প্রবা স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:৫৫ পিএম
রোমাঞ্চ, উত্তেজনা, বিতর্ক, নাটকীয়তা … কি ছিল না এই মহরণে? অবিশ্বাস্য আর নজিরবিহীন ঘটনার স্বাক্ষী হলো আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন)। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মিমাংসার আগেই উত্তাপ ছড়াল সেনেগালের অভিযোগে। শিরোপার মঞ্চে নেমে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে সেনেগালের মাঠ ছাড়া, তারপর একজন আর্দশ নেতার ভূমিকায় অবর্তীণ হয়ে দলকে ফিরিয়ে আনা সাদিও মানে, মহাগুরুত্বপূর্ণ সময়ে মরক্কোর ফরোয়ার্ড ব্রাহিম দিয়াজের পেনাল্টি মিস, সবশেষ পাপ গেয়ির গোলে স্বাগতিকদের হতাশার মহাসমুদ্রে ভাসিয়ে সেনেগালের চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আফ্রিকার সঙ্গে ফুটবলবিশ্ব দেখল এমনই এক মহাকাব্যিক ফাইনাল।
মরক্কোর
রাবাতে নাটকীয়তার সব সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া আফকনের ফাইনালে মরক্কোকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন
হয়েছে সেনেগাল। নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য সমতার পর অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে
একমাত্র গোলটি করে আফকনে সেনেগালের দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের নায়ক বনে যান ভিয়ারিয়ালের
মিডফিল্ডার পাপ গেয়ি।
এ
নিয়ে দ্বিতীয়বার আফকনে চ্যাম্পিয়ন হলো সেনেগাল। ২০২১ সালে প্রথমবার শিরেনপা জিতেছিল
তারা। পক্ষান্তরে ১৯৭৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এই ট্রফি জেতা হলো না মরক্কোর। মাঝে
২০০৪ আসরের ফাইনালে তিউনিসিয়ার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়ছিল তাদের। এবার নিজেদেরে উঠানে
ট্রফি জয়ের সবধরনের প্রস্তুতিই যেন সেরে নিয়েছিল আশরাফ হাকিমিরা।
ঘটনাবহুল
ফাইনালে প্রায় সমানতালে লড়ে যাওয়া মরক্কো-সেনেগাল গোলশূন্য থেকে নির্ধারিত সময় শেষ
করে। অনেকেই তখন ধরে নিয়েছিলেন ম্যাচ গড়াচ্ছে অতিরিক্ত সময়ে। তবে যোগ করা সময়ের ৯৮
মিনিটে ঘটে বিপত্তি। পেনাল্টি পেয়ে যায় মরক্কো। মরক্কোর নেওয়া কর্নারে বল উড়ে
যাচ্ছিল দূরের পোস্টে, সেখানেই ফাউলের শিকার হন রেয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড দিয়াস।
রেফারি
জ্যাঁ জাক নডালা ভিএআরের পরামর্শে সাইডলাইন মনিটরে গিয়ে রিপ্লে দেখে ব্রাহিম দিয়াজকে
ফাউল করার দায়ে ডিফেন্ডার এল হাজি মালিক দিয়ুফের বিরুদ্ধে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন।
আর রেফারির এই সিদ্ধান্তই শুরু হয় নাট্যমঞ্চের প্রথম পর্ব। কিছুক্ষণ আগেই সেনেগালের
একটি গোল বাতিল হওয়ায় ক্ষুব্ধ থাকা প্রধান কোচ পাপে থিয়াও নিজের খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়তে
বলেন। সেনেগালের অর্ধেকের বেশি খেলোয়াড় মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তবে তারপর দেশটির ‘জাতীয়
বীর’ সাদিও সবশেষ হয়ে যাওয়ার আগেই বুঝিয়ে শুনিয়ে ফিরিয়ে আনেন সতীর্থদের। প্রায় ১৭ মিনিটের
বিরতির পর শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়রা আবার মাঠে ফেরেন।
রিয়াল
মাদ্রিদের ফরোয়ার্ড দিয়াজ, যিনি পাঁচ গোল নিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন,
তাকেই দেওয়া হলো পেনাল্টিতে গোল করার গুরুদায়িত্ব। তার ‘পানেনকা’ শট সহজেই রুখে দেন
সেনেগালের গোলকিপার এদুয়ার মেন্দির।
এরপর
অতিরিক্ত সময়ের ৪ মিনিটে সেনেগালের মিডফিল্ডার পাপে গেয়ের গোল করেন। ম্যাচের বাকি সময়
আর কোনো নাটকের সূচনা না হওয়ায় শিরোপা নিশ্চিত হয়ে যায় ‘লায়ন্স অব তেরাঙ্গাদের’।
রোমাঞ্চর
আরও বাকি ছিল। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলন কক্ষে সেনেগাল কোচ পাপে বোনা থিয়াও প্রবেশ
করতেই মরক্কোর সাংবাদিকরা দুয়ো দিতে থাকেন ও ব্যঙ্গ করতে থাকেন। অন্যদিকে সেনেগালের
সাংবাদিকরা অবশ্য তালি দিচ্ছিলেন। টুর্নামেন্টের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার
চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এতে এক পর্যায়ে সংবাদ সম্মেলনে কথা না বলেই চলে যান সেনেগাল
কোচ।
ঘোষণা
এসেছিল সাদিও মানের মুখ থেকেই। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের (আফকন) সেমিফাইনালে মিসরের বিপক্ষে
জয়ের পর সেনেগাল রাইট উইঙ্গার জানিয়েছিলেন এটাই তাঁর শেষ আফকন। এরপর আর লাইন্স অব তেরাঙ্গাদের
হয়ে মাঠে না নামার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ৩৩ বছর বয়সী মানে। তবে দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের
সভাপতি পেপে থিয়াও জানিয়েছেন, তিনি সাবেক লিভারপুল উইঙ্গারকে অনুরোধ করেছেন বিষয়টি
পুনর্বিবেচনা করতে।
এদিকে
শিরোপা জিতেও শাস্তির আশঙ্কায় আছে সেনেগার। রাবাতের পুরো ঘটনাটি নিশ্চিতভাবেই পর্যালোচনা
করবে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ)। ফাইনালের উত্তপ্ত মুহূর্তে প্রধান কোচ পাপে
থিয়াওকে খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়তে ইশারা করতে দেখা গেছে-যা আফকনের নিয়মাবলির
৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।
আফকনের
নিয়মে স্পষ্টভাবে বলা আছে-‘যেকোনো কারণে যদি কোনো দল প্রতিযোগিতা থেকে সরে
দাঁড়ায়, ম্যাচে উপস্থিত না হয়, খেলতে অস্বীকৃতি জানায় অথবা রেফারির অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত
সময় শেষ হওয়ার আগে মাঠ ত্যাগ করে, তবে সেই দলকে পরাজিত হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং
চলমান প্রতিযোগিতা থেকে স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হবে। সিএএফ-এর সিদ্ধান্তে আগে যারা অযোগ্য
ঘোষিত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।’
সেনেগাল
শাস্তির হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হতে পারে তাদের সমর্থকরা ম্যাচের মাঠে প্রবেশের চেষ্টা
করার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষেও লিপ্ত হয়েছিল।
আরকে/প্রবা