× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজস্ব বোর্ড প্রধান নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

আবু কাওসার ও ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১০ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ১০ ঘণ্টা আগে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে জনপ্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে জনপ্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে জনপ্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। সংস্থাটির ভেতর দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ।

বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা বলছেন, জাতীয় বাজেটের ৮৬ শতাংশ রাজস্বের জোগানদাতা সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার শীর্ষপদে যে প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছে, তা যথাযথ হয়নি।

প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রথমবারের মতো এনবিআর চেয়ারম্যান নিয়োগের এ ঘটনা দেশের ইতিহাসে সরকারের জন্য একটি খারাপ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করল বলে মনে করছেন তারা। 

উল্লেখ্য, এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন কর ক্যাডারের কর্মকর্তা আহসান হাবিব। তিনি বিদায়ী চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের স্থলাভিষিক্ত হলেন।

নতুন অর্থবছরের বাজেট পাসের আগের দিন ২৯ জুন সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে আহসান হাবিবকে এ পদে বসানোর আদেশ জারি করে। প্রজ্ঞাপনে তাকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে পদায়নের কথাও বলা হয়েছে। আহসান হাবিব বিসিএস আয়কর ক্যাডারের ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা। এর আগে তিনি এনবিআরের সদস্য (কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, সরকার প্রথমে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে একজন সচিব নিয়োগ করে। যিনি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন, ‘পদাধিকার’ বলে তিনিই এনবিআর চেয়ারম্যান হয়ে থাকেন। এনবিআর গঠন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লিখিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রচলিত এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এই প্রথম রাজস্ব বোর্ডের মধ্য থেকে একজন সদস্যকে (মেম্বার) সরাসরি চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হলো।

যোগাযোগ করা হলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী এমএ বারী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার মতে, আহসান হাবিব একজন মেধাবী, সৎ এবং তার ব্যাচের প্রথম কর্মকর্তা। দীর্ঘ সময় তিনি পদোন্নতিতে বঞ্চিত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ডিএস পুলে (উপ-সচিব) অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করলেও রাজনৈতিক কারণে সেটি বিবেচনায় আনা হয়নি। 

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এনবিআর একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। তাই বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাকে নেতৃত্বে আনা হয়েছে। কর প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তারাই প্রতিষ্ঠানটিকে আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবেন।’ 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “এখানে আইন ও প্রশাসনিক রীতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সরকারি চাকরির প্রচলিত কাঠামো অনুযায়ী সচিব পদে পদায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত সচিব বা সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন এবং বিশেষ প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে সরকার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু এনবিআরের শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কারণ, এই নিয়োগ চিরাচরিত রীতির বাইরে করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কোনো আইন সরাসরি বলে না যে, কর ক্যাডারের কর্মকর্তা কখনও সচিব হতে পারবেন না। হতে পারবেন, তবে তাকে অবশ্যই উপ-সচিব বা ডিএস পুলে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। অতীতে এমন নজির রয়েছে।”

জনপ্রশাসনের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা বলছেন, যাকে নতুন করে এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাকে যদি আগে সচিব পদমর্যাদায় উন্নীত করা হতো অথবা রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতায় সচিবের মর্যাদা দিয়ে পরে দায়িত্বভার দেওয়া হতো, তাহলে কোনো প্রশ্ন দেখা দিত না কিংবা বিতর্কের জন্ম তৈরি হতো না। 

অন্যদিকে এক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি হচ্ছে, এনবিআর একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান; তাই বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাকে নেতৃত্বে আনা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। এতে উল্লেখ করা হয়, বোর্ডের ভেতর থেকে যিনি জ্যেষ্ঠ সদস্য তাকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবে সরকার। এরপর ১৯৭৭ সালে সরকার অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বা আইআরডি গঠন করে। তখন বলা হয় আইআরডির সচিবই পদাধিকার বলে এনবিআর চেয়ারম্যান।

এ প্রসঙ্গে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, ‘রাজস্ব বোর্ডের মধ্য থেকে কখনই চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়নি। শুরু থেকে আইআরডির সচিবই এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।’ 

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, “পরবর্তী সময় এনবিআর দুই ভাগ করে করনীতি এবং বাস্তবায়ন বিভাগ নামে আলদা ডিভিশন করে নতুন যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, এখনও সেটির বাস্তবায়ন ঘটেনি। ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত এটি কার্যকর না হবে, ততক্ষণ আগের নিয়ম অনসুরণ করে এনবিআর চেয়ারম্যান নিয়োগ করতে হবে। তা না হলে এটি হবে আইনের সুস্পষ্ট লংঘন।”

তাদের মতে, “সরকারের উচিত ছিল, নতুন অধ্যাদেশ বলবৎ অর্থাৎ আলাদা করনীতি এবং বাস্তবায়ন বিভাগ কার্যকর করা। তার পর শীর্ষ পদে নিয়োগ চূড়ান্ত করা। কিন্তু সে পথে না হেঁটে সরকার উল্টো ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।” এর পেছনে একটি স্বার্থান্বেষী মহল তৎপর রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি আলাদা বিভাগ গঠন সংক্রান্ত নতুন অধ্যাদেশটি আরও পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা হচ্ছে।”

তবে ওই অধ্যাদেশে কোনো সংশোধন আছে কি না বা নতুন কিছু যুক্ত হয়েছে কি না, কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হতে পারেÑ এসব বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। 

জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম। এর জন্য এনবিআরের দুর্বলতাকে অনেকাংশে দায়ী করে আসছেন বিশেষজ্ঞসহ দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। দাতাসংস্থাসহ দেশের ভেতর অনেক আগে থেকেই এনবিআর সংস্কারের জোরালো দাবি রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চাপে ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে এনবিআর সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু তারা সংস্কার করে যেতে পারেনি। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা আসার পর এনবিআরে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তারই অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে ৫৩ বছরের পুরনো সংস্থা এনবিআর বিলুপ্ত করে করনীতি এবং বাস্তবায়ন নামে দুটি আলাদা বিভাগ গঠন করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে।

যদিও ওই অধ্যাদেশটি বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি ইউনূস সরকার। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাদেশটি বাতিল করেনি। তবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, এটি আরও পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা হচ্ছে।

এই সংস্কার কার্যক্রম কবে বাস্তবায়ন করা হবে, নাকি অখণ্ড এনবিআরই থাকবেÑ এসব বিষয়ে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পরিষ্কার বার্তা পাওয়া যায়নি। ফলে ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের মনে প্রশ্ন রয়েছে, এনবিআর নিয়ে কী করতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। 

নতুন অধ্যাদেশে করনীতি বিভাগে একজন সচিব এবং বাস্তবায়ন বিভাগে আলদা সচিব নিয়োগের কথা বলা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে একজন সচিব এনবিআরের ভেতর থেকে এবং আরেকজন সচিব প্রশাসন, কাস্টমস কর কিংবা এর বাইরে থেকে নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু এনবিআরের কর্মকর্তাদের দাবি হচ্ছে : দুই জন সচিবই নিয়োগ দিতে হবে তাদের মধ্যে থেকে। এটা নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আপত্তি তোলে। কিন্তু এনবিআর কর্মকর্তারা তাদের দাবিতে অনঢ় থাকেন।

এক পর্যায়ে গত বছরের মে মাসে এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারির পর বড় ধরনের আন্দোলনে নামে এনবিআরের কর্মকর্তারা। এ আন্দোলনে কর এবং কাস্টমস উভয় ক্যাডারের কর্মকর্তারাই অংশ নেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে আন্দোলন থেকে পিছু হটেন কর্মকর্তারা। ওই ঘটনায় এনবিআরের অনেক মেধাবী কর্মকর্তার চাকরি চলে যায়।

এর পেছনে বিদায়ী চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা। 

এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, “নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বলতে কিছু নেই। আছে দুটি বিভাগ। একটি হচ্ছেÑ আয়কর নীতি বিভাগ, আরেকটি বাস্তবায়ন বিভাগ। অধ্যাদেশ কার্যকরের মাধ্যমে দুই বিভাগে দুই জন সচিব নিয়োগ করতে হবে। সরকার যাকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে তিনি সচিব নন। এনবিআর চেয়ারম্যান নিয়োগ করতে হলে সচিব হতে হবে।”

প্রসঙ্গত, বিদায়ী চেয়ারম্যান আবদুর রহমান নিজেও কর ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন। তবে তিনি পরবর্তী সময় সরকারের উপ-সচিব হিসেবে চলে গেলে পরবর্তী সময় অর্থ মন্ত্রণালয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে সচিব দায়িত্ব পালন করেন। ওই পদ থেকে আইআরডির সচিব নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “সরকার চাইলে সরাসরি রাষ্ট্রপতির ১০ শতাংশ কোটায় কাউকে সচিব করতে পারে। সে ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন থেকে প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে প্রথমে অন্য একটি মন্ত্রণালয়ে ভারপ্রাপ্ত সচিব পদে পদায়ন করতে হবে এবং এনবিআর চেয়ারম্যান বানাতে চাইলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে নিয়োগ দিতে হবে।”

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা