বিষাক্ত খেলনা নিষিদ্ধ
প্রতীকী ছবি
গ্রাম থেকে শহর সবখানেই যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ায় এবং বাবা-মায়ের কর্মব্যস্ততার কারণে শিশুদের সময় কাটানোর অন্যতম সঙ্গী হয়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের খেলনা। তবে এসব খেলনার অনেকগুলোতেই ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি থাকায় শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার গত ২৩ জুন শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিষাক্ত শিশু খেলনার আমদানি, উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করেছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে খেলনা আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাত করতে হবে। গেজেট প্রকাশের দুই মাসের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, চার বছর বয়সী ছেলেকে প্রায়ই
খেলনা কিনে দিতে হয়। দোকানে প্রদর্শিত খেলনা দেখে শিশুরা সহজেই আকৃষ্ট হয়। তিনি বলেন,
“আমরা অভিভাবকরা খেলনা কেনার সময় সেটি বিষাক্ত কি না, তা ভাবি না। তাই ক্ষতিকর খেলনা
বন্ধ হলে শিশুদের জন্যই ভালো হবে।”
ধানমন্ডির বাসিন্দা বেলায়েত হোসেনের ছয় বছর বয়সী ছেলে ও চার বছর বয়সী
মেয়ে অধিকাংশ সময় প্লাস্টিকের খেলনা নিয়ে কাটায়। তিনি বলেন, “খেলনার ক্ষতিকর দিক নিয়ে
আগে কখনও ভাবিনি। সরকারের সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হওয়া দরকার। পাশাপাশি শিশুদের
জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খেলনা উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে।”
কী পাওয়া গিয়েছিল গবেষণায়
‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (এসডো)
ও ব্যান টক্সিকস, ফিলিপাইনের যৌথ গবেষণায় গত বছরের অক্টোবরে ১৫০টি খেলনার নমুনা এক্স-রে
ফ্লুরোসেন্স পরীক্ষায় বিশ্লেষণ করা হয়। এতে প্রায় সব নমুনাতেই পারদ, সিসা, ক্যাডমিয়াম,
আর্সেনিক, ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা যায়, একটি পানির কাপে ১ হাজার ৩৮০ পিপিএম সিসা, ২৪৭
পিপিএম আর্সেনিক ও ১ হাজার ৩৯০ পিপিএম ক্রোমিয়াম ছিল। স্টেশনারি ব্যাগে পাওয়া যায় ৫৮০
পিপিএম সিসা, ১ হাজার ২৮০ পিপিএম ব্যারিয়াম ও ৮৮ পিপিএম পারদ। একটি পুতুল সেটে ১৬০
পিপিএম সিসা ও ১ হাজার ৫০০ পিপিএম ক্রোমিয়াম এবং পানির মগে ২২০ পিপিএম সিসা, ৩১৫ পিপিএম
ক্যাডমিয়াম ও ১ হাজার ৬৮০ পিপিএম ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। প্লাস্টিকের বর্ণমালার সেটের
অক্ষরেও ছিল ৬৬০ পিপিএম সিসা।
গবেষকদের মতে, সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৯০ পিপিএম, ক্যাডমিয়াম ৭৫,
পারদ ৬০, ক্রোমিয়াম ৬০, আর্সেনিক ২৫ এবং ব্যারিয়াম ২৫০ পিপিএম। অথচ পরীক্ষিত খেলনাগুলোতে
এসব ধাতুর মাত্রা ছিল নিরাপদ সীমার অনেক ওপরে।
এসডোর অভিনন্দন
শিশুদের খেলনার জন্য বাধ্যতামূলক জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড কার্যকরের
সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এসডো। সংস্থাটির মতে, এখন থেকে দেশে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত
সব খেলনার জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) বাধ্যতামূলক
সনদ নিতে হবে। এর ফলে শিশুদের ক্ষতিকর রাসায়নিকের ঝুঁকি কমবে এবং নিরাপদ খেলনার প্রাপ্যতা
বাড়বে। একই সঙ্গে দেশের খেলনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আরও
সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
বিষাক্ত খেলনায় স্বাস্থ্যগত ক্ষতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী
ধাতু শিশুদের শরীরে সহজেই প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে
এসব রাসায়নিক জ্ঞানীয় ও স্নায়বিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সিসা কিডনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক
বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, ক্যাডমিয়াম শ্বাসযন্ত্র, কিডনি ও হাড়ের ক্ষতি করে। পারদ
স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, আর ক্রোমিয়াম ত্বকে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি
করতে পারে।
কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা
বিএসটিআইয়ের সিএম উইংয়ের (হালাল সার্টিফিকেশন) উপপরিচালক এসএম আবু
সাঈদ বলেন, অধিকাংশ প্লাস্টিকের খেলনা ফুড-গ্রেড উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় না। পুনর্ব্যবহৃত
প্লাস্টিকের রঙ ও খেলনাকে আকর্ষণীয় করতে ব্যবহৃত সিসা শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক মান নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ
বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, শিশুদের জন্য বিষাক্ত
খেলনার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও সচেতনতা কার্যক্রম চলছিল। সরকারের
বাধ্যতামূলক মানদণ্ড নির্ধারণ এ ক্ষেত্রে বড় অর্জন। এখন এটি শুধু স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ
নয়, আইনি বাধ্যবাধকতা হওয়ায় বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।