভূত। এমনকি বাংলাদেশ দলের ব্রিটিশ
কোচও অস্ট্রেলিয়ার ট্রেনিং মাঠ দেখে জানিয়েছেন তিনি ‘ইউরোপ’ অনুভব করছেন।
বাটলার
বলেন, ‘এটি আমাদের মেয়েদের জন্য অনেকটা বিশ্বকাপের মতো। আপনি যদি নিয়মিত এই পর্যায়ে
খেলতে চান, তবে আপনার দিকে যেসব চ্যালেঞ্জ আসবে সেগুলোর সঙ্গে আপনাকে মানিয়ে নিতে হবে
এবং মোকাবিলা করতে হবে। শুধু মনে করি মাঠে গিয়ে আমাদের নিজেদের খেলাটা খেলতে হবে। আমি
বড় কোনো আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখছি না। আমি এই পেশায় অনেক দিন ধরে আছি। অনেক মহাদেশে
কাজ করেছি। তবে আমি বিশ্বাস করি মাঝেমধ্যে অদ্ভুত বা অলৌকিক কিছু ঘটে যেতে পারে।’ 
পরিকল্পনা
নিয়ে বাটলার বলেন, ‘আমাদের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে। হার, জিত বা ড্র,
যা-ই হোক না কেন, যেভাবে চাই দল সেভাবেই খেলবে। ফলাফল যাই হোক না কেন, আমরা রক্ষণাত্মক
হয়ে ‘বাস পার্ক’ করার মতো দল নই। আমার মনে হয় আন্তে (চীনের কোচ) আমাদের খেলার ধরন এবং
আমার কাজ করার পদ্ধতি সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন। তাদের প্রতি আমার সর্বোচ্চ সম্মান রয়েছে।
সব মিলিয়ে এটি একটি অত্যন্ত কঠিন ম্যাচ হতে যাচ্ছে।’
দলের
সঙ্গে আছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল। তবে অস্ট্রেলিয়া
থেকে তিনি জানিয়েছেন সভাপতি পরিচয়ে নয়, দলের সঙ্গে আছেন একজন সমর্থক হয়ে।
তাবিথ
বলেন, ‘চীন বিশ্বকাপেও খেলে। কিন্তু আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আগামীকাল চীনের সঙ্গে
আমরা ভালো খেলা উপহার দেব। তবে আমি প্রথমে দলের কাছে বলেছি যে এখানে আমি একজন সমর্থক
হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ছুটে এসেছি। সিডনিতে খেলা দেখার জন্য এসেছি।’
২০২৪
সালে দ্বিতীয়বার সাফ জয়ের পর ঘোষিত দেড় কোটি টাকার বোনাস এখনো হাতে পাননি সাফজয়ী নারী
ফুটবলাররা। ঘোষণার পর কেটে গেছে প্রায় ১৬ মাস। সেই অপ্রাপ্তির মধ্যেই চীনের বিপক্ষে
এশিয়ান কাপে ঐতিহাসিক অভিষেক ম্যাচের আগে বাফুফে সভাপতি তাবিথের কাছে নতুন বোনাসের
‘আবদার’ তুলেছেন নারী ফুটবলাররা।
এই
টুর্নামেন্টে ভালো করে সরাসরি বিশ্বকাপ এবং অলিম্পিক বাছাইয়ে খেলার সুযোগ থাকবে দলগুলোর
সামনে। ১২ দলের মধ্যে শীর্ষ ৬দল পাবে বিশ্বকাপের টিকিট। আটে থাকলে মিলতে পারে অলিম্পিকে
খেলার সুযোগ। 
টুর্নামেন্টের
তিনটি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন এবং গ্রুপ রানার্সআপ সরাসরি শেষ আটে জায়গা পাবে। এছাড়াও তিন
গ্রুপ থেকে বেস্ট থার্ড হয়ে আরও দুটি দল যাবে শেষ আটে। বাংলাদেশ দল পাখির চোখ করছে
শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে। ওই ম্যাচটি জিতলেও অন্তত বেস্ট থার্ড হওয়ার সুযোগ
তৈরি হবে।
আরকে/প্রবা