পদ্মা সেতু। ছবি: সংগৃহীত
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে প্রকল্পের অর্থায়নে তিনটি বিকল্পÑ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), সরকারি তহবিল এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন খোলা রাখা হয়েছে।
সেতু কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। সমীক্ষা শেষে প্রকৃত ব্যয়, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা এবং অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি যেন দেশের রাজস্ব ও অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সেতু কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফ এই প্রকল্পের সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সমীক্ষা শেষ হওয়ার আগে প্রকল্পের অর্থনৈতিক উপযোগিতা, সম্ভাব্য সুফল কিংবা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি)-এর অবদান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার হওয়ায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সেতুর অবস্থান চূড়ান্ত হওয়ার ওপরই এর সামগ্রিক উপকারিতা নির্ভর করবে।
তিনি আরও জানান, পরিকল্পনায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতুকে ‘ওয়াই’ আকৃতিতে নির্মাণের একটি প্রস্তাব রয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আরিচা, ফরিদপুর ও পাবনার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে এবং দক্ষিণ, উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলকে একটি বৃহৎ সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কে যুক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিকল্প যোগাযোগ পথও তৈরি হবে। তবে এসব বিষয় সমীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল।
অর্থায়নের বিভিন্ন উৎসের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন সচিব। তিনি বলেন, চীনের সম্ভাব্য অর্থায়নের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ইতোমধ্যে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় প্রকল্পটি আলোচনায় আসে। চীনের সম্মতি মিললে অর্থায়নের কাঠামো স্পষ্ট হবে। তবে সরকার পিপিপি মডেলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ছাড়া সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতেও প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার একক অর্থায়নের সম্ভাবনা কিছুটা ক্ষীণ।
প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পের সমীক্ষা পরিচালনার জন্য নেপাল, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স ও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে। সরকারি অনুমোদন মিললে তারা মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবে। এবারের সমীক্ষায় পদ্মা ও যমুনা নদীর সম্মিলিত প্রভাব, নদী অববাহিকা এবং নদীর গতিপথের পরিবর্তন মূল্যায়ন করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হবে না। পিপিপি মডেলে বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগের বড় অংশ বহন করবে বেসরকারি অংশীদার। আর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হলে ঋণ পরিশোধের আগে পর্যাপ্ত গ্রেস পিরিয়ড থাকায় সরকারের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ সীমিত থাকবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরে সমীক্ষা, পরের বছরে বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন এবং এরপর দুই-তিন বছর পর মূল নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে। ফলে পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধাপে ধাপে বরাদ্দ দেওয়া হবে।
সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের চূড়ান্ত মডেল এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। সমীক্ষার ফলাফল, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, ঋণের সুদের হার, গ্রেস পিরিয়ড এবং সামগ্রিক আর্থিক সুবিধা বিবেচনা করে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। প্রয়োজনে একটি বড় সেতুর পরিবর্তে দুটি ছোট সেতু নির্মাণের বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে।