রুমেল খান
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:৪৮ পিএম
আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:৫০ পিএম
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের কোচ পিটার বাটলার। ছবি : বাফুফে
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২১তম নারী এশিয়ান
কাপ। সামনে কঠিন গ্রুপ, শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। আর ঠিক এই সময়েই ২৬ জনের দল ঘোষণা করলেন
বাংলাদেশ নারী দলের কোচ পিটার বাটলার। দলে যেমন অভিজ্ঞতার ছাপ, তেমনি রয়েছে চমক আর
ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
নতুন আবিষ্কার আনিকা : সবচেয়ে বড়
চমক-সুইডেন প্রবাসী
মিডফিল্ডার আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী। সুইডিশ ক্লাব ব্রোমপোজকর্নের অনূর্ধ-১৯ দলে খেলে
গত মাসে সিনিয়র দলে অভিষেক হয়েছে তার। এবার লাল-সবুজ জার্সিতে আন্তর্জাতিক বড় মঞ্চে
নাম লেখানোর অপেক্ষা।
বাটলারের ভাষায়, ‘সে এক দারুণ আবিষ্কার।’
বাফুফে সহসভাপতি ফাহাদ করিমের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া এই ২১ বছর বয়সী ফুটবলারকে নিয়ে কোচের
মূল্যায়ন ছিল বিশদ-ভিডিও বিশ্লেষণ, কোচদের সঙ্গে কথা,
অনুশীলনে পর্যবেক্ষণ-সব মিলিয়ে সামর্থ্যের ভিত্তিতেই তাকে
দলে নেওয়া। ‘সে ভবিষ্যতের খেলোয়াড়, ইতিবাচক ও লড়াকু মানসিকতার,’ বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) অস্ট্রেলিয়া
যাওয়ার আগে বাফুফেতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বললেন বাটলার।
ঢাকায় কয়েকদিনের অনুশীলনে নতুন আবহাওয়ার
সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগলেও এখন স্বস্তিতে আনিকা। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের
হয়ে খেলা-এবার সেই স্বপ্নের
দুয়ারে দাঁড়িয়ে তিনি। সতীর্থ আফঈদা, রিপা, স্বপ্না ও রূপনার সঙ্গে বন্ধুত্বও জমে উঠেছে
তার।
লিগের গোলমেশিন আলপি জাতীয় দলে : দলে প্রথমবার
সুযোগ পেয়েছেন আলপি আক্তার ও সুরভী আক্তার আফরিন। সদ্যসমাপ্ত নারী ফুটবল লিগে রাজশাহী
স্টারসের হয়ে ৩০ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন আলপি। বয়সভিত্তিক দলে খেলা এই ফরোয়ার্ডের
সামনে এখন জাতীয় দলে নিজেকে প্রমাণের মঞ্চ।
ফিরেছেন ২০২৪ নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ
জয়ী আইরিন খাতুন। প্রীতিও জায়গা পেয়েছেন দলে—অভিজ্ঞতা ও
তারুণ্যের মিশেলে গড়া স্কোয়াড নিয়ে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ।
কঠিন গ্রুপ, বাস্তববাদী লক্ষ্য : ১ থেকে ২১
মার্চ অস্ট্রেলিয়ায় হবে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। বাংলাদেশ রয়েছে ‘বি’ গ্রুপে-সেখানে ৯ বারের
চ্যাম্পিয়ন চীন, তিনবারের চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়া ও উজবেকিস্তান।
৩ মার্চ চীনের বিপক্ষে শুরু, এরপর ৬ মার্চ উত্তর কোরিয়া এবং ৯ মার্চ উজবেকিস্তানের
বিপক্ষে লড়বে বাংলাদেশ।
তিন ম্যাচের মধ্যে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য
উজবেকিস্তান। সমশক্তির প্রতিপক্ষকে হারাতে পারলে সেরা দুই রানার্সআপের একটি হওয়ার সম্ভাবনা
জাগবে।
চোটের আপডেট ও দ্বিমুখী পরিকল্পনা
: নারী
ফুটবল লিগ চলাকালে চোট পাওয়া নবীরন অনুশীলনে ফিরলেও শতভাগ ফিট নন। বাটলার জানিয়েছেন,
প্রয়োজনে তাকে ২০-৩০ মিনিট খেলিয়ে ধীরে ধীরে ম্যাচ ফিট করা হবে। প্রায় অর্ধেক স্কোয়াড
অনূর্ধ-২০ খেলোয়াড় হওয়ায় জাতীয় দল ও বয়সভিত্তিক দলের প্রস্তুতি-দুটো দিকই
সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
অপূর্ণ প্রস্তুতির হতাশা : সবকিছুর মাঝেও
রয়েছে এক আক্ষেপ। থাইল্যান্ডে ক্যাম্প, মালয়েশিয়ায় প্রস্তুতি, ফিলিপাইনের বিপক্ষে ম্যাচ-সব পরিকল্পনাই
শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। নির্ধারিত বিদেশ ক্যাম্পের বদলে আগেভাগেই অস্ট্রেলিয়ায়
উড়াল দিয়েছে দল। সিডনিতে স্থানীয় কোনো ক্লাবের সঙ্গে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সম্ভাবনা
রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাটলারের কণ্ঠে তাই
স্পষ্ট হতাশা, ‘আমি কারো হাতের পুতুল নই। প্রস্তুতি আদর্শ মানের হয়নি। আমাদের পরিকল্পনা
ছিল, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। সব দোষ বাটলারের-এ কথা বলা
বন্ধ করা উচিত। আমি সততার সঙ্গে কাজ করি।’
সামনে যে লড়াই : নতুন মুখের
উচ্ছ্বাস, অভিজ্ঞদের প্রত্যাবর্তন, আর সীমাবদ্ধ প্রস্তুতির বাস্তবতা-সব মিলিয়ে
এক মিশ্র আবহে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে বাংলাদেশ নারী দল। কঠিন গ্রুপে চ্যালেঞ্জ বড়, তবে
স্বপ্নও ছোট নয়।
কিরণের আক্ষেপ : প্রথমবারের
মতো এএফসি নারী এশিয়ান কাপে খেলতে যাওয়ার রোমাঞ্চ
অনুভব করছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার। জানালেন, ভালো কিছুর স্বপ্নই দেখছেন তারা।
প্রস্তুতির কমতির প্রশ্নে অকপট স্বীকারোক্তি
দিয়েছেন বাফুফের নারী উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ, ‘আমি হতাশ বলব না, তবে
আরও বেশি, আরও ভালো ট্রেনিং হলে দল আরও শক্তিশালী হতে পারত। ওই লেভেল থেকে যদি মেয়েদের
বাইরে রেখে ট্রেনিং করাতে পারতাম, আরও কিছু প্রস্তুতি ম্যাচ খেলাতে পারতাম, তাহলে আমার
তৃপ্তিটা আরও বেশি থাকত। এখন ওই তৃপ্তিটা অবশ্যই নেই। এ জায়গাতে ঘাটতি থেকে গেল।’
অধিনায়ক আফঈদা যা বললেন : ঘাটতিটুকু
নিয়ে এখন আর হা-পিত্যেশ করতে চান না আফঈদা। সদ্যসমাপ্ত নারী ফুটবল লিগে সবার খেলার
মধ্যে থাকাটা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন নারী সাফজয়ী অধিনায়ক। গ্রুপে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচের
প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তানকে ঘিরেই যে মূল পরিকল্পনা, সেটাও বুঝিয়ে দিলেন তিনি, ‘আমরা কয়েকদিন
আগে নারী লিগ শেষ করেছি। তারপরে যে কয়দিন সময় পেয়েছি, কোচের কাছে প্র্যাকটিস করেছি।
কোচ আমাদেরকে দেখাচ্ছেন আমরা কীভাবে খেলব। যেহেতু আমাদের প্রতিপক্ষ অনেক শক্তিশালী-চীন, উত্তর
কোরিয়া, উজবেকিস্তান ওরা অনেক শক্তিশালী দল। তো আমরা প্রস্তুতিতে ওভাবেই কাজ করতেছি।
ইনশাআল্লাহ আমরা ভালো কিছু করব।’
আফঈদা আরও বলেন, ‘আপনারা সবাই আমাদের
জন্য দোয়া করবেন যেন আমরা ভালোভাবে ফিরে আসতে পারি এবং আমাদের সেরা খেলাটা আমরা খেলতে
পারি। আমরা অবশ্যই সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। আমাদের প্রথম দুটি ম্যাচ খুব শক্তিশালী
দলের সাথে, তবে আমরা উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ভালো কিছু করার আশা রাখছি।’
আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী প্রসঙ্গে আফঈদা
বণলন, ‘এশিয়ান পর্যায়ের লিগে ও খেলেছে। তাই আমাদের সাথে মানিয়ে নিতে ওর কোনো সমস্যা
হচ্ছে না। আর এশিয়া কাপের চাপ আমরা ওভাবে নিচ্ছি না। আমরা সব সময় যেভাবে খেলি, মাঠের
ভেতর সেভাবেই স্বাভাবিক খেলা খেলার চেষ্টা করব।’
এবার দেখার পালা-তারুণ্য আর
সাহস মিলিয়ে লাল-সবুজ কতদূর উড়তে পারে এশিয়ার আকাশে।
নারী এশিয়ান কাপের বাংলাদেশ দল : রূপনা চাকমা, মিলি আক্তার, স্বর্ণা রানী মন্ডল, আফঈদা খন্দকার (অধিনায়ক), কোহাতি কিসকু, নবীরন খাতুন, শিউলি আজিম, শামসুন্নাহার সিনিয়র, হালিমা খাতুন, সুরভী আক্তার আফরিন, স্বপ্না রানী, মুনকি আক্তার, আইরিন খাতুন, শাহেদা আক্তার রিপা, উমেহলা মারমা, ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা, আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী, উন্নতি খাতুন, আলপি আক্তার, সৌরভী আকন্দ প্রীতি, মোসাম্মৎ সুলতানা, তহুরা খাতুন, মোসাম্মৎ সাগরিকা ও শামসুন্নাহার জুনিয়র।
আরকে/প্রবা