× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বরিশাল সিটি করপোরেশন

নকশা অনুমোদনের পর ৬শ কোটি টাকা বিনিয়োগ সম্ভাবনা

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও শাকিল মাহমুদ, বগুড়া থেকে

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

বরিশাল সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসনের উদ্যোগে একসঙ্গে ৩৩০টি ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইট থেকে

বরিশাল সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসনের উদ্যোগে একসঙ্গে ৩৩০টি ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইট থেকে

বরিশাল নগরীতে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তায় বহু বছর ধরে আটকে থাকা ভবনের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অবশেষে গতি ফিরেছে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসনের উদ্যোগে একসঙ্গে ৩৩০টি ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এতে নগরজুড়ে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী ও নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর ফলে এ নগরীতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হতে পারে। এ সিদ্ধান্তের পর কোথাও কোথাও ইতোমধ্যেই নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, অনেক স্থানে আবার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।

সাত বছর ধরে জমেছে নকশার ফাইল

বরিশাল সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-১৯৯৬ অনুযায়ী জমা হওয়া প্রায় ৭০০টি নকশার আবেদন বিভিন্ন কারণে বছরের পর বছর ঝুলে ছিল। সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর প্রায় পাঁচ বছরের মেয়াদে হাতে গোনা কয়েকটি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তী মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহর প্রায় সাত মাসের সময়কালেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা দুই বিভাগীয় কমিশনারের সময়ও অনেক আবেদনপত্র জমা হয় কিন্তু অনুমোদনের সংখ্যা বাড়েনি।

ফলে একদিকে ভবনমালিকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন, অন্যদিকে নির্মাণশিল্পে জড়িত শ্রমিক, ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়। অনেক নির্মাণশ্রমিক কাজের অভাবে পেশা পরিবর্তন করেন।

সিটি করপোরেশনের স্থপতি সাইদুর রহমান লুসান জানান, ‘বর্তমান প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিণ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৩০টি নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫ তলার ৫৪টি ভবন, ৬ তলার ১৫টি এবং ১ থেকে ৪ তলার ১৩৭টি ভবনের নকশা। পাশাপাশি ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জটিলতায় আটকে থাকা আরও ১২৪টি নকশাও নিষ্পত্তি করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ফাইলগুলো পর্যালোচনা করে পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।’

অর্থনীতিতে নতুন গতি

নির্মাণ খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নকশা অনুমোদনের এই উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বরিশাল সিমেন্ট ও লৌহজাত দ্রব্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান হিরা বলেন, ‘নকশা অনুমোদনের কারণে ৩০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হতে পারে। যেসব শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছিলেন এবং যেসব ব্যবসায়ী ব্যবসা পরিবর্তনের কথা ভাবছিলেন, তাদের জন্য এটি আশার খবর। ভবন নির্মাণ শুরু হলে রড, সিমেন্টসহ সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা বাড়বে।’ তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে নির্মাণ খাতের মন্দার কারণে অনেক ব্যবসায়ী লোকসানের মুখে পড়েছেন। নকশা অনুমোদনের গতি বাড়লে পুরো খাত আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।’

বিল্ডিং ডিজাইন সিস্টেমের স্থপতি ও বুয়েট স্নাতক মিলন মণ্ডল বলেন, ‘বর্তমান বাজারদরে প্রায় ২ হাজার ২০০ বর্গফুট আয়তনের একটি পাঁচতলা ভবন নির্মাণে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা ব্যয় হয়। সেই হিসেবে ৩০০টির বেশি নকশা অনুমোদনপ্রাপ্ত ভবনে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

ভোগান্তির অবসান চান নগরবাসী

দক্ষিণ আলেকান্দা এলাকার বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবু ইউসুফ প্রায় আড়াই বছর অপেক্ষার পর নকশার অনুমোদন পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চার শতাংশ জমিতে পাঁচতলা ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছিলাম। কতবার যে নগর ভবনে গিয়েছি তার হিসাব নেই। একসময় চরম হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। বাধ্য হয়ে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলাম, তবু কাজ হয়নি। অবশেষে গত মাসে অনুমোদন পেয়েছি এবং সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণকাজ শুরু করেছি।’ তার মতো আরও অনেক আবেদনকারী দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির অভিযোগ করেছেন। তাদের ভাষ্য, বছরের পর বছর ফাইল আটকে থাকায় নির্মাণ ব্যয়ও বেড়ে গেছে।

নগরীর রূপাতলী এলাকার এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যখন আবেদন করেছিলাম তখন যে বাজেট ছিল, এখন তার চেয়ে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি খরচ হবে। শুধু প্রশাসনিক জটিলতায় আমাদের এই আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।”

‘অভিযোগ এসেছে অর্থ আদায়েরও’

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রেস সচিব সাকলাইন মোস্তাক বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে নকশা অনুমোদন না হওয়ায় নগরীতে নির্মাণ ও আবাসন খাতে স্থবিরতা নেমে আসে। মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে অর্থ আদায়ের অভিযোগও আমাদের কাছে এসেছে। আমরা চাই নগরবাসী সরাসরি সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করুক এবং অনৈতিক লেনদেন থেকে বিরত থাকুক।’

ডিজিটাল হচ্ছে পুরো প্রক্রিয়া 

সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে যেন কোনো আবেদন বছরের পর বছর ঝুলে না থাকে, সেজন্য নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করা হচ্ছে।

বর্তমান প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিণ বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ভবনের প্ল্যান অনুমোদনের জন্য একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছি। ডিজিটাল পদ্ধতিতে আবেদন গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করা হবে। সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই অনুমোদন দেওয়া যাবে।’ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সফটওয়্যার চালু হলে আবেদনকারী অনলাইনেই নিজের ফাইলের বর্তমান অবস্থা জানতে পারবেন। ফলে অযথা দাপ্তরিক দৌড়ঝাঁপ কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে।

এখনও অপেক্ষায় ৪০০ নকশা

যদিও ইতোমধ্যে ৩৩০টি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তবু এখনও প্রায় ৪০০টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। স্থপতি সাইদুর রহমান লুসান বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীর চাহিদা বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়। তখন সংশোধনের প্রয়োজন পড়ে। গ্রাহকদের বিষয়টি বোঝানোও কঠিন হয়। এ কারণেই অনেক সময় দেরি হয়।’ তার মতে, নিয়ম মেনে নকশা প্রস্তুত করা হলে অনুমোদনের সময়ও কমে আসবে।

সুশাসনের প্রশ্ন

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের সমন্বয়ক রফিকুল আলম বলেন, “যদি কাগজপত্র ঠিক থাকে, তাহলে একটি ভবনের নকশা অনুমোদনে দেড় থেকে দুই মাসের বেশি সময় লাগার কথা নয়। বর্তমান প্রশাসন সেটি প্রমাণ করেছে।”

আশার আলো দেখছেন শ্রমিকরা

নগরীর নির্মাণ শ্রমিকদের সঙ্গেও কথা হয়। তারা জানান, গত কয়েক বছরে কাজের সংকটে অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছেন। কেউ রিকশা চালিয়েছেন, কেউ দিনমজুরের কাজ করেছেন।

নথুল্লাবাদ এলাকার নির্মাণ শ্রমিক মো. জসিম বলেন, “নতুন ভবনের কাজ শুরু হলে আবার আগের মতো কাজ পাব বলে আশা করছি।”

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকশা অনুমোদনের স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ভবনের নকশা অনুমোদনের এই গতি তাই শুধু প্রশাসনিক সাফল্য নয়, বরং বরিশালের স্থবির অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চারের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা