প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৪ ০৩:১৭ এএম
সিডনি ম্যাকলাফলিন-লেভরোন
বিশ্বরেকর্ডে নাম লেখাতে কতটা ঘাম ঝরে, কতটা অধ্যবসায়ের প্রয়োজন, সেটা আর নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু সিডনি ম্যাকলাফলিন-লেভরোনকে যদি প্রশ্ন করা হয়, বিশ্বরেকর্ড গড়া কতটা কষ্টসাধ্য? প্রশ্ন শুনে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের এ অ্যাথলেট হাসবেন। কেননা এই কাজটা যে তার কাছে যেন ছেলেখেলা। নারীদের ৪০০ মিটার হার্ডলসকে নিজের সম্পত্তি বানিয়ে ছেড়েছেন লেভরোন। ৪০০ মিটার দৌড়ের সময় মাঝে থাকা ১০ হার্ডলস গুনে গুনে উতরে যাওয়াটাকে নেশায় পরিণত করেছেন এই মার্কিন নন্দিনী।
চলতি প্যারিস অলিম্পিকে বৃহস্পতিবার রাতে ৪০০ মিটার হার্ডলসে স্বর্ণ জিতে নতুন কীর্তি গড়লেন লেভরোন। নিজের বিশ্বরেকর্ড ভেঙে উঠলেন নতুন উচ্চতায়। এখানেই শেষ নয়। অলিম্পিক ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে ৪০০ মিটার হার্ডলসে জিতলেন টানা জোড়া স্বর্ণ। এবারে এই ইভেন্টে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নেদারল্যান্ডসের ফেমকে বোলকে হারিয়েছেন লেভরোন। ‘সুপার সিড’খ্যাত এ ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড তারকা দৌড় শেষ করেন ৫০.৩৭ সেকেন্ডে। গত জুনে ইউজেনিতে অলিম্পিক ট্রায়ালে ৫০.৬৫ সেকেন্ড সময় বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন লেভরোন। এবার নিজের রেকর্ডকে করলেন আরও সমৃদ্ধ।
এই ইভেন্টে গত পাঁচ বছরে হারতেই ভুলে গেছেন লেভরোন। নিউজ এজেন্সি এএফপির ভাষায়, নারীদের ৪০০ মিটারে সর্বকালের সেরা হার্ডলার হিসেবে নিজের অবস্থানটা আরও পোক্ত করে ফেললেন লেভরোন। তারপরও থামতে চান না এই মার্কিন দৌড়বিদ। স্বর্ণ জিতে জানালেন, নিজের টাইমিং রেকর্ড নামিয়ে ফেলতে চান ৫০ সেকেন্ডের নিচে।
হার্ডল পেরোতে প্রতিবারই সময় কমানোর চ্যালেঞ্জ নেন লেভরোন, ‘যতটা সম্ভব দক্ষতায় ১০টি হার্ডল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছি এবং প্রতিবারই টাইমিং কমানোর চেষ্টা করি।’ এটাই কি আপনার ‘নিখুঁত দৌড়’? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে লেভরোন বনে গেলেন দার্শনিক। তার ভাষায়, ‘সব সময়ই উন্নতির জায়গা থাকে। পারফেক্ট রেস বলে কিছু নেই। তবে ধীরে ধীরে ৪৯ সেকেন্ডে নামিয়ে আনা সম্ভব। আমরা ইঞ্চি ইঞ্চি করে সেদিকে এগোচ্ছি। পায়ের সামর্থ্যটা তৈরি করে সেখানে পৌঁছাতে হবে।’
চ্যাম্পিয়ন হয়েই জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে মাতেন উচ্ছ্বাস আর উদযাপনে। দর্শক অভিবাদনের প্রতিদান দিতেও ভোলেননি ম্যাকলাফলিন-লেভরোন। রকেটের মতো গতিময় পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ মাথায় পরে নেন শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটও। এই মুকুট যে তাকেই মানায়! কারণ ম্যাকলাফলিন-লেভরোন ২০২১ সাল থেকে ষষ্ঠবার বিশ্বরেকর্ড ভাঙলেন। বিশ্বরেকর্ডের রানী বললেও অত্যুক্তি হবে না মোটেই। ট্র্যাকের প্রথম অ্যাথলেট হিসেবে একই ইভেন্টে চর্তুথবার বিশ্বরেকর্ড ভাঙার কীর্তিও রয়েছে তার দখলে। চমৎকার এই অর্জন হাতে ধরা দিয়েছে মাত্র ১৩ মাসের মধ্যে! ৪০০ মিটার হার্ডলসে প্রথম নারী অ্যাথলেট হিসেবে ৫২ সেকেন্ড ও ৫১ সেকেন্ডের কমেও তিনিই প্রথম দৌড় শেষ করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেও ব্যর্থ হলেন নেদারল্যান্ডসের বোল। ব্রোঞ্জ পদকেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো তাকে। তিনবারের মোকাবিলায় ম্যাকলাফলিন-লেভরোনের কাছে বোল হার মানলেন প্রতিবারই।
নিজের ২৫তম জন্মদিনের কেক কেটেছেন আগের দিন। পরের দিনই পেয়ে গেলেন দারুণ এক উপহার। তার উদযাপনটা পেল তাই অনন্য মাত্রা। ট্র্যাকে নয়া ইতিহাস লেখার খুশির জোয়ারে ভেসে ম্যাকলাফলিন-লেভরোন বললেন, ‘এই সুযোগের জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। ২৫তম জন্মদিনটা এভাবে উদযাপন করতে পারছি, সেজন্যও কৃতজ্ঞতা।’
ম্যাকলাফলিন-লেভরোনের শরীরে যে বইয়ে চলেছে দৌড়বিদের রক্ত। তার বাবা উইল ম্যাকলাফলিনও ৪০০ মিটার হার্ডলসে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে লড়েছেন। রাইডার বিশ্ববিদ্যালয়ের হল অব ফেমেও জায়গা পেয়েছে তার নাম। তার মা মেরি ম্যাকলাফলিনও ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের অ্যাথলেটে দ্যুতি ছড়িয়েছেন একসময়। কার্ডিনাল ও’হারা হাইস্কুলের হয়ে ট্র্যাক কাঁপিয়েছেন। মেয়ের প্রতিভায় এতই মুগ্ধ যে, উইল হুট করে বলে ফেলেছিলেন, তার মেয়ের সাফল্য ছিনিয়ে নেওয়াটা এখন ‘শুধুই সময়ের ব্যাপার’। তার মুখের কথা আলোর মুখ দেখে চলেছে সেই কবে থেকে।
রিও অলিম্পিক থেকে সাফল্য পেতে লড়াই শুরু লেভরোনের। সে আবার মাত্র ১৭ বছর বয়সে। দুবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হতে এক দশকও লাগেনি। কেবল এটাই নয়, মেয়েদের ৪০০ মিটার হার্ডলসে দ্রুততম ১০টি টাইমিংয়ের ৭টিরই মালিক ম্যাকলাফলিন-লেভরোন! ট্র্যাকে কীভাবে দেন এমন বিদ্যুৎ গতির পারফরম্যান্স? মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি দিয়েছে তার ব্যাখ্যা, দৌড়কে গণিতের মতো বুঝে নেন ম্যাকলাফলিন-লেভরোন। ১০টি হার্ডলসের প্রথম সাতটি হার্ডলের মধ্যে ১৪টি করে ধাপ ফেলে এগোন। শেষের তিনটি হার্ডলে মাঝে ফেলেন ১৫টি করে ধাপ। তাতেই প্যারিস জয় করলেন ম্যাকলাফলিন-লেভরোন। তার আবাসস্থল লস অ্যাঞ্জেলেসেই বসবে অলিম্পিকের আগামী আসর। ২০২৮ সালে অনুষ্ঠিতব্য অলিম্পিকের পরের আসরেও জয়রথটা চালিয়ে যেতে যান। হাঁকাতে চান হ্যাটট্রিক স্বর্ণ জয়ের বিশ্বরেকর্ড।