রংপুরের আপনপাড়া-বোতলা সড়ক বর্ধতকরণ ও ড্রেন নির্মাণ কাজে দীর্ঘসূত্রিতায় যান ও জনচলাচলে ভোগান্তি হচ্ছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ভাঙাচোরা আর খানাখন্দে ভরা সড়কগুলো। প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন লাখো মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে ধুলোয় আচ্ছন্ন জনজীবন। যাত্রীদের অন্তহীন দুর্দশা, দুর্ভোগের ভয়াবহতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর বিশেষ ধারাবাহিক প্রতিবেদন। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের চিত্র নিয়ে আজ প্রথম পর্ব।
উন্নয়নের নামে দেশজুড়ে গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়ক সংস্কারে চলছে হরিলুট আর চরম অব্যবস্থাপনা। কোথাও ভালো রাস্তা ভেঙে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে, কোথাওবা কাজ ফেলে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর। আবার কোথাও রাতের আঁধারে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করার পর
সকালেই খসে পড়ছে কার্পেটিং। দুর্নীতি, অনিয়ম আর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের গাফিলতির কারণে সংস্কারের সুফল পাওয়ার বদলে উল্টো ধুলো আর খানাখন্দে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। রাজশাহী ও রংপুরের বিভিন্ন জেলার সড়কগুলোর বর্তমান চিত্র থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয়।
বগুড়ায় রাস্তা ভেঙে রক, প্রতিবাদে জুটছে মারধর
বগুড়ায় গ্রামীণ মাটির রাস্তাসমূহ টেকসইকরণের লক্ষ্যে হেরিংবোন বড়করণ প্রকল্দে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সদর উপজেলার এরুলিয়া ইউনিয়নের ঘোলাগাড়ি ধাওয়াপিকশন সড়কে আগে থেকেই থাকা ইটের হেরিংবোন বন্ড রাস্তা তুলে বলু-সিমেন্টের নিম্নমানের সিসি ইউনিল্লক বসানো হচ্ছে। গ্রামবাসীদের দাবি, দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদে ক্লক শক্ত হওয়ার আগেই ব্যবহার শুরু হওয়ায় তা ভেঙে যাচ্ছে। কৃষকরাও পণ্য পরিবহনে ভোগান্তিতে গড়েছেন। কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলায় ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে এক গ্রামবাসীকে মারধরের অভিযোগও উঠেছে।
নিয়ম ভেঙে কার্যাদেশ গাওয়া পুনম এন্টারপ্রাইজের পরিবর্তে চেয়ারম্যান নিজেই কাজ পরিচালনা করছেন। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, “রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব ছড়াচ্ছে। নীতিমালায় শুধু মাটির রাস্তা উন্নায়নের সুযোগ থাকলেও এখানে আগে থেকেই ইট বিছানো ছিল।”
প্রমাণস্বরূপ তিনি কাজের যে ছবি দেখিয়েছেন, অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আদতে তা পার্শ্ববর্তী গোকুল ইউনিয়নের সরলপুর এলাকার কাজ শুরনর আগের ছবি।
এদিকে বগুড়া সদর উপজেলার খিদ্রোধামা-মধ্যপাড়া ও শেখেরকোলা ইউনিয়নেও লিলি ট্রেডার্সের পাওয়া কাজ বাস্তবে পরিচালনা করছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা রেজাউল করিম।
এসব বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকত মো. আব্দুল ওয়াজেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “বিষয়গুলো জানা নেই, অভিযোগ পেলে বাবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রকল্প পরিচালক বিপুল চন্দ্র বিশ্বাসও অভিযোগ খতিয়ে দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
সান্তাহার-সাইলো সড়কে ১০ কোটি টাকার কাজে অনিয়ম
বস্তুড়ার আদমদীঘির সান্তাহার-সাইলো সড়কের মাত্র সাতে তিন কিলোমিটার সংস্কারে প্রয়া ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
সান্দিড়া গ্রামের বাসিন্দা সোহেল রানা, খোকন, সবুজ ও গুলজার জানান, নির্ধারিত গভীরতায় মাটি খনন না করে নিম্নমানের পুরনো ইট, ১০ মিলি রড ও কম সিমেন্ট দিয়ে ঢোলাই দেওয়া হচ্ছে।
কাজের কোনো সাইনবোর্ডও টানানো হয়নি এবং পুরনো কার্পেটিং না তুলেই কাজ করা হচ্ছে। হবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইট ইঞ্জিনিয়ার আবদুল কুদ্দুস অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, “ল্যাবরেটরি টেস্ট করেই সামগ্রী ব্যবহার কর। হচ্ছে। ইটে সমস্যা থাকলে তুলে নেব।”
এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের উব্রায়ান প্রকল্পের পরিচালক এটিএম কাউছার হোসেন বলেন, কাজের গুণগত মান নিশ্চিতে সেখানে একজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে সার্বক্ষণিক তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
গাছ কাটার অজুহাতে আটকে আছে সংস্থার
নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে গগনপুর গগনপুর পর্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির সংস্থারকাজের টেন্ডার এক বছর আগে হলেও এখনও তা শুরু হয়নি। গর্ত আর খানাখন্দে ভরা রাস্তায় প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় বাসিন্দা সাজেদুর রহমান বলেন, “টেন্ডার হওয়ার কথা শুনলেও কাজের কোনো চিহ্ন নেই, প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।”
এ বিষয়ে পত্নীতলা উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, “রাস্তার দুই পাশের গাছ কাটার বিষয়ে বন বিভাগ ও বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিলেও তাদের বিলম্বের কারণে ঠিকাদার কাজ শুরু করতে পারছেন না।”
তবে সাধারন মানুষ এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। দ্রুত কাজ শুরু না হলে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
রংপুরে উপেক্ষিত গলির সড়ক
রংপুর মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ের স্থানীয় সড়কগুলো এখনও বেহাল। সিটি করপোরেশন ও এলজিইডি প্রধান সড়ক সংস্কার করলেও গলি-উপগলি অবহেলিত থাকছে।
৯নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফারুক মিয়া জানান, তেলিটারী থেকে বড়পুল সড়কে বড় গর্ত সৃষ্টি হলেও কর্তৃপক্ষের নজর নেই।
হরিদেরপুর ইউনিয়নের অটেচালক নাজমুল মিয়া যেমনটা বলেছেন, “পাগলাপীর থেকে পানবাজার সড়কটি এতই খারাপ যে, গাড়ি নিয়ে গেলেই তা নষ্ট হয়ে যায়।”
তবে রংপুর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আলী আজম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “বর্ষার আগে শহরের ৩০০ কিলোমিটার পাকা রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
অন্যদিকে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসা আশ্বস্ত করে বলেন, টেন্ডার হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর মেরামত কাজ প্রায় শেষ, বর্ষায় চলাচলে সমস্যা হবে না।
ঠাকুরগাঁওয়ে রাতের কার্পেটিং সকালেই খসে পড়ছে
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে হাজীপুর ইউনিয়নের সিংগায়েল-চিলকামনি ব্রিজে গভীর রাতে কার্পেটিং করায় এর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা খাদেমুল ইসলাম, আব্দুল মালেক, লিমন ইসলাম ও সাদেকুল ইসলাম জানান, গভীর রাতে রাতে কাজ করায় সকালে কার্পেটিংয়ের অংশ খসে পড়তে দেখা গেছে।
ভেবাড়া বোর্ডের হাটের বাসিন্দ আব্দুর রহমান জানান, রাতে কাজ হওয়ায় স্থানীয়রা তার মান পর্যবেক্ষন করতে পারেননি।
এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “রাতে লোকজনের উপস্থিতি দেখেছিলাম, তবে কাজের মান খারাপ হওয়ার বিষয়টি লোকমুখে শুনেছি। ত্রুটি থাকলে তা ঠিক করা উচিত।”
অন্যদিকে উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মাইনুল ইসলাম বলেন, “রাতে কার্পেটিং করার নিয়ম নেই। ত্রুটি থাকলে পুনরায় কাজ করিয়ে নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে ঠিকাদার সোহেল রানার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
জলঢাকায় পিআইওর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) নাহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
গেলমুন্ডা ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্পের সাইনবোর্ড ছাড়াই দায়সারাভাবে কাজ চলছে। হেরেমবোর্ডের কাজে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করায় রাস্তা ইতোমধ্যেই ফাটল ধরেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদার ও প্রভাবশালীরা পিআইওর যোগসাজশে ইচ্ছামতো কাজ করছেন, যার ফলে সরকারের বিপুল অর্থের অপচয় হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
তবে প্রতিদিনের বাংলাদেশ যোগাযোগ করলে (পিআইও) নাহিদুজ্জামান বলেন, “আমি এ বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না।”
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দর্ঘদিনের এই উদাসীনতা ও অনিয়ম বন্ধ হবে। যাত্রাগমে হস্তি ফিরবে। এটিই সাধারণ মানুষের চাওয়া।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন মেরিনা লাভলী, রংপুর; অরুপ রতন, বগুড়া; আমিনুল ইসলাম সোহাগ, আদমদীঘি (বগুড়া); মাহমুদুন্নবী, পত্নীতলা (নওগাঁ); মনুসর আহাম্মেদ, পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) ও আশীষ বিশ্বাস, জলঢাকা (নীলফামারী)।