প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:৩৯ পিএম
ক্লাবগুলোর তাদের ফুটবলারদের বেতন বকেয়া রেখে টালবাহানা করে— এই ইতিহাস অনেক পুরনো। বিশ্বের সবর্ত্রই এটা দেখা যায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বসুন্ধরা কিংস ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পর এবার ফিফা দ্বারা নিষিদ্ধ হয়েছে ঢাকা আবাহনী লিমিটেডও। এবং একই ইস্যুতে-সেটা ট্রান্সফার সংক্রান্ত। ‘দ্য স্কাই ব্লু ব্রিগেড’ খ্যাত আবাহনীর ওপর টানা তিন ট্রান্সফার উইন্ডোতে খেলোয়াড় নিবন্ধন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বিদেশি খেলোয়াড়দের বকেয়া বেতন পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ফিফার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে ৩ নভেম্বর থেকে। ঘানার রিচমন্ড বোয়াকে, নামিবিয়ার কেনেডি আমুটেনিয়া ও সিরিয়ার মোয়ায়াদ আল খৌলি—এই তিন বিদেশি খেলোয়াড় ফিফার কাছে অভিযোগ জানান, তারা ২০২৪-২৫ মৌসুমে আবাহনীর সঙ্গে চুক্তি করলেও বেতন পাননি।
ফিফার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, শাস্তির মেয়াদ ও কারণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবাহনীর ম্যানেজার সত্যজিৎ দাস রূপু বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমরা মঙ্গলবার ফিফার সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে পারি। আগের ব্যবস্থাপনা কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ক্লাবের আইনজীবী ইতোমধ্যে ফিফাকে জানিয়েছিলেন যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ক্লাব প্রশাসনেও পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু ফিফা শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়দের পক্ষেই রায় দিয়েছে। অথচ ওই খেলোয়াড়দের কেউ বাংলাদেশে আসেননি, এমনকি এক-দুজন অন্য ক্লাবের হয়েও একই মৌসুমে খেলেছেন।’
রূপু বকেয়া টাকার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ জানাতে অস্বীকৃতি জানালেও ধারণা করা হচ্ছে, তা প্রায় তিন কোটি টাকার কাছাকাছি!
এর আগে একই কারণে বিদেশি খেলোয়াড়দের বেতন পরিশোধ না করায় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও বসুন্ধরা কিংসের বিরুদ্ধেও ট্রান্সফার নিষেধাজ্ঞা জারি করে ফিফা। ফলে দেশের শীর্ষ তিন ক্লাবই এখন ফিফার শাস্তির তালিকায়।
এখন ফিফার এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আবাহনী আগামী তিনটি ট্রান্সফার উইন্ডোতে নতুন কোনো খেলোয়াড় নিবন্ধন করতে পারবে না— তা দেশি হোক বা বিদেশি। অর্থাৎ, ক্লাবটি যদি দ্রুত খেলোয়াড়দের বকেয়া পরিশোধ না করে, তবে অন্তত ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত তারা নতুন কোনো খেলোয়াড় দলে ভেড়াতে পারবে না।
বাংলাদেশ ফুটবল লিগে (বিএফএল) এর প্রভাব হবে স্পষ্ট।
এই ঘটনাগুলোই ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের ফুটবল ক্লাবগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও চুক্তি বাস্তবায়নে বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। এটা অবশ্য বাংলাদেশ ফুটবলে পুরনো সমস্যা। খেলোয়াড়দের বেতন বকেয়া রাখার সংস্কৃতি নতুন নয়। অনেক ক্লাবই মৌসুমের মাঝপথে আর্থিক সংকটে পড়ে খেলোয়াড়দের প্রাপ্য অর্থ সময়মতো পরিশোধ করতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্লাবগুলোর আর্থিক পরিকল্পনার অভাব, স্পন্সরশিপের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ফুটবলের অব্যবস্থাপনা—এই সংকটের মূল কারণ।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) অতীতে বেশ কয়েকবার সতর্কতা জারি করলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। ফিফা জানিয়েছে, আবাহনী লিমিটেড যদি বকেয়া অর্থ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করে, তাহলে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। কিন্তু সময়মতো অর্থ না দিলে শাস্তি আরও কঠোর হতে পারে— এমনকি ক্লাবের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত জরিমানাও আরোপ হতে পারে।
আবাহনীর কোনো কর্মকর্তা এখনো প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি। তবে ক্লাবের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, তারা বিষয়টি সমাধানের জন্য ফিফা ও সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে।
বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলে এ ধরনের ঘটনা শুধু ক্লাবগুলোর ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং দেশের ফুটবলের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ফিফার কাছে নিয়মিতভাবে খেলোয়াড়দের অভিযোগ আসা মানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্লাবগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে ক্লাবগুলোকে এখনই স্বচ্ছ আর্থিক নীতিমালা ও পেশাদার প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, না হলে ভবিষ্যতে আরও ক্লাব একই সমস্যায় পড়বে।