প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:৫৮ পিএম
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:১৯ পিএম
মাঠে
না খেলেও ফুটবল সমর্থক হিসেবে ‘তারকা’ বনে গিয়েছিলেন অনেক আগেই। দৃষ্টান্তটা এক্ষেত্রে
বাংলাদেশে প্রথম তিনিই গড়েছিলেন। বর্তমান প্রজন্ম তাঁকে সেভাবে চেনে না। কিন্তু যারা
ফুটবল দেখতে ঢাকা-কমলাপুর-মিরপুর স্টেডিয়ামে গেছেন, তাদের কাছে তিনি এক ‘সুপারস্টার’
সমর্থক। আতাউর রহমান। সবার প্রিয় ‘আতা ভাই’। মোহামেডানের অন্ধ ভক্ত। লিকলিকে পাতলা
গড়নের। খুব সুন্দর করে কথা বলতেন। একটু টেনে টেনে বাংলার সাথে ইংরেজি মিশিয়ে বলা আতা
ভাইয়ের সাবলীন কথন ছিল ভীষণ মিষ্টি। মজা করতে ভালবাসতেন। হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল ছিলেন।
মোহামেডান গোল করলে শিশুদের মতো উল্লাসে ফেটে পড়তেন। সাদা-কালো বাহিনী হারলে বা গোল
হজম করলে মন খারাপ করতেন। ভীষণ রেগেও যেতেন মোহামেডানের কেউ সহজ গোল মিস করলে। করতেন
সাংঘাতিক গালাগাল। মোহামেডানের হেরে গেলে ছলছলে চোখে কেঁদেও ফেলতেন। সেই
মোহামেডান অন্তঃপ্রাণ ‘আতা ভাই’ আর নেই। ৭ জানুয়ারি (বুধবার) রাত ১১টায় বার্ধক্যজনিত
কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বুধবার রাতে শরীর বেশি খারাপ হলে তাঁকে হাসপাতালে
নেওয়ার পথেই তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি এক মেয়ে ও দুই নাতনিসহ অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী
রেখে গেছেন। তাঁর জানাজা বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বাদ জোহর টিকাটুলি জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়।
টিকাটুলি
তথা পুরান ঢাকার মানুষ আতা ভাইকে চেনেন না, ঢাকার ফুটবলের পুরনো দর্শকদের মধ্যে এমন কেউ সম্ভবত নেই। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়Ñ যাই
হোক, মাঠে যাওয়া চাই-ই তাঁর। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে নিয়মিত গ্যালারিতে হাজিরা দিয়েছেন।
২০১০-এর পরবর্তী সময়ে ফুটবল যখন দর্শক হারিয়েছে, তখনও আতা ভাই নিয়মিত মাঠে যেতেন। প্রায়
শূন্য গ্যালারিতে তাকে দেখা যেতো বীরদর্পে দলকে সাহস জোগাতে। আর মোহামেডানের জন্য আফসোস
করতেন। কারণ মোহামেডান সেই সময়টায় ধুঁকছে। স্বপ্ন দেখতেন, মোহামেডান ফিরে পাবে হারানো
গৌরব। ২০২৩ সালে ফেডারেশন কাপ আর বিগত মৌসুমে লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ভীষণ খুশি হয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক
সময় বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত আতা ভাই মাঠে যেতে পারতেন না। গত বছরেই বলেছিলেন,
‘আমি মাঠে যেতে পারি না। খেলার দিন ঘরে একা বসে বসে কাঁদি!’ মোহামেডানের সমর্থকরা কেউ
আতা ভাইয়ের বাসায় গেলে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসতেন। জুড়ে বসতেন পুরনো দিনের গল্প। খুব
খুশি হতেন কেউ খোঁজখবর নিতে গেলে। আতা ভাইয়ের মত সমর্থক বাংলাদেশের ফুটবলে আসবে কিনা
সন্দেহ। নিজের জীবনের ৫৭টি বছর শুধু মোহামেডানকে সমর্থন করে মাঠেই কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি।
দেশভাগ, পাকিস্তান, স্বাধীন বাংলাদেশ সব পরিবর্তনের সাক্ষী আতা ভাই। জীবনের সব পাওয়া
না পাওয়ার হিসেব-নিকেশ সবকিছুকে একপাশে রেখে তার ধ্যানজ্ঞান পড়ে ছিলো সাদা-কালোদের
আস্তানায়।
মোহামেডানে
অনেক রথী-মহারথী এসেছে এবং আরো আসবে। কিন্তু একজন আতা ভাই আর কোনোদিনও আসবেন না। আতা
ভাইয়ের প্রিয় মোহামেডানও বিদায়বেলায় সম্মান দিয়েছে তাঁকে। জানিয়েছে গভীর শোক বার্তা।
ক্লাব কর্মকর্তারা তার জানাযায় শরীক হয়েছে। তাঁর শবদেহ ঢেকে দিয়েছেন মোহামেডানের পতাকা
দিয়ে।
‘আসসালামু
আলাইকুম ভাই, কেমন আছেন? এখন আর আমি চোখে দেখতে পাই না। মোহামেডান আমার চোখের চিকিৎসা
করাবে বলেছে। আমার কথা একটু লেইখেন’, ঢাকা স্টেডিয়ামে দেখা হলেই কথাগুলো বলতেন মোহামেডানের
পার সমর্থক আতা ভাই। এখন আর দেখাও হবে না। এমন কথা কেউ আর বলবে না। কারন ইহজগতে আর
নেই সেই আতা ভাই! 
তাঁর
কণ্ঠে গর্ব ছিল, ষাটের দশক থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোহামেডানের কোনো ম্যাচ নাকি তাঁর
চোখ এড়িয়ে যায়নি। জন্ডিস, হার্নিয়ায় দুবার শরীর খারাপ হয়েছে। কিন্তু গ্যালারির ডাক
তাঁকে থামাতে পারেনি। ক্লাবের সীমানা পেরিয়ে যাওয়া এক নির্ভেজাল সমর্থক, যার বুকে জমে
ছিল নিখাদ ভালোবাসা। জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, ফুটবলটাই ছিল তাঁর ধর্ম, তাঁর আশ্রয়স্থল,
তাঁর জীবনের ভাষা। মোহামেডান ক্লাবের সাবেক পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আতা
ভাইয়ের পকেটে সব সময় একটি চিরকুট থাকত। সেখানে লেখা ছিল, ‘আমি মোহামেডানের সমর্থক’।
এটাই যেন ছিল তার পেশা। আমার কাছে আসতেন আতা ভাই। অন্য কিছুর জন্য নয়, জার্সি আর পাতাকা
চেয়ে নিতেন। এমন পার একজন সমর্থক আমরা আর পাবো কিনা জানি না।’
আতা
ভাই চলে গেছেন। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন খাঁটি ফুটবল সমর্থকের এক জীবন্ত ডেফিনিশন। যে
ডেফিনিশনে ছিল না ট্রেন্ড, ছিল না সোশ্যাল মিডিয়ার শোরগোল, ছিল না জয়-পরাজ্যের সুবিধাবাদী
হিসাব। তিনি স্টেডিয়ামে গলা ফাটিয়েছেন তার প্রিয় দল মোহামেডানের জন্য এবং দেশের ফুটবলের
জন্য। তার কণ্ঠ, তার উপস্থিতি ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ছিল দেশের ফুটবলের জন্য এক অনন্য
প্রেরণা। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব
লিমিটেড গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছে, ‘তিনি শুধু মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সমর্থক
ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলের একজন প্রকৃত সৈনিক। ফুটবলের প্রতি তার এই
অবদান ও ভালোবাসা চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ফুটবল সাপোর্টার্স ফোরাম (বিএফএসএফ) সর্বপ্রথম আতা ভাইকে সংবর্ধনা দিয়ে সম্মানিত করেছিল। 
এছাড়া ২০১৮ সালে এসবিএফ আয়োজিত গুণীজন সম্বর্ধনায় আতা ভাইকে সেরা সমর্থকের পুরষ্কারে ভূষিত
করা হয়েছিল।
আরকে/প্রবা