মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল। ছবি: সংগৃহীত
যানজট নিরসনে ঢাকার চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালকে শহরের বাইরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকরে কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্টরা। হেমায়েতপুরে স্থানান্তরিত হবে গাবতলী টার্মিনাল, সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী টার্মিনাল যাবে কাঁচপুরে, ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান টার্মিনাল স্থানান্তরিত হবে কেরানীগঞ্জে আর মহাখালী টার্মিনাল প্রথমে পূর্বাচলে ও পরে টঙ্গীর কাছাকাছি স্থানান্তরিত হবে।
টার্মিনাল সরানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত সূত্র জানিয়েছে, এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে দুই ধাপে। প্রথম ধাপে টার্মিনালে চলাচলের বাড়তি বাস বা ‘গ্যাপে’র বাসগুলো ঢাকার বাইরে ডিপো নির্মাণ করে সেখানে রাখা হবে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্বিতীয় ধাপে পুরো টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া হবে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী টার্মিনালের বাড়তি বাস কাঁচপুরে স্থানান্তরে বালু ভরাটের কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে ৫০০ বাস অবস্থান করতে পারবে। ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালের ডিপো হিসেবে কেরানীগঞ্জ জেলখানার বিপরীত পাশে বাঘাইর-তেঘরিয়া আন্ডারপাস এলাকায় প্রক্রিয়া চলছে, আপাতত জমি ভাড়া নেওয়ার। মহাখালী বাস টার্মিনাল ডিপোর জন্য পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকায় ১৯ নম্বর সেক্টরে জায়গা নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে। মহাখালী টার্মিনাল যাবে দিয়াবাড়ী আশুলিয়ার শেষ অংশে আর গাবতলী টার্মিনাল স্থানান্তর হতে পারে হেমায়েতপুরে।
এরই মধ্যে টার্মিনালগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য জায়গা খুঁজতে মাঠে নেমেছে সরকারের প্রতিনিধি দল। বুধবার বিকালে পূর্বাচল ১৯ নম্বর সেক্টর, দিয়াবাড়ি, চুনকুটিয়া, জেলখানার বিপরীতে বাঘাইর-তেঘরিয়া আন্ডারপাস এলাকা, হাসনাবাদ (ইকুরিয়া)-কাঁচপুর ও ফুলবাড়িয়া এলাকা ঘুরে দেখে দলটি।
এই পরিদর্শন কার্যক্রমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করা হবে; এরপর দুই ধাপে স্থানান্তরের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। পরিদর্শন দলে ছিলেন পাবনা-৫ আসনের এমপি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, স্বরাষ্ট্র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, রাজউকের চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আনিসুর রহমান এবং ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। গত ১৫ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ঢাকার যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন নিয়ে সভা হয়। সেখানে ঢাকার চারটি বাস টার্মিনাল দ্রুত স্থানান্তরের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
যদিও মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনাল সরিয়ে অন্য জায়গায় নেওয়ার আপত্তি রয়েছে বাস চালক ও মালিকদের। এই দুই টার্মিনালের বাস মালিকদের সুর প্রায় একই। তারা বলছেন, টার্মিনাল সরানোর কোনো প্রয়োজন নেই। এ কাজে বড় বিনিয়োগ দরকার, যা মালিকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। বরং সরকার যেটা করতে পারে তা হলোÑ টার্মিনালগুলো বর্তমানে যে জায়গায় আছে, সেখানেই পরিসর আরও বাড়াতে পারে। এটা করতে পারলে সড়কের ওপর চাপ কমবে, কমবে যানজটও। তাদের মতে, ঢাকার বাইরে টার্মিনাল গড়ে তোলার জন্য পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ যে ধরনের অবকাঠামো দরকার তা নিশ্চিত করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।
মহাখালী বাস টার্মিনালের পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “একটি রুটে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাসগুলোকে সাময়িক বা নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্রামের জন্য পূর্বাচলের নীলা মার্কেট ৩০০ ফিট সংলগ্ন একটি জায়গাকে ডিপো হিসেবে নির্ধারণ করেছে সরকার। এবং সেখানে বিভিন্ন রুটের বাসগুলো সাময়িক বিরতিতে রাখার জন্য সরকারি অবকাঠোমোও তৈরি করা হবে। তবে মহাখালী বাস টার্মিনালকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে তিনি বলেন, আপাতত এটা দরকার মনে করি না। এই টার্মিনাল প্রতিদিন প্রায় ১৬০০ বাস নিয়মিত যাত্রীকে সেবা দিচ্ছে। প্রায় ২০ বছর ধরে স্থাপন করা এই টার্মিনালের কারণে মানুষের তেমন কোনো অসুবিধার কথা শোনা যায়নি।”
এই পরিবহন নেতা আরও বলেন, “পূর্বাচলে বাসের ডিপোর জন্য সরকার আমাদের প্রস্তাব দিয়েছে, আমরা সে জায়গা দেখে ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছি। এতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে মহাখালী বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন আমরা দেখি না।”
তিনি জানান, মহাখালী টার্মিনাল সংলগ্ন প্রায় সমপরিমাণ সরকারি জমি বাস টার্মিনাল সম্প্রসারণের জন্য আগেই বরাদ্দ ছিল। সেটা ব্যবহার করলে বর্তমান বাস টার্মিনালের আয়তন প্রায় দ্বিগুণ হবে। এতে প্রধান সড়কের ওপর চাপ তৈরি হবে না।
ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম-সম্পাদক জোবায়ের আহমেদ মাসুদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ফুলবাড়িয়া ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সরকার যদি উন্নত অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে, টার্মিনাল স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বাস মালিকরা গ্রহণ করবে।” তবে বাইরে বাস টার্মিনাল স্থানান্তরে প্রাথমিকভাবে বাস মালিকরা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। বেশির ভাগ মালিকেরই অনীহা আছে।
বাস মালিক, চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার বাইরে বাস টার্মিনাল নির্মাণে বড় অংকের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিবহন মালিকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এটা সবাই সামাল দিতে পারবেন না। কারণ টার্মিনাল ভবন, টিকিট কাউন্টার ও পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণ খরচ অনেক বেশি। মূল শহরের সঙ্গে দুর্বল সংযোগ-ব্যবস্থাপনাও একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা। শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে নতুন টার্মিনাল পর্যন্ত যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হলে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়বেন। সব জায়গায় মেট্রোরেল সেবা এখনো পৌঁছায়নি। কোনো গণ-পরিবহন সারা রাত সেবা দেয় না। এছাড়া, দূরপাল্লার যাত্রীদের মূল শহরে ঢুকতে বাড়তি সময় ও টাকা খরচ করতে হবে। মালামাল নিয়ে যানবাহন পরিবর্তন করা সাধারণ যাত্রীদের জন্য ভোগান্তি হবে। নতুন একটি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হতে ও মানুষের অভ্যাসে পরিণত হতে কয়েক বছর সময় লাগে। শুরুর দিকে পর্যাপ্ত বাস বা যাত্রী না পেলে লোকসানের ঝুঁকিও রয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকির অভাব হতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। বিগত সরকারের সময়ে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ সরকার এটি বাস্তবায়ন করলে শহরের যানজট অনেকখানি কমে যাবে।”
শহরের বাইরে বাস টার্মিনাল থেকে শহরে পৌঁছাতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি জানান, মেট্রো রেল বা সিটি বাসের মাধ্যমে শহরে যাতায়াত করলে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকবে না।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মল হক চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “শহরের বাইরে বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করা হলে সাধারণ যাত্রীদের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হবে। রাত ও ভোরের ঢাকা খুব ভয়ংকর, যেখানে ছিনতাইয়ের অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া রাতের বেলা শহরের বাইরে বাস টার্মিনালে যাতায়াত করা বেশ ব্যয় বহুল। তিনি বলেন, ২০ লাখ অটোরিকশা ও ১৫ লাখ মোটরবাইক ঢুকিয়ে সরকার শহরের যানজট ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং সাধারণ যাত্রীদের সুবিধা খতিয়ে না দেখে খণ্ডিত পদক্ষেপ নিলে তা ব্যর্থ হবে।”
সরেজমিন মহাখালীতে দেখা গেছে, প্রায় ৯ একর আয়তনের আন্তঃজেলা এ বাস টার্মিনালে একসঙ্গে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি বাস পার্কিংয়ের সক্ষমতা রয়েছে। প্রায় ১৬০০ বাসের জন্য এ জায়গা বেশ অপ্রতুল। এ টার্মিনালের ময়মনসিংহগামী আলম এশিয়া পরিবহনের এক চালক জানান, টার্মিনাল শহরের কোণায় স্থানান্তর করা হলে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে। এখন টার্মিনাল শহরের মাঝামাঝি আছে।
২৫ জুন সরেজমিন গাবতলী গিয়ে দেখা যায়, বাসের কাউন্টারগুলো টেকনিক্যাল মোড় থেকে বেড়িবাঁধ-মোহাম্দপুর সড়ক পর্যন্ত বিস্মৃত। এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০টিরও বেশি পরিবহন কোম্পানির শত শত বাস দেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলে চলাচল করে। দেশের উত্তরাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলগামী বাসের প্রধান কেন্দ্র এ টার্মিনাল। হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, এনা পরিবহন, দেশ ট্রাভেলস, এস আর ট্রাভেলসসহ প্রায় ২০টি পরিবহনের বাস চালকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এসব চালকরা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, শহরের বাইরে টার্মিনাল সরিয়ে নিলে যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়ে যাবে।গভীর রাতে যাত্রীদের চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হবে।
এ টার্মিনালের শ্যামলী পরিবহনের যাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী মায়মুনা রহমান বলেন, শহরের বাইরে টার্মিনাল গেলে নারী-শিশুদের জন্য যাতায়াত করা একটি বাড়তি বিড়ম্বনা হবে। এস আর ট্রাভেলের যাত্রী মাহমুদ হোসেন বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত সবদিক বিবেচনা করে নিতে হবে। হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে।
এ বাস টার্মিনালে এস আর পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান জি রহমান শহীদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে গাবতলী টার্মিনাল স্থানান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমরা এখনো কোনো মতামত জানাইনি। গাবতলী টার্মিনাল স্থানান্তর যেহেতু দেরিতে শুরু হবে এ কারণে আমরা সময় নিচ্ছি।”
তবে তিনি বলেন, “গাবতলী বাস টার্মিনালের পাশে সরকারি পর্যাপ্ত খাস জমি রয়েছে, টার্মিনাল বর্ধিত করার জন্য আমরা এসব খাস জমির জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দিব। এতে করে টার্মিনালের আয়তন বেড়ে যাবে। তাহলে ঢাকার বাইরে টার্মিনাল স্থানান্তরের আর প্রয়োজন পড়বে না”
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “প্রথম পর্যায়ে রাজধানীর সব বাস টার্মিনাল সরানো হবে না। তবে টার্মিনালে চলাচলের বাড়তি বাস বা ‘গ্যাপে’র বাসগুলোর জন্য ঢাকার বাইরে ডিপো নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে ডিপো হিসেবে কেরানীগঞ্জ জেলখানার বিপরীত পাশে আপাতত জমি ভাড়া নিয়ে ডিপো করা হবে। সায়দাবাস বাস টার্মিনালে ডিপোর জন্য নারায়ণগঞ্জের কাচপুরে বালু দিয়ে ভরাটের কাজ চলছে। মহাখালী বাস টার্মিনাল ডিপোর জন্য পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকায় ১৯ নম্বর সেক্টরে জায়গা নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে।”
তিনি বলেন, “কয়েক বছরের মধ্যে বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরানোর প্রক্রিয়া চালু হবে। সে ক্ষেত্রে মহাখালী টার্মিনাল যাবে দিয়াবাড়ী আশুলিয়ার শেষ অংশে আর গাবতলী টার্মিনাল স্থানান্তর হতে পারে হেমায়েতপুরে।”
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, “শহরে যানজটের কারণে বাস টার্মিনালগুলো ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে যানজট কমতে পারে, তবে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে। কারণ যাত্রীদের আরামদায়ক চলাচলের ব্যবস্থা করা ও রাতের বেলা চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণে সঠিক ব্যবস্থাপনা তৈরি না করে পুরো টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া ঠিক হবে না।”