× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নতুন চাকরিতে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব

শহিদুল ইসলাম রাজী

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৩ ১৪:৩৪ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

দেশে বেড়েই চলেছে মাদকের বিস্তার। তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়িয়ে পড়ছে নেশায়। এর প্রভাবে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়ানক অপরাধও বাড়ছে। ফলে মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধে সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকারসহ সব প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহলও বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। 

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি ইতিবাচক। এতে জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি মাদকগ্রহণকারীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হবে। চাকরির আশায় হলেও অনেকে মাদকদ্রব্য নেওয়া বন্ধ করবে। তারা আরও বলেন, শুধু ডোপ টেস্টে সীমাবদ্ধ থাকলেই হবে না। মাদক কারবারের নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের যেসব স্থান দিয়ে মাদকদ্রব্য প্রবেশ করে, সেগুলো চিহ্নিত করে বন্ধ করতে হবে। 

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির এক সভায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুল ওয়াহাব ভূঞা ডোপ টেস্ট-সংক্রান্ত বিধিমালার খসড়া প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) বিধিমালা, ২০২২-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগে বিবেচনাধীন রয়েছে। খসড়া বিধিমালায় মোট ৪২ বিধি এবং তফসিলে ৫টি ফরম রয়েছে।

ডোপ টেস্টের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের চাকরিতে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে; সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে চাকরিরত অবস্থায় কারও বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে মাদক নিয়েছেন মর্মে সন্দেহ হলে; গাড়িচালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়নের ক্ষেত্রে; কর্মরত গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে মাদক নিয়েছেন মর্মে সন্দেহ হলে; সরকারি-বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কারও বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে মাদক নেওয়া হয়েছে মর্মে সন্দেহ হলে; বিদেশ গমনে ইচ্ছুক কর্মীদের ক্ষেত্রে; আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়নের ক্ষেত্রে; আকাশযান বা নৌযান চালানোর লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়নের ক্ষেত্রে এবং প্রয়োজনে সরকার নির্বাহী আদেশে ডোপ টেস্টের নতুন ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে পারবে। 

ডোপ টেস্ট কী জানতে চাইলে ডিএনসির কর্মকর্তারা বলেন, মানবদেহের জৈবিক কিছু নমুনা যেমন- মূত্র, রক্ত, চুল, ঘাম, শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস, মুখের লালা অথবা মানবদেহের যেকোনো অঙ্গ বা অঙ্গের অংশবিশেষ বা দেহ-তরলের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে মাদকদ্রব্যের এবং বিপাকীয় উপাদানের উপস্থিতি (সেবন, প্রয়োগ ও ব্যবহার) অথবা অনুপস্থিতি হচ্ছে ডোপ টেস্ট। 

ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকায় কেন্দ্রীয় মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ডোপ টেস্ট কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং খুলনা বিভাগে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ডোপ টেস্ট করার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এই কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া অন্য বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকারি নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প কার্যক্রম চলছে। এসব নিরাময় কেন্দ্রে সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী শূন্য পদসমূহে নিয়োগের কাজ চলছে এবং সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনটি বিভাগীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে ডোপ টেস্ট করার জন্য জনবল নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি শনাক্তকরণ পরীক্ষা বা ডোপ টেস্ট করার লক্ষ্যে বিধিমালা বা নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে সে অনুযায়ী ডোপ টেস্ট কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। 

ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মাদকদ্রব্য প্রতিরোধ আইনে সারা দেশে ৪১ হাজার ৭৫৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার আসামি ৫১ হাজার ৮৩৪ জন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১১ হাজার ২৩১ জনকে। পলাতক ৪০ হাজার ৬০৩ জন। ডিএনসি আরও জানায়, গত বছর দেশে ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬৯ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার হয়। ইয়াবার মূল উপাদান ম্যাথঅ্যাম্ফিটামিন বা আইস উদ্ধার হয়েছে ১১৩ কেজি ৩৩১ গ্রাম। হেরোইন উদ্ধার হয়েছে ৩৩৮ কেজি। ২০২১ সালে ৫ কোটি ৩০ লাখ ৭৩ হাজার ৬৬৫টি ইয়াবা, ৩৬ কেজি ৭৯৪ গ্রাম আইস এবং ৪৪১ কেজি হেরোইন উদ্ধার হয়। উদ্ধার মাদকের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি মাদক দেশে প্রবেশ করে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। 

মাদকবিরোধী সংগঠন মাদকদ্রব্য নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮৫ থেকে ৯০ লাখ। ২০২৪ সালের আগে এই সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। সরকারি সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৭৫ থেকে ৮০ লাখ। মাদক নির্মূলে ২০১৮ সালের ৪ মে সারা দেশে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হয়। ওই সময় মাদকাসক্তের সংখ্যা ছিল ৩০ থেকে ৩৫ লাখ। বিশেষ অভিযানেও কমছে না মাদকাসক্তের সংখ্যা বরং বাড়ছে। 

মাদক বিস্তার রোধে ডোপ টেস্টের প্রয়োজনীয়তা ও বিষয়টি কতটুকু কার্যকর, জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, চাকরির ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়ে একটা ইতিবাচক অবস্থা তৈরি হবে। চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে একটা ভীতির সঞ্চার হবে। কিন্তু দেশের সব নাগরিককে ডোপ টেস্টের আওতায় আনা সম্ভব নয়। দেশকে মাদকমুক্ত করতে হলে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশে কোন ধরনের মাদকের উপস্থিতি থাকবে না। সীমান্ত থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনসহ কার্যকর ব্যব্স্থা নেওয়ার পরও দেশে মাদক প্রবেশ করছে। তার মানে বুঝতে হবে এর পেছনে বহু স্তরে বড় পৃষ্ঠপোষক রয়েছে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযানে যারা মাদকাসক্ত, যারা মাঠপর্যায়ের বিক্রেতা বা যারা বাহক তাদের গ্রেপ্তার করে। কিন্তু মাদকের নেপথ্যের গডফাদার বা পৃষ্ঠপোষকদের গ্রেপ্তার করতে পারে না। যদি তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি করতে না পারা যায় তাহলে শুধু ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা চালু করে খুব একটা সফলতা পাওয়া যাবে না। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মানজুরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক-সংক্রান্ত খসড়া বিধিমালা তৈরি করা হয়েছে। কারণ বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ডোপ টেস্টের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব নয়। এ কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে একটা খসড়া বিধিমালা তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে আইন মন্ত্রণালয় ফেরত পাঠায়। ফেরত পাঠানোর পর ডিএনসি থেকে আবার ডোপ টেস্ট বিধিমালা নিয়ে কাজ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। খসড়া বিধিমালাটি আইন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত হওয়ার পর গেজেটে জারি হওয়ার পরে বিধি অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে। 

ডোপ টেস্টের এত বড় কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বড় পরিসরে ডোপ টেস্ট করার জন্য যে ধরনের সক্ষমতা দরকার, সে বিষয় নিয়ে কাজ চলছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগার ছাড়া তিনিটি বিভাগে তিনটি রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন করা হয়েছে। এই চার জায়গায় বর্তমানে ডোপ টেস্ট করা যাবে। এ ছাড়া একটা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার কার্যক্রম চলমান। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে দেশের ২২ জায়গায় ডোপ টেস্টের পরীক্ষাগার স্থাপন করা হবে। তখন বৃহৎ পরিসরে ডোপ টেস্ট করা হবে। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি জেলায় ডোপ টেস্ট কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক হলে শিক্ষার্থীরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়া যাবে না এমন আশঙ্কায়, চাকরিপ্রতাশীরা চাকরি না হওয়ার ভয়ে মাদক থেকে বিরত থাকবে। এ ছাড়া এর মাধ্যমে মাদকাসক্তদের শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা যাবে। ফলে তারা পরবর্তী সময়ে দেশের জন্য বোঝা হবে না এবং তাদের মাধ্যমে নতুন মাদকাসক্ত তৈরি হবে না। ডিএনসির উদ্দেশ্য হচ্ছে মাদকের চাহিদা কমানো। চাহিদা কমে গেলে সাপ্লাইও কমে আসবে। আবার সাপ্লাই যদি স্বাভাবিক থাকে তাহলে ডিমান্ড অটোমেটিক তৈরি হবে। ফলে সাপ্লাই যাতে না হয়, সেজন্য বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় যৌথভাবে ও একক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আমরা চাই মাদক আসা বন্ধ করা এবং চাহিদা কমিয়ে আনা। এই দুটি বিষয়ে যুগপৎভাবে কাজ করতে পারলে স্থায়ীভাবেই দেশে মাদকের ব্যবহার বন্ধ হবে।’ 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা