দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা প্রকল্পে বেইজিংয়ের নতুন আগ্রহ বাংলাদেশের সম্ভাবনার দ্বার খুললেও বাস্তবায়নের পথে ভারতের অবস্থান ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মধ্য দিয়ে বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা গতি পেতে শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনার সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্পে বেইজিংয়ের নতুন এই আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুললেও বাস্তবায়নের পথে ভারতের অবস্থান ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হলে পানি বণ্টনের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ তার নিজস্ব ভূখণ্ডের ভেতর দেশের জনগণের প্রয়োজনে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাইছে। এর সঙ্গে অন্য কোনো দেশের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। আগে ভারতের সঙ্গেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, এখন চীনের সঙ্গে হচ্ছে। যেহেতু চীন কারিগরি সহায়তাসহ সব ধরনের সহযোগিতার কথা বলছে, তাই এটি নিয়ে অন্য কোনো দেশের ভিন্ন চিন্তার কারণ নেই। তবে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিকগুলো বিবেচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে ভারতের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। যৌথ নদী কমিশন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ৫৪টি নদীর অন্যতম তিস্তা। ভারতের সিকিমের সো লামো হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রংপুর জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে নদীটি।
পরে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারীর কাছে এটি ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্পে তিস্তার উপকূল ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রীষ্মকালে পানিসংকট দূর করতে বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলা হতে পারে।
নির্বাচনি ইশতেহারে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া বিএনপি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর ছিল মালয়েশিয়ায়। সেখান থেকেই তিনি চীনে যান।
এই সফরে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডোর এবং তিস্তা প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
তবে এর সফলতার জন্য ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতে জোর
জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) সদস্য এবং বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এই প্রকল্পে দুটি বড় বিবেচনার বিষয় রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে উজানে গজলডোবা ব্যারাজ এবং আমাদের অংশে ডালিয়া ব্যারাজ থেকে কতটা পানি ছাড়া হবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে তিস্তা নিয়ে কোনো চুক্তি না থাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে গেলে প্রকল্পে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, ২০১১ সালে একটি খসড়া চুক্তির কথা হয়েছিল, কিন্তু সেটি আর এগোয়নি। শুষ্ক মৌসুমের পানি ধরে রাখা গেলে প্রকল্পের সুফল অনেক বেশি পাওয়া যাবে। একটি প্রবহমান নদীতে উজান থেকে পানি আসাটা নদীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য জরুরি। ২০১১ সালের খসড়া চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ৩৮.৫ শতাংশ, ভারতের জন্য ৪১.৫ শতাংশ এবং নদীর স্বাস্থ্যের জন্য ২০ শতাংশ পানি বরাদ্দ রাখার কথা ছিল।
ড. সাইফুল ইসলাম মনে করেন, পানির প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে অবশ্যই উজানের দেশ ভারতের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। তিস্তার উজানে শুধু ভারতই রয়েছে, তাই চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। এটি মূলত একটি অভ্যন্তরীণ প্রকল্প, যা পানি আসা নিশ্চিত করে না, বরং পানি ধরে রাখাকে নিশ্চিত করে। কতটা পানি আসবে, তা ভারতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারণ করতে হবে। দুটি বিষয় একে অপরের পরিপূরক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ট্রান্সবাউন্ডারি বা আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টনে আলোচনার বিকল্প নেই। যৌথ নদী কমিশন ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এই আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা পায়।
ভারত-চীন উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন
চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে দুটি ভাগে দেখছেনÑ পানি বণ্টন ও পানি ব্যবস্থাপনা।
তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “পানির বণ্টন বা হিস্যা নিশ্চিত না হলে ব্যবস্থাপনা কীভাবে সম্ভব? আগে বুঝতে হবে প্রকল্পের রূপরেখা কী হবে। পানি পাব না ধরে নিয়ে প্রকল্প করলে এক রকম হবে, কিন্তু ভারত যদি পানি ছেড়ে দেয়, তখন সেই পরিস্থিতি আমরা সামলাতে পারব কি না, তা-ও ভাবতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “ভারতের সঙ্গে বৈরিতা করে বা চীনের সঙ্গে প্রকল্প করে আমাদের খুব একটা লাভ হবে না। অনেকেই ভাবেন, চীনের সহযোগিতা নিলে ভারত ছাড় দেবে নাÑ এটি ভুল ধারণা। আমাদের চীন ও ভারত উভয়ের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
“ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলে পানি বণ্টনে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। আবার চীনকে দিয়ে কাজ করালেও ভারত অহেতুক বাধা দেবে না। কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করলে তারা চাইলেই বিষয়টি আমাদের জন্য কঠিন করে দিতে পারে। তাই কারও সঙ্গেই সম্পর্ক যেন অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়, সেদিকে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে।”
চীনের অন্য চিন্তা নেই, পর্যবেক্ষণ করছে ভারত
সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ঢাকার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তিস্তার এই বৃহৎ প্রকল্পে চীন এগিয়ে এসেছে। এর বাইরে চীনের অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।
ভারতের উদ্বেগ বা উজান থেকে পানি না ছাড়লে প্রকল্পটি ফলপ্রসূ হবে কি না— এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটি আমাদের বিবেচনার বিষয় নয়। বাংলাদেশের প্রত্যাশা অনুযায়ীই চীন এগিয়ে এসেছে।”
অন্যদিকে চীনা রাষ্ট্রদূতের এই ব্রিফিংয়ের পরদিন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।
জবাবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর যেকোনো ঘটনাপ্রবাহ ভারত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
তিনি আরও বলেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের মনোভাব আগেই বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের যুক্ত করার পরামর্শ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন মনে করেন, চীন কারিগরি সহায়তা দিলেও পানির উৎস যেহেতু ভারত, তাই তাদেরও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যেতে পারে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, “চীন স্পষ্ট জানিয়েছে, এটি কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে নয়। আমাদের পানির প্রয়োজন, তাই ভারত বা চীন ছাড়াও নেপাল-ভুটানকে যুক্ত করে একটি মাল্টি-মডেল বা যৌথ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এটি একটি সাধারণ সম্পদের বিষয় এবং পরিবেশগতভাবে আমরা সবাই সংযুক্ত।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু তারা কিছু করছে না বলেই আমরা চীনের সহযোগিতা নিচ্ছি।
“এটি তো নতুন কিছু নয়। আগের সরকারগুলোর সময় থেকেই এই স্টাডি চলছিল। আমাদের যে প্রয়োজন আছে, সেটি স্পষ্ট। আমরা এখন কারিগরি সহায়তা চাইছি, আর্থিক সহায়তা হয়তো চীন, এডিবি বা বিশ্বব্যাংক থেকে পাওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ তো আর বসে থাকতে পারে না। তাই এটি ভারতের জন্যও একটি বার্তা হতে পারে।