সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৩ ০০:২০ এএম
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৩ ১১:০৫ এএম
গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যায় এই রেলপথের সাতকানিয়া উপজেলার প্রায় দুই কিলোমিটার অংশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রবা ফটো
পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সঙ্গে যুক্ত করতে আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের উদ্বোধন করতে চায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। সেই লক্ষ্যে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথের ৮৮ শতাংশ কাজ শেষও হয়েছিল। কিন্তু গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যায় এই রেলপথের সাতকানিয়া উপজেলার প্রায় দুই কিলোমিটার অংশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যার ধাক্কায় বেরিয়ে এসেছে এ প্রকল্প-পরিকল্পনার নানা গলদ; শুরু হয়েছে এটি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের পরিকল্পনা এবং ডিজাইনই সঠিক ছিল না। তারা বলছেন, এমনকি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা রেলওয়েরও এটির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল না। যে কারণে নির্মাণাধীন দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া অংশে পর্যাপ্ত কালভার্ট নির্মাণ হয়নি; আবার যেসব কালভার্ট বা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলোও সঠিক স্থানে নির্মাণ করা হয়নি। এর ফলে বন্যা যেমন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, তেমনি রেলপথেরও ক্ষতি হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৩ আগস্ট থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত টানা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলা প্লাবিত হয়। এতে হাজারো পরিবারের বসতঘর ডুবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নারী, শিশুসহ প্রাণহানি হয়েছে অন্তত ১৮ জনের। এ সময় চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের তেমুহনী এলাকায় ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রেললাইন ডুবে যায়।
স্থানীয় কেঁওচিয়া এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত এক বাসিন্দা বলেন, ‘নির্মাণাধীন এই রেলপথে পর্যাপ্ত সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ না করায় এবার বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তাই আমাদের দাবি, এলাকায় এসে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে পানি চলাচলের জন্য যথাযথ স্থানে আরও ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ করা হোক। নয়তো ভবিষ্যতে বন্যায় এসব এলাকায় আমাদের আরও বেশি ক্ষতি হবে।’
স্থানীয় এক বাসিন্দা তৌহিদ বলেন, ‘রেলপথের কারণে পানি ঠিকমতো চলাচল করতে পারেনি। তাই বন্যায় আমাদের কেঁওচিয়ার তিন-চারটা গ্রামের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সব বাড়িঘর পানিতে ডুবে গেছে। নৌকা না থাকায় আমরা সরতেও পারিনি। তা ছাড়া রেলপথের কারণে ওপারে নৌকা দিয়ে যাওয়ার পথও ছিল না।’
বন্যায় ক্ষতির শিকার কেঁওচিয়া এলাকার রুবেল বলেন, ‘বন্যার সময় রেলপথের পশ্চিম পাশের চেয়ে পূর্ব পাশে অন্তত দুই, তিন ফুট পানি বেশি ছিল। ব্রিজ উঁচু না হওয়ায় এখানে নৌকায় চলাচলের ব্যবস্থাও নাই।’
অভিযোগ মানতে নারাজ প্রকল্প পরিচালক
কেঁওচিয়া ইউনিয়নের তেমুহনী এলাকায় গতকাল রবিবার বিকালে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন রেললাইনের কিছু অংশের পাথর ও মাটি ভেসে গেছে। আঁকাবাঁকা হয়ে গেছে রেলপথ। প্রায় দুই কিলোমিটার অংশে এভাবে পাথর ও মাটি সরে গেছে। রেলপথের কিছু অংশে গর্ত হয়ে গেছে। তবে রেলপথের দুই পাশে পানি থাকলেও এখন এর ওপর পানি নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাতকানিয়ার মৌলভীহাট থেকে কেরানীহাট পর্যন্ত দুই কিলোমিটার অংশের সড়কপথে নির্মাণাধীন রেলপথে একটি বড় সেতু, সাতটি ছোট সেতু এবং পাঁচটি বক্স কালভার্ট রয়েছে। একই অংশের রেলপথে একটি বড় সেতু এবং তিন মিটারের পাঁচটি কালভার্ট রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি কৃষি বিভাগের অনুরোধে সেচের পানি চলাচলের জন্য বাড়ানো হয়েছিল বলে জানা যায়। স্থানীয়রা বলছেন, নির্মাণাধীন রেলপথে যদি পর্যাপ্ত ব্রিজ, কালভার্ট দেওয়া হতো তাহলে বন্যায় এত ক্ষতি হতো না স্থানীয় এলাকাবাসীর।
তবে স্থানীয়দের এই অভিযোগ মানতে নারাজ দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মফিজুর রহমান। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যখন রেলপথ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল তখন সাতকানিয়া অংশে ব্রিজ-কালভার্ট বাড়ানোর দাবিতে স্থানীয়রা বিক্ষোভ করেছিল। তখন স্থানীয় কেঁওচিয়ার চেয়ারম্যানের চাহিদামতো ওনার বাড়ির কাছাকাছি স্থানেও একটি কালভার্ট করে দেওয়া হয়েছিল। ফিজিবিলিটি স্টাডি করেই এই রেলপথে যতটা প্রয়োজন ততটাই ব্রিজ, কালভার্ট করা হয়েছে। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ছোট-বড় ১৭৩টি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দোহাজারী থেকে চকরিয়া অংশ পর্যন্ত রয়েছে ছোট-বড় ৮৪টি কালভার্ট ও ১৮টি ব্রিজ।’
বন্যায় ক্ষতির পেছনে ‘তিন কারণ’
এদিকে বন্যায় নির্মাণাধীন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ ও অন্যান্য ক্ষতি হওয়ার পেছনে তিনটি কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য ও পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রকল্পটি যখন নেওয়া হচ্ছিল, তখন সঠিকভাবে প্ল্যানিং, ডিজাইন করা হয়নি। তদারকি সংস্থারও অজ্ঞতা ছিল। কেননা শুরুতে পরিকল্পনার সময়ে কোথায় কালভার্ট, কোথায় ব্রিজ, কোথায় রিটেইনিং ওয়াল হবে, তা নির্ধারণ করার কথা। কিন্তু সেগুলো সঠিকভাবে করা হয়নি। এরপর যখন কনসালট্যান্ট ডিজাইন করল, তখনও এদিকে নজর দেওয়া হয়নি। এই রেলপথ নির্মাণে দেশি ও বিদেশি যারা সুপারভিশনে ছিলেন, তাদেরও অজ্ঞতা রয়েছে। কারণ বিষয়গুলো তাদের নজরেও আসেনি। রেলপথের যেকোনো এক পাশে বেশি পানি হতেই পারে। এক্ষেত্রে রেলপথটির দুই পাশের পানি চলাচলে যদি পর্যাপ্ত বক্স কালভার্ট দেওয়া হতো, তাহলে রেলওয়ের ট্র্যাকের ওপর চাপটা পড়ত না।’
ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এখন এই পরিস্থিতিতে ভুলগুলো শুধরে নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত, এ বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ আছেন, তাদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা। যাতে তারা দ্রুত ড্রয়িং-ডিজাইন করে কাজটি শেষ করতে পারেন। কারণ সরকারের এই অগ্রাধিকার প্রকল্পটি অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উদ্বোধন করে চালু করতে হবে। সময় রয়েছে আর মাত্র দুই থেকে তিন মাস। তাই যারা সত্যিই বিশেষজ্ঞ তাদের দিয়েই বিশেষজ্ঞ টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়েতে এটার সমাধান বের করতে হবে। যাতে এটা বাস্তবায়ন করে ডিসেম্বরের মধ্যে উদ্বোধন করা যায়।’
তবে ফিজিবিলিটি স্টাডি করেই এই রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি করে বিদেশি সংস্থার মাধ্যমে রেলপথটির কোথায়, কয়টা কালভার্ট প্রয়োজন, সেসব নির্ধারণ করেই সব করা হয়েছে। তবে রেলপথটির পূর্বে বান্দরবান, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। রেলপথটির পূর্ব ও পশ্চিম দুই দিকই বন্যায় ডুবেছে। যদি রেলপথে পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকত তাহলে তো সব পানি পূর্ব দিকেই থেকে যেত; পশ্চিমে আসত না। এলেও দুই-তিন দিন পরে আসত। কিন্তু এখন তো সঙ্গে সঙ্গেই চলে আসছে।’
প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে আমরা গত ১০০ বছরের বৃষ্টিপাতের ডাটা নিয়েছি। সেটা স্টাডি করেই রেলপথের বাঁধ দেওয়া হয়েছে। সবকিছুর তথ্য-উপাত্ত নিয়েই ডিজাইন করা হয়েছে। কিন্তু এক বা দুই দিনে এই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হবে; সেটা চিন্তা করে তো পরিকল্পনা করা হয়নি। তা ছাড়া ১০০ বছরে একবার এ রকম বৃষ্টিপাত হতে পারে, সেটা নিয়ে কি ডিজাইন হবে? এবার তো স্মরণকালের রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। এ রকম রেকর্ড তো অতীতে ছিল না।’
রেলওয়ের এই প্রকল্প পরিচালক উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘বন্যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কও তো তিন দিন বন্ধ ছিল। কই সেটা নিয়ে তো কেউ প্রশ্ন তুলছেন না? আমাদের দুই কিলোমিটারের মতো রেলপথের ক্ষতি হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই এই ক্ষতির দায় বহন করবে। যেহেতু তারা এখনও প্রকল্প সম্পন্ন করে আমাদের বুঝিয়ে দেয়নি। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৮৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে ৮৮ কিলোমিটার অংশের নির্মাণকাজও শেষ হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ১৫০ কিলোমিটার। আর দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ১০০ কিলোমিটার। বর্তমানে দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথ রয়েছে। এই দোহাজারী থেকে চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, রামু হয়ে বন, পাহাড় বেয়ে ও নদীর ওপর দিয়ে রেলপথটির নির্মাণকাজ করা হয়েছে। নির্মাণাধীন ১০০ কিলোমিটারের এই ডুয়েলগেজ রেলপথের মধ্যে এখন ৮৮ কিলোমিটার রেলপথ দৃশ্যমান। ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি ৮৭ শতাংশ।
গত বছরের জুনে এই রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ না হওয়ায় নতুন সময় নির্ধারণ করা হয় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত। কিন্তু গত জুন মাসেও তা শেষ হয়নি। সম্প্রতি কালুরঘাট সেতুর সংস্কারকাজের জন্য গত ১ আগস্ট থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সেতুটি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগ।
প্রকল্পের নথির তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সালে ৬ জুলাই দোহাজারী-রামু-ঘুমধুম রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পায়। পরে ২০১১ সালের ০৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মেগা প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। পরে অর্থায়ন-সংক্রান্ত জটিলতায় বেশ কিছুদিন প্রকল্পটি থমকে থাকার পর ২০১৫ সালে অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। দোহাজারী-চকরিয়া এবং চকরিয়া-কক্সবাজার (লট-১ ও লট-২) এই দুই লটে চীনা প্রতিষ্ঠান সিআরসি (চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন) ও দেশীয় তমা কনস্ট্রাকশন্স কোম্পানি ২ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা এবং চীনা প্রতিষ্ঠান সিসিইসসিসি ও দেশীয় ম্যাক্স কনস্ট্রাকশন্স ৩ হাজার ৫০২ কোটি টাকায় যথাক্রমে ১ ও ২ নম্বর লটের কাজ পায়। পরে ঠিকাদার নিয়োগের পর ২০১৭ সালে এই মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।