আসাদুজ্জামান রাব্বি
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১৯ এএম
আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:২৬ পিএম
হেমন্তের শিশিরভেজা ভোর পেরিয়ে সবে মিষ্টি রোদ উঁকি দিতে শুরু করেছে মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে। একটু পরেই শুরু হবে বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড টেস্ট সিরিজের ২য় টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা। গ্রাউন্ড স্টাফরাও ব্যাস্ত মাঠের পিচ, আউটফিল্ড পরিচর্যায়। সকলের চোখে মুখে উচ্ছ্বাস। কারণ, আজকের দিনটা হয়তো বিশেষ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য। আর এই বিশেষত্বের কারণ মুশফিকুর রহিম–যিনি নিজের শততম টেস্টে ঐতিহাসিক এক ল্যান্ডমার্কের সামনে দাঁড়িয়ে। আর ১ রান করলেই যে শততম টেস্টে সেঞ্চুরিয়ানদের পাশে নাম লিখাবেন তিনি।
এমন সম্ভাবনাকে সামনে রেখে শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সকাল সাড়ে ৯টায় নির্ধারিত সময়ে শুরু হলো দ্বিতীয় দিনের খেলা। বোলিং প্রান্তে প্রস্তুত আইরিশ বোলার ম্যাথিউ হামফ্রেস আর ব্যাটিং প্রান্তে মুশফিকুর রহিম- যিনি ১ম দিন শেষে অপরাজিত আছেন ৯৯ রানে। প্রথম ওভারটি দেখে শুনে খেলে মেইডেন দেন মুশফিক। পরের ওভারে বল করতে আসেন আইরিশ পেসার জরডান নেইল। সেই ওভারের প্রথম বল থেকে সিঙ্গেল নিয়ে আবারও মুশফিককে স্ট্রাইক দেন লিটন দাস। ৯৯ রানে থাকা মুশফিক এ ওভারের দ্বিতীয় বলটিও দেখেশুনে খেলে ডট দেন। এরপরের বলেই এলো সেই কাঙ্খিত মূহুর্ত। নেইলের করা পায়ের দিকের বলটা লেগ সাইডে আলতো করে খেলে ১ রানের জন্য প্রান্ত বদল করলেন মুশফিক। ১৯৫ বল খেলে তুলে নিলেন টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৩ তম সেঞ্চুরি। সেই সাথে অর্জন করলেন একটি মাইলফলকও। ক্রিকেট ইতিহাসের ১১তম ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের শততম টেস্টে সেঞ্চুরি করলেন মি. ডিপেন্ডেবল। সাথে চিরচেনা সেই সেলিব্রেশন। গ্যালারিতে ভক্ত সমর্থকদের উল্লাস, মুখে ‘মুশফিক মুশফিক’ ধ্বনি।
গতদিনে আরও একটা ওভার বেশি করানো গেলে হয়তো শেষ বিকেলেই শতকের দেখা পেয়ে যেতেন মুশফিক। কিন্তু আইসিসির ক্রিকেটীয় রুলস তো আর অমান্য করা যায় না। কাট অফ টাইম (নির্ধারিত সময়) শেষ হওয়ায় দিনের খেলা শেষ করতে হলো আম্পায়ারদের। প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ২৯২ রান।
মুশফিকের আগে ৮৩ জন ক্রিকেটার ১০০ টেস্ট খেলার মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০ জন খেলোয়াড় পেয়েছেন শততম টেস্টে সেঞ্চুরির দেখা। ১১তম ক্রিকেটার হিসেবে এই কীর্তি গড়লেন মুশফিক।
প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে এই কীর্তি গড়েছিলেন ইংল্যান্ডের কলিন কাউড্রে। ১৯৬৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই রেকর্ড গড়েন তিনি। এছাড়া এই তালিকায় আরও আছেন পাকিস্তানের জাভেদ মিয়াদাদ, ওয়েস্ট ইন্ডিজের গর্ডন গ্রিনিজ, ইংল্যান্ডের অ্যালেক স্টুযার্ট, পাকিস্তানের ইনজামাম-উল-হক, অস্ট্রেলিয়ার রিকি পন্টিং, দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রায়েম স্মিথ ও হাশিম আমলা, ইংল্যান্ডের জো-রুট ও অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ওয়ার্নার।
মুশফিকের শততম টেস্টকে স্মরণীয় করে রাখতে বুধবার (১৯ নভেম্বর) মিরপুর টেস্টের প্রথম দিনে বিসিবির ছিল নানা আয়োজন, যা শুধু একজন ক্রিকেটারকে সম্মান জানানো নয়, বরং দেশের ক্রিকেটের দীর্ঘ যাত্রারও এক উৎসবমুখর উদযাপন।
এদিন টস জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন টাইগার কাপ্তান নাজমুল হোসেন শান্ত। তারপরই শুরু হয় মুশফিকের ঐতিহাসিক দিনটির আনুষ্ঠানিকতা। সকাল ৯টা ১৬ মিনিটে জাতীয় দলের সদস্যরা মাঠে প্রবেশ করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান। তারপর মুশফিককে বিশেষ টেস্ট ক্যাপ তুলে সেই হাবিবুল বাসার সুমন- যিনি ২০০৫ সালে লর্ডস টেস্টে মুশফিকে অভিষিক্ত টেস্ট ক্যাপ পরিয়ে দিয়েছিলেন।
এরপর মুশফিকের হাতে বাক্সবন্দি একটি বিশেষ ক্যাপ তুলে দেন দেশের প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার আকরাম খান। এছাড়া বিশেষ সম্মাননা স্বারক প্রদান করেন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন। আর সতীর্থদের স্বাক্ষরিত একটি স্মারক জার্সি তুলে দেন মুশফিকের প্রথম টেস্টের অধিনায়ক হাবিবুল বাসার এবং শততম টেস্টে নেতৃত্ব দেওয়া অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। এই বিশেষ মূহুর্তে পাশে ছিলেন মুশফিকের বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা, যা মুহূর্তটিকে আরও আবেগঘন করে তোলে।
স্বরণীয় এই টেস্টের ১ম দিনে মুশফিক যখন ব্যাটিংয়ে নামেন তখন বাংলাদেশের স্কোর ৩ উইকেটে ৯৫ রান। অপরপ্রান্তে অপরাজিত থাকা অভিজ্ঞ মুমিনুল হককে নিয়ে দিনের দ্বিতীয় সেশন সামাল দেন মুশফিক। চতুর্থ উইকেট জুটিতে দুজন যোগ করেন গুরুত্বপূর্ণ ১০৭ রান। তৃতীয় সেশনের শুরুতে ১২৮ বলে ৬৩ রান করে মুমিনুল আউট হলে লিটনকে নিয়েই দিনের বাকি সময় পার করেন ৩৮ বছর বয়সী এই ব্যাটার, অপরাজিত থাকেন সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১ রান দূরে। আজ দ্বিতীয় দিনে সেই ১ রান নিয়ে পূর্ণ করলেন নিজের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি। হামফ্রেসের বলে বালবার্নিকে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে আউট হওয়ার আগে মুশফিক করেন ২১৪ বল থেকে ১০৬ রান। ঐতিহাসিক এই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে হয়তো আরও একবার ব্যাট করার সুযোগ পেতে পারেন মি. ডিপেন্ডেবল।