× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মসলিন ফিরেছে ১৭২ বছর পর

আবু বকর রায়হান

প্রকাশ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৯:৪৫ পিএম

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ঢাকাই মসলিন হাউস। প্রবা ফটো

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ঢাকাই মসলিন হাউস। প্রবা ফটো

চরকায় সম্পদ, চরকায় অন্ন,

বাংলার চরকায় ঝলকায় স্বর্ণ!

বাংলার মসলিন বোগদাদ রোম চীন,

কাঞ্চন-তৌলেই কিনতেন একদিন।

-ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এভাবে তুলে ধরেছিলেন ঢাকাই মসলিনের ঐশ্বর্য। প্রচলিত আছে এ শিল্পকে ধ্বংস করতে মসলিন শিল্পীদের আঙুল কেটে ফেলা হতো। ফলে একসময় মসলিন বোনা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর চলে গেছে অনেক সময়। আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে সেই মসলিন। এই শাড়ি সেই অতীত মসলিনের মতোই অনায়াসে গলে যায় আংটির ভেতর। গত ২৩ জানুয়ারি ঢাকার কারওয়ান বাজারে তাঁত বোর্ডের দপ্তরে গিয়ে হাতের একটি আংটির ভেতরে একটা শাড়ি গলিয়ে দেখান প্রকল্প পরিচালক আইয়ুব আলি।

১৮৫০ সালে লন্ডনে ঢাকাই মসলিনের শেষ প্রদর্শনী হয়েছিল। এর ১৭২ বছর পরে এ দেশের তাঁতিরা আবার ফিরিয়ে এনেছেন অভিজাত মসলিন শাড়ি। এ অর্জনের পেছনে আছেন একদল গবেষক। বহু বাধা পেরিয়ে সফলতার মুখ দেখেছেন তারা। এক টুকরো আদি মসলিন কাপড়ের খোঁজে ছুটতে হয়েছে কলকাতা, লন্ডন।

মসলিনের বুনন বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছিল এর কাঁচামাল ‘ফুটি কার্পাস’। তা খুঁজে বের করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক চেষ্টায় গবেষকরা গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় একটি গাছের খোঁজ পান। চাষ করে বাড়ানো হয় তার উৎপাদন। সেই কার্পাস থেকে হস্তচালিত তাঁতে বোনা হয় অতি মিহি মসলিন সুতো। প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কুমিল্লার খাদিশিল্পী ও সোনারগাঁয়ের জামদানিশিল্পীদের। প্রকল্প সফল হওয়ায় চলতি ফেব্রুয়ারি মাসেই এই প্রযুক্তি বেসরকারি উদোক্তাদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

শুরুর কথা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ২০১৪ সালে শুরু হয় মসলিন উদ্ধারের যাত্রা। গঠন করা হয় বিশেষজ্ঞ কমিটি, যার নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. ইউসুফ আলী। তারা তুলার গাছ ‘ফুটি কার্পাস’ খুঁজে বের করার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া বর্ণনার ভিত্তিতে প্রথমে এ গাছের ছবি আঁকেন সেই শিক্ষার্থী। খবরের কাগজে সেই ছবি ছেপে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর গবেষকরা গাজীপুরের কাপাসিয়ার একটি গাছের সঙ্গে আঁকা ছবির মিল খুঁজে পান। তারপর শুরু হয় মসলিনের নমুনা খোঁজার কাজ। এক টুকরো নমুনা পেতে বাংলাদেশ আর কলকাতার বিভিন্ন স্থানে ঘোরেন গবেষকরা। নমুনা খুঁজে পেতে তারা যখন বলতে গেলে ব্যর্থ, তখনই সুখবর দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি জানান, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে তিনি বিখ্যাত এই কাপড়ের নমুনা দেখেছেন। এবার লন্ডন ছুটে যান গবেষকরা। সেখানে মসলিন কাপড়ের নমুনা ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন তথ্য পান তারা। লন্ডন থেকে সংগৃহীত মসলিন কাপড়ের ডিএনএ সিকোয়েন্স বের করা হয়, যার সঙ্গে কাপাসিয়ার সেই গাছটির মিল পান তারা। একপর্যায়ে গবেষকরা নিশ্চিত হন, সেটিই সেই ফুটি কার্পাস।

মসলিনের জন্য চাই ৫০০ কাউন্টের সুতো। শুরু হয় ৫০০ কাউন্টের সুতো উৎপাদনের কর্মযজ্ঞ। ১  হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সুতার ওজন যদি ২ গ্রাম হয়, তাহলে ১  হাজার মিটারকে ২ দিয়ে ভাগ করলে হয় ৫০০ কাউন্ট।

জামদানি শাড়ির সুতো ৩২ থেকে ২৫০ কাউন্টের হয়ে থাকে। মেশিনে বোনা শাড়ির সুতো ২৪ থেকে ৪০ কাউন্টের হয়। অর্থাৎ এসব সুতো মসলিনের তুলনায় অনেক বেশি মোটা। এ যুগে তাহলে ৫০০ কেউন্টের মতো অত সূক্ষ্ম সুতো কীভাবে বোনা যাবে? মেশিনে সেটা সম্ভব না। আবার এখন হাতে সুতো তৈরি হয় না বললেই চলে। গবেষকরা এবার কুমিল্লার খাদিশিল্পী আর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের জামদানিশিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিলেন। কারণ এই শিল্পীরা এখনও হাত দিয়ে সূক্ষ্মভাবে শাড়ি বোনেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একদল নারীকে প্রস্তুত করা হয় মসলিন সুতো তৈরির জন্য। এবার কাপড় বোনার পালা।

নারায়ণগঞ্জে এমন দুজন তাঁতি মেলে, যারা সূক্ষ্মভাবে জামদানি তৈরি করেন। তারাও এত মিহি সুতোর মসলিন বানাতে সাহস পাচ্ছিলেন না। ধাপে ধাপে অনেক কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তাদের। একপর্যায়ে রুবেল ও ইব্রাহিম নামে এই দুই তাঁতি ১৭১০ সালে বোনা শাড়ির নকশা দেখে হুবহু একটি শাড়ি বুনে ফেলেন।

ঢাকাই মসলিন হাউস প্রতিষ্ঠা

গবেষণায় সফলতা পাওয়ার পর শুরু হয় আরও বড় কর্মযজ্ঞ। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উদ্যোগে ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ঢাকাই মসলিন হাউস’। মসলিন কাপড় বুনতে আলাদা পরিবেশ ও সময় লাগে। সেদিকে লক্ষ রেখে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই প্রতিষ্ঠান।

প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত চলে তুলা থেকে সুতো তৈরি আর কাপড় বোনার কাজ। তুলা থেকে মিহি সুতো তৈরির কাজ করেন ২৮০ জন নারী। আর ২৩ জন তাঁতি বোনেন শাড়ি। এখন পর্যন্ত ঢাকাই মসলিন হাউসে ১৬টি শাড়ি আর ১০টি ওড়না তৈরি হয়েছে।

১ হাজার টাকা মজুরিতে একটি জামদানি কাপড় তৈরির কারখানায় কাজ করতেন সোনারগাঁয়ের দম্পতি মুকসেদ-রিনা। তবে মসলিনে কাজ করে ইতিহাসের অংশ হতে ৫৫০ টাকা মজুরিতেই রাজি হন তারা। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সঙ্গে কথা হয় এই দম্পতির। তারা বলেন, মসলিনে কাজ করা তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। তাদের হাত ধরে মসলিন ফিরে আসছে, এটা ভাবতেই তারা গর্বিত।

প্রতিটা শাড়িতে খরচ

প্রকল্প পরিচালক আইয়ুব আলি বলেন, প্রতিটি মসলিন শাড়ি বানাতে ৩ মাস থেকে ১০ মাস পর্যন্ত সময় লাগছে। খরচ পড়ছে ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা। নকশা করা শাড়ি তৈরিতে লাগছে প্রায় ৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে একটি পাঁচ হাত ওড়না নকশাসহ বানাতে খরচ পড়ছে প্রায় ৫৪ হাজার টাকা। আর নকশা ছাড়া ১২ হাত ওড়না বানাতে খরচ প্রায় ৭০ হাজার টাকা।

নবযাত্রায় মসলিনের ভবিষ্যৎ

ঢাকাই মসলিন তৈরিতে বর্তমানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। তবে শিগগির বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে মসলিন তৈরির ফর্মুলা হস্তান্তর করা হবে বলে জানান বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. ইউসুফ আলী। তাতে ব্যাপকভাবে উৎপাদন বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। 

চেয়ারম্যান বলেন, ‘মসলিনের উৎপাদন খরচ এখন খুবই বেশি। এটা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই। আমরা আমাদের আবিষ্কার বেসরকারি খাতে ছড়িয়ে দেব। তাহলে আস্তে আস্তে খরচ কমে আসবে হয়তো।’

শ্রুতি আছে, একটা সময় ছিল যখন মানুষ সোনার বদলে ‘এক কাপ’ মসলিন চাইতেন। হয়তো সেই সময় খুব বেশি দূরে নয়, যখন আবারও বাংলাদেশের হাত ধরে বিশ্বের সবার কাছে পৌঁছে যাবে এই ঐতিহ্য। ‘কাপ’ কিংবা ‘দেশলাই বাক্সে’ ভরেই প্রিয়জনকে দেওয়া হবে ঢাকাই মসলিন। সেকালে দেশলাই বাক্স আজকের মতো এতটা ছোট ছিল না যদিও।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা