দ্বিতীয় পর্ব
খানাখন্দে ভরা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা-তারাগুনিয়া সড়ক এলাকাবাসীর দুর্ভোগের বড় কারণ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ভাঙাচোরা আর খানাখন্দে ভরা মহাসড়কগুলো। প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে লাখো মানুষ। দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অভাবে ধুলোয় আচ্ছন্ন জনজীবন। যাত্রীদের অন্তহীন দুর্দশা, দুর্ভোগের ভয়াবহতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর বিশেষ ধারাবাহিক প্রতিবেদন। খুলনা ও বরিশাল বিভাগের চিত্র নিয়ে আজ দ্বিতীয় পর্ব ।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পথ চলতে হচ্ছে যাত্রীদের। ঘর থেকে বেরিয়ে আবার সুস্থ শরীরে বাড়ি ফেরাটাই যেন বড় পাওয়া। অথচ খানাখন্দে ভরা বেহাল সড়কে অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু ও অসুস্থ মানুষের সীমাহীন কষ্টের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর চরম উদাসীনতা আর হরিলুটের এক নির্লজ্জ চিত্র। খুলনা ও বরিশালের বিভিন্ন স্থানে কোথাও ইটের বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্নমানের খোয়া, কোথাও কলাগাছ দিয়ে চলছে পাইলিং; আবার অবৈধ মাটি বাণিজ্যে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সড়ক। দুর্নীতি আর সমন্বয়হীনতার খেসারত দিতে গিয়ে প্রতিদিন আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুফাঁদে পা রাখছে লাখো মানুষ, অজানা আতঙ্কে দিন কাটছে চালকদেরও।
খুলনায় প্রবেশপথেই মৃত্যুঝুঁকি
খুলনা মহানগরীর তিনটি প্রধান প্রবেশপথের অবস্থা এখন মৃত্যুফাঁদের মতো। মোস্তফার মোড় থেকে রায়েরমহল, রূপসা ট্রাফিক মোড় থেকে খানজাহান আলী সেতু ও সোনাডাঙ্গা বাইপাসের প্রায় ৮ কিলোমিটার সড়ক খানাখন্দে ভরা। খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সমন্বয়হীনতায় ঢাকা-বরিশালসহ ১৮টি জেলার যানবাহন চরম ঝুঁকিতে চলাচল করছে। বাসচালক সরোয়ার বলেন, ‘একটু ভুল হলেই দুর্ঘটনা ঘটে, যাত্রীরাও আতঙ্কে থাকেন।’ স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেলের মতে, বড় শহরের প্রবেশপথের এমন অবস্থা খুবই হতাশাজনক। নিরাপদ সড়ক চাই-এর সাধারণ সম্পাদক মো. মাহবুবুর রহমান মুন্না এই অবস্থার জন্য বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেছেন। কেডিএর প্রকল্প পরিচালক মোর্ত্তজা আল মামুন জানান, আগের ঠিকাদারের চুক্তি বাতিল করে নতুন দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কেসিসির প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবির উল জব্বার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সোনাডাঙ্গার একটি অংশ এলজিইডি এখনও বুঝিয়ে না দেওয়ায় সংস্কার করা যাচ্ছে না।
বাগেরহাটে কলাগাছ দিয়ে পাইলিং
বাগেরহাট সদর উপজেলার বেমরতা ইউনিয়নে ফতেপুর-বৈটপুর সড়ক নির্মাণে খালের পাড়ে কলাগাছ দিয়ে পাইলিং এবং নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা আনিসুর রহমান তুহিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কালভার্ট না করেই রাস্তা হচ্ছে, অনেক জায়গায় কলাগাছ দিয়ে পাইলিং করা হয়েছে।’ অপর বাসিন্দা সোহেল অভিযোগ করেন, এক নম্বর ইটের বদলে তিন নম্বর ইটের খোয়া দিয়ে কাজ হচ্ছে, যা হাত দিয়েই ভাঙা যায়। শেখ বেলাল হোসেন সরকারি নিয়ম মেনে কাজ করার জোর দাবি জানান। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার মিজানুর রহমান মনি দাবি করেন, পাইলিংয়ের কোনো বরাদ্দ নেই এবং বৃষ্টির কারণে কালভার্ট করা যাচ্ছে না; ইটের মানও সঠিক। বাগেরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মঞ্জুর রশিদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কলাগাছ দিয়ে পাইলিংয়ের কোনো নিয়ম নেই, এটি হয়তো মাটি ধরে রাখতে সাময়িকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নড়াইলে গ্রামীণ সড়কের দুর্দশায় জনভোগান্তি
নড়াইলের ৬০ শতাংশ গ্রামীণ সড়ক এখনও কাঁচা। সদর উপজেলার তুলারামপুরের মনোজিত বিশ্বাস বলেন, ‘নির্বাচনের সময় শুধু প্রতিশ্রুতিই মেলে, জীবদ্দশায় অন্তত রাস্তাটি পাকা দেখতে চাই।’ মুলিয়া ইউনিয়নের ননীখির গ্রামের গোলক বিশ্বাস জানান, কাদায় জুতা হাতে নিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। লোহাগড়ার শালনগরের বাবু মিয়া ও কালিয়ার মাইলী গ্রামের মিকাইল হোসেনও নিজ নিজ এলাকার অবহেলিত সড়কের কথা তুলে ধরেন। চরপাড়ার ধনঞ্জয় কুমারের প্রত্যাশা, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এই কষ্ট না পায়। নড়াইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার ইকরামুল কবীর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জেলার বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ চলমান। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে পাঁচ বছরের মধ্যে কাঁচা ও পাকা সড়কের অনুপাত সমপর্যায়ে আসবে।
পাইকগাছায় দুই যুগেও মেলেনি সংস্কার
খুলনার পাইকগাছায় লস্কর ইউনিয়নের বাইনতলা-খড়িয়া সড়কের দেড় কিলোমিটার অংশ দুই দশক ধরে সংস্কারহীন। সাংবাদিক রাবিদ মাহমুদ চঞ্চল জানান, রোগী পরিবহন থেকে শুরু করে জরুরি যাতায়াতে চরম ভোগান্তি হচ্ছে। মাছ ব্যবসায়ী অভিজিৎ মণ্ডলের আক্ষেপ, রাস্তা খারাপ হওয়ায় আড়তে পৌঁছতে দেরি হয় এবং মাছের ন্যায্য দাম থেকে তারা বঞ্চিত হন। লস্কর ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম সানা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এলজিইডি চলতি বছর কাজ শুরুর আশ্বাস দিয়েছে। উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাফিন শোয়েব নিশ্চিত করে জানান, সড়কটি খুলনা বিভাগীয় উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের তালিকায় ২ নম্বরে রয়েছে, দ্রুতই কাজ শুরু হবে।
ভেড়ামারা-প্রাগপুর সড়কে ইটের হেরিং বোনে চরম দুর্ভোগ
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ভেড়ামারা-প্রাগপুর সড়কের আল্লাহর দরগা বাজার এলাকার প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশ দীর্ঘদিন ধরে ইটের হেরিং বোন বন্ড অবস্থায় থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সাধারণ মানুষ। সংস্কারের অভাবে সড়কটির বিভিন্ন স্থানে ইট উঠে গিয়ে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। দৌলতপুর উপজেলার সাথে জেলার সরাসরি যোগাযোগের একমাত্র প্রবেশমুখ হওয়ায় প্রতিদিন সিএনজি, অটোরিকশা, বাস, ট্রাকসহ হাজারো যানবাহন ও মানুষ ঝুঁকি নিয়ে এই পথেই যাতায়াত করে। ইটের কারণে যানবাহনে তীব্র ঝাঁকুনি সৃষ্টি হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে; বিশেষ করে অসুস্থ রোগী, বৃদ্ধ ও শিশুদের চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন জানান, বিকল্প কোনো পথ না থাকায় বাধ্য হয়ে এই সড়ক ব্যবহার করতে গিয়ে মালামাল পরিবহনে তাদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ভ্যানচালক রফিক বলেন, ‘সড়কের গর্তের কারণে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেতে হয়, রোগীদের নিয়ে চলাচল করা সবচেয়ে কঠিন।’ বাসচালক দুলাল হোসেন জানান, বৃষ্টির দিনে বড় গর্তগুলো পানিতে ডুবে থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনজুরুল করিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সড়কটির সংস্কারকাজের দরপত্র ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, এ মাসের মধ্যেই কাজ শুরু হবে।’
কালীগঞ্জে অবৈধ মাটি বাণিজ্যে নষ্ট হচ্ছে সড়ক
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় অবৈধ মাটি বাণিজ্যের দৌরাত্ম্যে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে সরকারি সড়ক অবকাঠামো। রাতের আঁধার থেকে শুরু করে দিনের বেলাতেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মাটি কেটে ট্রাক্টর ও অন্যান্য যানবাহনে করে বিভিন্ন ইটভাটা ও ভরাট কাজে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কাঁচা-পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ধুলাবালি ও শব্দদূষণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে স্থানীয় জনজীবন। উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করলেও বন্ধ হয়নি অবৈধ এ ব্যবসা। স্থানীয়দের অভিযোগ, একশ্রেণির এক্সকাভেটর মালিক ও মাটি ব্যবসায়ী স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় এই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। উপজেলা প্রকৌশলী সৈয়দ শাহরিয়ার আকাশ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কাদামাটি রাস্তার বিটুমিনের বড় শত্রু। এতে সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’ অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ অসুস্থতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘বিষয়টি স্থানীয় ভূমি অফিস ও পুলিশ ফাঁড়িকে জানান।’
বাবুগঞ্জে ১৫ কিলোমিটার জুড়ে খানাখন্দ
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের বটতলা স্টেশন থেকে নমর হাট পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার সড়ক দীর্ঘদিনের খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। পরিবহন চালক মো. মোসলেম ফকির বলেন, ‘আধা ঘণ্টার পথ পার হতে এখন দেড় ঘণ্টা লাগছে।’ আরেক চালক নুরু মিয়ার মতে, ধীরে গাড়ি চালানোর কারণে যানজট ও কষ্ট দুটোই বাড়ছে। স্থানীয়রা দ্রুত সড়ক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। উপজেলা প্রকৌশলী কাজী এমামুল হক আলীম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সড়কটি সংস্কারের পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, দ্রুত কাজ শুরু হবে।’
আগৈলঝাড়ায় হাতের স্পর্শেই উঠে যাচ্ছে কার্পেটিং
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় তালবাড়ি সড়ক সংস্কারে চরম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর মোল্লা ও শফিকুল ইসলাম জানান, ময়লার ওপর নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে কার্পেটিং করায় তা হাতের ছোঁয়াতেই উঠে যাচ্ছে। ঠিকাদার মো. আসাদুজ্জামান জানান, তার লাইসেন্সে কাজ করছেন দলিল লেখক মো. জাকির মোল্লা। তবে জাকির মোল্লার দাবি, বৃষ্টির সময় তিনি কাজ বারণ করলেও উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের নির্দেশে কাজ হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল ইসলাম একে সরকারি কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের যোগসাজশ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি কাজ শুরু করে চলে এসেছি, পরে কী হয়েছে জানি না।’ উপজেলা প্রকৌশলী রবীন্দ্র চক্রবর্তী বলেছেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, পুনরায় কাজ না করলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন, মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা; শেখ আরিফুল ইসলাম, বাগেরহাট; এসকে সুজয়, নড়াইল; ফসিয়ার রহমান, পাইকগাছা (খুলনা); বাবলু মোস্তাফিজ, ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া), হাবিব ওসমান, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ); শাকিল মাহমুদ, বরিশাল ও জহুরুল ইসলাম জহির, গৌরনদী (বরিশাল)