ক্রীড়াঙ্গনের সমস্যা সমাধানে ক্রীড়া সাংবাদিকদের পরামর্শ নিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী
রুমেল খান
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৩৬ পিএম
‘সবার আগে বাংলাদেশ। ক্রীড়া হবে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’।
রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) বোর্ড রুমে ঢুকে এমনই এক ব্যানার দেখতে পেলেন
ক্রীড়া সাংবাদিকরা। একটু পরেই রুমে ঢুকলেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক,
তারকা ফুটবলার, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, আমিনুল হক। নিজের
তৃতীয় কর্মদিবসে এনএসসিতে ক্রীড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময়
সভায় মিলিত হন আমিনুল। সেখানে সবার কাছ থেকে ক্রীড়াঙ্গনের সংকটের বিষয়গুলো
শোনার পাশাপাশি সমস্যা সমাধানের পরামর্শও নেন তিনি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে বিএনপির লক্ষ্য ও পরিকল্পনার বিষয়টি তুলে ধরেন
আমিনুল। এরপর জেলা ক্রীড়া সংস্থা নিয়ে সাংবাদিকের মতামত শুনতে চান।জেলা পর্যায় থেকে খেলোয়াড়রা উঠে এসে জাতীয় দলে খেলে তেমনি সংগঠকেরা জেলা
বিভাগ থেকে মনোনীত হয়ে ফেডারেশনে পদে বসে। তাই জেলা ক্রীড়া সংস্থার বিষয়টি আমিনুল অনেক গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট অত্যন্ত সীমিত। এনএসসি জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে খুবই স্বল্প অনুদান দেয়। যা দিয়ে জেলায় সব খেলা পরিচালনা করা সম্ভবও হয়
না। তাই সাংবাদিকরা জেলা পর্যায়ে বাজেট বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। জেলা-বিভাগে স্টেডিয়াম থাকলেও সেটা ব্যবহার অনুপযোগী। অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণও গুরুত্বারোপ করেন অনেকে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার পাশাপাশি মহিলা জেলা ক্রীড়া সংস্থাও রয়েছে প্রতি জেলায়।
মহিলা ক্রীড়া সংস্থা জন্ম থেকেই অ্যাডহক কমিটি দ্বারা পরিচালিত। মহিলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যালয়, বাজেট সব কিছুতেই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জেলা ক্রীড়া সংস্থায় গঠনতন্ত্র সংস্কার করেও নির্বাচনের প্রস্তাব দেন সাংবাদিকরা। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন,
‘আমরা খেলাধুলাকে তৃণমূল থেকে জনপ্রিয় করে তুলতে চাই। অবকাঠামো নয়, আমরা খেলার মাঠকে
গুরুত্ব দিচ্ছি। যাতে জেলা পর্যায়ে শিশু-কিশোররা খেলার পরিবেশ পায়।’ 
প্রতিমন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত থাকা জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার এবার থেকে নিয়মিত দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালের জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রদানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি
বলেন, ‘এরপর থেকে প্রতিবছর যেন নিয়মিতভাবে এই পুরস্কার দেওয়া যায়, সে চেষ্টা থাকবে।’
অলিম্পিকে পদক এখনো স্বপ্ন বাংলাদেশের কাছে। তাই ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সাফ, এশিয়ান ধাপে ধাপে এগোতে চান।
কোন খেলাগুলোকে আন্তর্জাতিক বিবেচনায় গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান। তারা শুটিং, আরচারি, হকির নাম উচ্চারণ করেছেন।
অনেকদিন থেকেই ক্রীড়াঙ্গনের সবাই শুনে আসছে হকির অনেক সম্ভাবনা কিন্তু হকির সংগঠকদের মধ্যে অন্তঃকোন্দলও সমস্যা। এটাও সাংবাদিকরা তুলে ধরেছেন ক্রীড়ামন্ত্রীর কাছে।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের তীর্থস্থান পল্টন-গুলিস্তান। সেই এলাকা সন্ধ্যার পর থেকে মাদকের অভয়ারণ্য। নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল, শনিবার
ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে অবস্থিত একটি ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠনে চুরির ঘটনা ঘটেছে। স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়ে সামগ্রিকভাবে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন,
‘এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।’
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নির্বাহী
পরিচালকসহ আরও অনেকেই ছিলেন এই সভায়। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে খেলোয়াড়দের
একটি বেতন কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান আমিনুল। তিনি জানান, ‘পাশাপাশি
আমাদের আগামী বাংলাদেশে আমরা জাতীয় যে শিক্ষাক্রম আমাদের চতুর্থ শ্রেণি থেকে আমরা আমাদের
খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করতে চাই এবং সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়,
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষামন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে আমরা সেটা নিশ্চিত
করব।’
জেলা, উপজেলা থেকে খেলোয়াড় তৈরির উপায় বাতলে দিলেন আমিনুল।
একই সঙ্গে একটা ক্রীড়াসূচি তৈরিও করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অভিভাবকেরা যেন তাদের সন্তানকে খেলাধুলায় উদ্বুদ্ধ করেন,
আমিনুল সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন, ‘আমরা সেই শুরুটা করতে চাই যে প্রত্যেক বাবা-মা
যাতে তাদের সন্তানকে একজন খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতে পারে।
আমরা বলব না যে এটা রাতারাতি আমরা করে ফেলতে পারব। তবে আমরা শুরুটা করতে চাই। যে শুরুগুলোর
কথা আমি যখন খেলোয়াড় ছিলাম, তখনও বলেছি। বিগত ১৭ বছর যখন রাজনীতির মাঠে ছিলাম মাঝেমাঝে
আপনাদের সাথে দেখা হয়েছে কথা হয়েছে তখনো বলেছি।’
নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তা,
ক্যারিয়ার পরিকল্পনা ও অবসরের পর পুনর্বাসন বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে
বলে উল্লেখ করেন আমিনুল।
এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অফিসার নিয়োগে সাবেক
ক্রীড়াবিদদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘শিশুদের ছোটবেলা থেকেই
খেলাধুলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি স্কুলে ক্রিকেট ও ফুটবলসহ অন্তত পাঁচটি খেলার
সুযোগ রাখতে চাই।’
সভায় ক্রীড়া সাংবাদিকরা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত টুর্নামেন্ট
আয়োজন, মানসম্মত কোচ নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, ফেডারেশনগুলোর জবাবদিহি এবং খেলোয়াড়দের
চিকিৎসা ও পুষ্টি সহায়তা জোরদারের প্রস্তাব দেন।
ক্রীড়াঙ্গনের আঁতুড়ঘর বিকেএসপি। এই প্রতিষ্ঠান থেকে যে
মানের ক্রীড়াবিদ আসার দরকার সেটা আসে না, কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও কোনো জবাবদিহিতা
নেই। স্টেডিয়ামে দোকানের ভাড়া কম, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ রাজস্ব পায় না। জাতীয় ক্রীড়া
পরিষদ ফেডারেশনগুলোর অভিভাবক কিন্তু এখানে ক্রীড়াঙ্গনের কেউ সম্পৃক্ত পরিচালক পদে নয়
ফলে একটা দূরত্ব বা সমন্বয়হীনতা থাকে। এ রকম আরো অনেক সমস্যা সাংবাদিকরা তুলে ধরেন।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সকল সমস্যার সমাধানই করতে চান ধীরে ধীরে, ‘আমরা আপনাদের প্রস্তাব,
মতামতগুলো শুনেছি। এটা আজ শুনলাম শেষ না, এখান থেকে কাজের শুরু। এগুলো পর্যালোচনা হবে,
প্রয়োজনে কমিশন বা কমিটি হয়ে তদারকি চলবে।’
এছাড়া আমিনুল জানান, এখন থেকে ক্রীড়া সাংবাদিকরা লেখার
ব্যাপারে শতভাগ স্বাধীনতা পাবেন, ‘আপনারা আমাদের ভুল ধরবেন, সমালোচনা করবেন।’
প্যারা-ক্রীড়াবিদদেরও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন
আমিনুল। নেই সঙ্গে বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত প্রবাসী ক্রীড়াবিদদের প্রাধানর্য দেওয়ার কথাও
জানান।
ক্রীড়া সাংবাদিকরা আমিনুলকে আরও যেসব পরামর্শ দেন, সেগুলোর
মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতি, দলীয় ও আমলাতান্ত্রিকমুক্ত করা, গঠনতন্ত্র
সংশোধন করে যোগ্য-নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠকদের ফেরানো, এখনকার স্কুল মাঠগুলোর বেশিরভাগই
বাউন্ডারি দেওয়া, এগুলো তুলে দেওয়া, সব ফেডারেশনগুলোর কাছে বিগত ১০/১২ বছরের জাতীয়-আন্তর্জাতিক
সব খেলার ফলাফল সংগ্রহ করে সে অনুযায়ী ফেডারেশনগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া, সব ক্রীড়া
ফেডারেশন-অ্যাসোসিয়েশনকে গ্রেডিং সিস্টেমের আওতায় আনা, স্টেডিয়ামগুলোতে দোকান ভাড়া
নিয়ে দুর্নীতির কারণে এনএসসি মোটা অংকের রাজস্ব লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, এটা বন্ধ করে
রাজস্বের টাকা দিয়ে দুর্বল ফেডারেশনগুলোকে সাহায্য করা, স্পোর্টস সায়েন্স ও স্পোর্টস
মেডিসিনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া, সব জেলার ক্রীড়া কমিটিতে একজন সাবেক খেলোয়াড়/জাতীয়
ক্রীড়া পুরস্কাপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদকে রাখা ও তার পারমর্শ নেওয়া, আমলাদের বদলী না করে
তাদের দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া, মনিটরিং সেল করা, ৫২টি ক্রীড়া ফেডারেশনের
জন্য মাত্র ১৫টি ভেন্যু, এগুলোর সুষ্ঠ সমন্বয় করা, নিয়মিতভাবে যুব গেমস ও বাংলাদেশ
গেমস আয়োজন করা, জাতীয় ক্রীড়ানীতি বাস্তবায়ন করা, স্পোর্টস আর্কাইভ করা ইত্যাদি।
আরকে/প্রবা