রুমেল খান
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:৫৫ পিএম
ক্রীড়াভুবনে সবচেয়ে জনপ্রিয় কোনটি? সবাই এক কথায় উত্তর দেবেন ফুটবল। এ খেলার অনুরাগীদের দৃষ্টি থাকে তাদের ওপর- যারা গোল করেন। কিন্তু গোলরক্ষক যদি বিপক্ষের আক্রমণকে প্রতিহত না করতেন, তাহলে দল হারতেন। কাজেই স্ট্রাইকার-মিডফিল্ডার-ডিফেন্ডারদের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নন একজন গোলরক্ষক। গোলপোস্টের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে যুগে যুগে খ্যাতিমান হয়েছেন অনেক অতন্দ্র প্রহরী। তাদেরই একজন বিপ্লব ভট্টাচার্য্য। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের (১৯৯৭-২০১৩) সাবেক ও তারকা গোলরক্ষক বিপ্লব কথা বলেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে।
রেকর্ড ও সর্বাধিক ৮ বার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়া বিপ্লব ১৩ নভেম্বর ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে দেখেছেন বাংলাদেশ-নেপাল ফিফা প্রীতি ম্যাচটি। জাতীয় দলের হয়ে দুটি শিরোপাজয়ী এই গোলরক্ষক দলের ড্রতে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে গোলরক্ষক ও রক্ষণভাগ নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিগত কয়েকটি ম্যাচ, ধরুন সিঙ্গাপুর ম্যাচ থেকেই ধরি; পুরো দলই একটা সাইকোলজিক্যাল ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর সাপোর্টারদের প্রেশার তো আছেই। প্রতিটি ম্যাচই যদি বিশ্লেষণ করেন, তাহলে দেখবেন ভুলের পর ভুল আছেই। একা মিতুলকে দোষ দিলেই হবে না, ডিফেন্ডারদেরও এখানে দায় আছে। আমরা বেশিরভাগ গোলই হজম করছি সেট পিস থেকে। এখানে মিতুলের অবশ্যই লিডারশিপের প্রয়োজন। প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের মার্কিং করা ... এই জিনিষগুলো বেশি বেশি করতে হবে। না করলে এমন গোল হজম চলতেই থাকবে।

একেবারে শেষ মিনিটে দলের খাওয়া প্রসঙ্গে বিপ্লবের ভাষ্য, লাস্ট মিনিটে গোলগুলো খাচ্ছি। আমার মনে হয়, খেলোয়াড়দের ফোকাসটা থাকে না, কেন থাকে না তা জানি না। ওদের মেডিটেশনের বেশি প্রয়োজন। এটা আধুনিক ফুটবলে খুবই জরুরি ব্যাপার। তীক্ষ্ণ মনোযোগী হওয়ার জন্যই এটা দরকার। আমরা মিতুলের কাছে যে পারফর্মেন্সটা প্রত্যাশা করি গত কয়েকটা ম্যাচে সেই পারফর্ম করতে পারছে না, অথচ এর আগে সে ভালোই খেলছিল।
বিপ্লবের মতে- হতে পারে মিতুলের ভাই মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি একটা ট্রমার মধ্যে আছেন, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। ওকে নিয়ে যারা কাজ (কোচিং স্টাফ) করছেন তারাই বলতে পারবেন সমস্যাটা কী। তাদের উচিত সব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সে বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলা।
দলে মিতুল ছাড়াও আরও গোলকিপার যেমন- সুজন ও শ্রাবণ আছে। যখন একটা গোলকিপারের খারাপ সময় যায়, তখন তাকে বসিয়ে অন্যদের খেলানো উচিত। পরে ভালো খেলে সে আবার কামব্যাক করবে। এমনটা আমার বেলাতেও অনেকবারই ঘটেছে। মিতুলকে এটা বুঝতে হবে। দলের স্বার্থে অন্যদের জন্য জায়গা করে দিতে হবে। জাতীয় দলে খেলা অবশ্যই আবেগের ব্যাপার, তবে আবেগকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না, যোগ করেন সাবেক এই গোলরক্ষক।
নেপাল ম্যাচে মিতুলের লাস্ট গোল রিসিভের প্রসঙ্গে বিপ্লবের বিশ্লেষণ, গোলের সময় ওর পজিশন সেন্স এবং মার্কিং ঠিক ছিল না। গোললাইনের ভেতরে না দাঁড়িয়ে প্রথম পোস্টের দিকে থাকতো, তাহলে গোলটা হতো না। আমার মতে, এই গোলটির জন্য মিতুল পুরোপুরি দায়ী। কোচিং প্যানেল যদি এই সমস্যাগুলো নিয়ে ঠিকমতো কাজ করে তাহলে ১৮ নভেম্বর ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে ভাল কিছু দেখতে পাবেন বলে মনে করেন তিনি। বিপ্লবের মতে, অন্য দুই গোলরক্ষকের মধ্যে একজনকে ওই ম্যাচে খেলানো উচিত।

ম্যাচের পর ম্যাচে এত ভুলের পরও কোচ জাভিয়ের ক্যাবরেরা মিতুলকে প্রথম একাদশে খেলিয়েই যাচ্ছেন। এতে করে মিতুলের মধ্যে এক ধরনের অতি আত্মবিশ্বাস চলে এসেছে বলে মনে করেন বিপ্লব। সাবেক এই গোলরক্ষক বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বড় ব্যাপার। মিতুল যদি মনে করে দলে ওর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, কোচও তাকে বেশি প্রায়োরিটি দিচ্ছে তাহলে সে মনে করতে পারে আমি ভুল করলেও আমাকে খেলানো হবে। এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জাতীয় দলে যারা আছে, তারা সেরা বলেই আছে। অবশ্যই তাদেরকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখা উচিত। দর্শকরা কিন্তু বার বার হতাশ হতে চায় না।
বাফুফে জাতীয় দলকে একটা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে এসেছে, দলে সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে এমন মন্তব্য করে বিপ্লব বলেন, ভালো কিছু প্লেয়ার এনেছে, দর্শকের আগ্রহ-চাহিদা বাড়িয়েছে। ফলে প্লেয়ারদের উচিত এসব মাথায় রেখে ভালো পারফর্ম করে দেশকে জয় উপহার দেওয়া। নেপালের বিরুদ্ধে এগিয়ে থেকেও ড্র করার মানে হলো অবশ্যই জাতীয় দলে দুর্বলতা আছে। দিনের পর দিন তো এমনটা চলতে পারে না। এত ছন্নছাড়া রক্ষণভাগ আগে কখনো দেখিনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আমার মনে হয় ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ খেলার আগে সময় এসেছে এগুলো চিন্তা করার ও সমাধান করার। সমস্যা-দুর্বলতাগুলো ধরে সেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে এবং দলের আত্মবিশ্বাস অবশ্যই ফিরিয়ে আনতে হবে, যোগ করেন বিপ্লব।