× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল সীমান্ত

কবির হোসেন

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

ডাকাতি, অপহরণ ও খুনের মতো অপরাধ করার পর দেশের নানা প্রান্তে থেকে সন্ত্রাসীরা গা-ঢাকা দিচ্ছে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ডাকাতি, অপহরণ ও খুনের মতো অপরাধ করার পর দেশের নানা প্রান্তে থেকে সন্ত্রাসীরা গা-ঢাকা দিচ্ছে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দিন দিন সীমান্ত যেন অপরাধের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ডাকাতি, অপহরণ ও খুনের মতো অপরাধ করার পর দেশের নানা প্রান্তে থেকে সন্ত্রাসীরা গা-ঢাকা দিচ্ছে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। এরপর গ্রেপ্তার এড়াতে সুযোগ বুঝে পাড়ি দিচ্ছে প্রতিবেশী দেশে।

অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে তাদের এ কাজে সহায়তা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও কতিপয় অসাধু বিজিবি সদস্য।

একইভাবে অপরাধীরা দেশেও ফিরছে বিদেশ থেকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক, সোনা ও অস্ত্র পাচারের মতো কাজে।

স্থানীয়রা বাহক হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সন্ধান পাচ্ছেন না প্রকৃত চোরাকারবারিদের। কারণ কাটআউট পদ্ধতিতে চোরাচালান হওয়ায় বাহকের কাছেও প্রকৃত বা মূল কারবারি সম্পর্কে কোনো তথ্য মিলছে না। এসব কারণে সীমান্তে অপরাধ কমানোও সম্ভব হচ্ছে না। 

একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী স্থানীয় সহজ-সরল শ্রেণির মানুষ দরিদ্রতার কারণে এই ভয়ংকর অপরাধে জড়াচ্ছে। তারা জীবনধারণের জন্য সামান্য টাকাতেই সীমান্তের এপার থেকে ওপারে মাদক, অস্ত্র ইত্যাদি নিষিদ্ধ জিনিস পাচার করছে। সীমান্তে বেকার যুবকদের জন্য বৈধভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে এই বিপজ্জনক ও অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্তে অপরাধ কমাতে হলে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্তে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যাও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়েও এ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। 

এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। সম্প্রতি আমরা একটি গবেষণা কাজ শুরু করেছি। আমরা দেখেছি, সীমান্তে প্রান্তিক গোষ্ঠী, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি। তারা মানব পাচার, অস্ত্র পাচার ও মাদক পাচারের মতো বড় বড় অপরাধকে আয়ের উৎস বলে মনে করছে। আর এ সুযোগটাই নিচ্ছে বড় বড় গডফাদার ও অপরাধী চক্রগুলো।”

তিনি বলেন, “সীমান্তে নিরাপত্তার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। সীমান্তে যে অপরাধগুলো হচ্ছে সেগুলোর সঙ্গে দুই প্রান্তের রাজনৈতিক শক্তি এবং প্রভাবশালী চক্র জড়িত। আমাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো বা হটস্পট গুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। সেজন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্তে ফোর্সের নিয়োজন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।”

এ ছাড়া দুই দেশের কূটনীতিক পর্যায়ের আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের চিহ্নিত অপরাধীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে মত দেন এই অপরাধ বিশ্লেষক। 

দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, পাহাড়ি অরণ্য এবং দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় ও ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা আন্তঃদেশীয় অপরাধ, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ের হটস্পট হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের (বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি) গহিন, দুর্গম পাহাড়ি অরণ্য। বিশেষ করে কক্সবাজার (টেকনাফ ও উখিয়া) সীমান্ত অঞ্চলের দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গোলযোগকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।

বিজিবির তথ্যমতে, বাংলাদেশে সীমান্তবর্তী জেলা ৩২টি এবং উপজেলা ১১৫টি। এর মধ্যে ভারতের পাঁচটি রাজ্যের স্থলসীমান্ত ৪ হাজার ৯৭ কিলোমিটার। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ২ হাজার ২১৭ কিমি, ত্রিপুরার সঙ্গে ৮৫৬ কিমি, মেঘালয়ের সঙ্গে ৪৪৩ কিমি, মিজোরামের সঙ্গে ৩১৮ কিমি ও আসামের সঙ্গে ২৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের। অন্যদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত ২৭১ কিলোমিটার। বান্দরবান ও কক্সবাজারÑ এ দুই জেলার সঙ্গে, বিশেষত নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা, থানচি, উখিয়া, শাহপরীর দ্বীপ ও টেকনাফ উপজেলার সীমান্তের সঙ্গে শুধু মিয়ানমারের সীমান্তই যুক্ত। অন্যদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ও চীন রাজ্য বাংলাদেশ সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত। বিজিবির একজন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ওপারে পুরো সীমান্ত জুড়ে ভালো সড়ক ও যাতায়াত ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আমাদের অংশে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না। কাঁটাতারের বেড়াও নেই। এসব কারণে বিজিবির সদস্যদের চলাচলে অনেক দুর্গম পথ ঠেলে যেতে হয়। অভিযানও বিলম্বিত হয়।’ 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের ২৯টি সীমান্তবর্তী জেলার প্রায় ১৬২টি রুট দিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রবেশ করছে বিভিন্ন সময়ে। সাগরপথ ও আকাশপথেও মাদকের চোরাচালান আসছে। কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া এবং সাগরপথ দিয়ে ঢুকছে ইয়াবা ও আইস। ফেনসিডিলের চালান আসছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং যশোরের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে। হেরোইনসহ অন্যান্য মাদকের রুটের ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে উঠেছে রাজশাহীর গোদাগাড়ি ও চুয়াডাঙ্গার দশমিনা। সিলেটের সীমান্তের ওপারের আসাম থেকে আসছে গাঁজা, যা রেলপথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিন উপজেলার সীমান্তেও সক্রিয় রয়েছে মাদক পাচারকারীরা। প্রতিদিন জেলার ভারত সীমান্তবর্তী বিজয়নগর, আখাউড়া ও কসবা উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পাচার হয়ে আসছে বিভিন্ন রকমের মাদকদ্রব্য। জেলাজুড়ে বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে পাঁচ শতাধিক মাদক কারবারি। 

জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো দিয়ে পাচার হয়ে আসা গাঁজা, ইয়াবা, ইস্কফ সিরাপ, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ ও ফেনসিডিলসহ নানা জাতের মাদক সড়ক, রেল ও নৌপথে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ময়মনসিংহ সীমান্তেও বাড়ছে মাদকের চোরাচালান। সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া ও ভারত সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, ভারতীয় মদ, এসকাফ সিরাপসহ নানা ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করছে। মৌলভীবাজারের পাঁচটি উপজেলার প্রায় ২৭১ কিলোমিটার এলাকা ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী। এসব এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে মাদকদ্রব্য ও পণ্য বাংলাদেশে আসছে। 

বিজিবি-৫২ ব্যাটালিয়ন সূত্রে জানা যায়, গত এক বছর দুই মাসে তারা ১৭২টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে প্রায় ১২ কোটি ৪৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ করা হয়েছে। 

তবে সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তে অপরাধ শূন্যে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সীমান্ত জুড়ে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়াসহ একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়ার চিন্তাও রয়েছে। গত ১৭ জুন জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যকার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই ধরনের বেড়া ভারত সীমান্তেও নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দেশের জাতীয় স্বার্থরক্ষা এবং সীমান্ত এলাকায় সব ধরনের অপরাধ ‘শূন্যের কোঠায়’ নামিয়ে আনতেই এ ধরনের পদক্ষেপ।’

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত হত্যা, পুশইন, মাদক ও চোরাচালান ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকা বা হাই রিস্ক জোন চিহ্নিত করা হয়েছে। বিজিবির প্রতিটি বিওপির অধীনে থাকা পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার এলাকায় ২৪ ঘণ্টা নজরদারি রাখা হচ্ছে। সীমান্তের কৌশলগত স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী পর্যবেক্ষণ পোস্ট বসিয়ে রাতের টহল বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে ‘বর্ডার কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ’ গঠন করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্ট গার্ড, পুলিশ, র‌্যাব এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “সীমান্তে চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে। ৭০-এর বেশি প্যাট্রোলিং টিম অস্ত্র-গুলিসহ নিয়মিত ও সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে। কোনো কোনো সময় প্যাট্রোলিং টিম বাড়িয়ে ১২০০ করা হচ্ছে। এসব টহলদল ২৪ ঘণ্টা অভিযান চালাচ্ছে।”

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা