ট্রাই নেশনে তলানিতে বাংলাদেশ
রুমেল খান
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:৩৩ পিএম
ট্রাই নেশন সিরিজের সব ম্যাচে হারলেও বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের খেলায় উন্নতির ছাপ ছিল পরিস্কার। প্রবা ফটো
জীবনে চলার পথে নানা সমস্যা সামনে এসে দাঁড়ায়, সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াটাই হচ্ছে কৃতিত্বের। দার্শনিক রবার্ট ব্রিফল্ট বলেছেন, ‘সীমাবদ্ধতার চেয়ে নিজের ক্ষমতার উপর বেশি নির্ভর করতে শিখুন। এটাই শেষ অবধি আপনাকে সীমাবদ্ধতাকে পার করতে শেখাবে।’
জ্যা ল্যামার্ক বলেছেন, ‘সীমাবদ্ধতা হলো এক ধরনের আগুন, যা আপনাকে পুড়িয়ে নিখাদ সোনা
বানাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’ বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের ক্ষেত্রে
বলা যায়, এই দলটি নানা সমস্যা-সীমাবদ্ধতার পরও ধীরে ধীরে উন্নতি করছে এবং সামনে এগিয়ে
যাওয়ার চেষ্টা করছে।
‘দ্য
বেঙ্গল টাইগ্রেস’ খ্যাত বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল শুরুতে ঠিকমতো খেলতেই পারতো না।
তাদের খেলা দেখে বিস্তর হাসাহাসি হতো এবং প্রতিপক্ষের কাছে গণ্ডায় গণ্ডায় গোল হজম করতো।
২০১৪-১৫ সাল থেকে ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল ও প্ল্যান
অনুর্ধ-১৫ ফুটবল ট্যালেন্ট হান্টের মাধ্যমে অনেক ফুটবলারদের খুঁজে বের করে তাদের বাফুফে
ভবনে রাখা হয় এবং টানা নিবিড় প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা হয়। এর সুফলও আসতে থাকে। বিভিন্ন
বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে (৮/৯টি, বেশিরভাগই সাফ পর্যায়ে) শিরোপা জেতে। এরপর সিনিয়র
দল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমে তৃতীয় ও পরে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করার পর সর্বশেষ দুটি
আসরেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে স্বপ্নের পরিধি আরও বিস্তৃতি
ঘটে। সেটা এশিয়া পর্যায়ে। অবশেষে এএফসি এশিয়ান কাপের মূল পর্বেও ঠাঁই করে নেয় গত জুলাইয়ে।
গড়ে ইতিহাস। এখন নতুন লক্ষ্য এশিয়ান কাপের মূল পর্বে ভালো রেজাল্ট করা (যা অনুষ্ঠিত
হবে ২০২৬ সালের মার্চে, অস্ট্রেলিয়াতে)। 
ঢাকা
জাতীয় স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার পর্দা নেমেছে নারী ফুটবলের ট্রাই নেশন সিরিজের। দুই ম্যাচে
সর্বোচ্চ ৬ পয়েন্ট সংগ্রহ করে শিরোপা জিতেছে আজারবাইজান। মালয়েশিয়া ৩ পয়েন্ট নিয়ে হয়েছে
দ্বিতীয়, আর স্বাগতিক বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট শেষ করেছে শূন্য পয়েন্ট নিয়ে। ফলাফল হতাশাজনক
হলেও সার্বিক পারফরম্যান্সে খুব একটা পিছিয়ে ছিল না লাল-সবুজের মেয়েরা।
বাংলাদেশ
(ফিফা র্যাংকিং ১০৪) প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার (ফিফা র্যাংকিং ৯২) কাছে হেরে যায় ১-০
গোলে। ম্যাচে লড়াই ছিল সমানে-সমান, কিন্তু অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং গোল করার ব্যর্থতাই
হারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় ম্যাচে ইতিহাসের স্বাদ—এই
প্রথম কোনো ইউরোপিয়ান দলের বিপক্ষে খেলে বাংলাদেশ নারী দল। প্রতিপক্ষ আজারবাইজান (র্যাংকিং
৭৪), যারা শারীরিক সক্ষমতা, গতি ও পাসিংভিত্তিক ফুটবলে অনেক এগিয়ে। তবুও ২-১ গোলে হারের
ম্যাচটি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ; শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে বাংলার বাঘিনীরা।
এই
টুর্নামেন্টটির মূল উদ্দেশ্য ছিল আগামী বছর অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এএফসি এশিয়ান
কাপের মূল পর্বকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়া। সে দিক থেকে দেখা যায়—বাংলাদেশ
দলের সামগ্রিক প্রস্তুতি একেবারে খারাপ নয়। বরং সীমাবদ্ধতার বাস্তবতায় এটি আশাব্যঞ্জকও
বলা যায়। বহু বছর ধরে দেশে কোনো নারী ফুটবল লিগ অনুষ্ঠিত হয় না। ধারাবাহিক প্রতিযোগিতা
না থাকায় খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফিটনেসে ঘাটতি থাকাটাই স্বাভাবিক। মেয়েদের লিগ খেলতে হয়
প্রতিবেশী দেশ ভুটানে, যেখানে লিগের মান তুলনামূলক কম।
তার
ওপর দলটি নামতে হয়েছে পাঁচ অভিজ্ঞ ফুটবলারের অনুপস্থিতিতে (সাবিনা
খাতুন, মাসুরা পারভীন, সানজিদা আক্তার, কৃষ্ণা রাণী সরকার ও মাতসুশিমা সুমাইয়া)। ‘বিদ্রোহী
পাঁচ’ নামে পরিচিত এই খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব স্পষ্টভাবেই প্রভাব ফেলত ম্যাচে।
কিন্তু তাদের ছাড়াই তরুণ-তরুণী মিলিয়ে গড়া দলটি নিজেদের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছে, বিশেষ
করে ডিফেন্স ও মিডফিল্ডে সংগঠিত খেলার মাধ্যমে। ফরোয়ার্ড লাইনে গোলের ঘাটতি থাকলেও
আক্রমণে ধারাবাহিকতা বাড়ছে—এটাই সবচেয়ে ইতিবাচক দিক।
সব মিলিয়ে স্কোরলাইনে হতাশা থাকলেও খেলায় ছিল লড়াই, উদ্যম এবং উন্নতির বার্তা। এএফসি এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত প্রস্তুতির পথে এই ট্রাই নেশন সিরিজ বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে আত্মবিশ্বাস জোগাবে, পাশাপাশি কোচিং স্টাফের জন্যও পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দেবে—কোথায় ঘাটতি, কোথায় আরও কাজ দরকার। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ‘বাংলার বাঘিনীরা’ যে এগিয়ে যেতে চায়, মাঠে তাদের পারফরম্যান্সই তা প্রমাণ করেছে।
আরকে/প্রবা