গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কৃষিখাতে প্রত্যাশিত বরাদ্দ না বাড়ায় কৃষি অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা, সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদরা হতাশা প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, কৃষি খাতের ভর্তুকির প্রায় ৮০ শতাংশই রাসায়নিক সারে ব্যয় হওয়ায় গবেষণা, উন্নয়ন, সেচ, বীজ ও দক্ষ জনবল তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন হচ্ছে না। তারা খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চূড়ান্ত বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থসংস্থান ও ব্যাংকিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আক্তারুজ্জামান খান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১৫টি খাতের মধ্যে নবম। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন— এই তিন মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৩৩ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে কৃষিতে ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি (৮৫.৫ শতাংশ), মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে ২ হাজার ৭২৮ কোটি (৮.১ শতাংশ) এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে ২ হাজার ২৪০ কোটি টাকা (৬.৬ শতাংশ) বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিতে বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে ৩ হাজার ৩৯২ কোটি এবং পরিবেশ খাতে ২ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। তবে শস্য উপখাতে বরাদ্দের হার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৪.৯৯ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩.০৮ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ হার ছিল ১০.৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ বছরে শস্য উপখাতে বরাদ্দ কমেছে ৭.৫৭ শতাংশ।
অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান খান আরও বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট বাজেটে কৃষির অংশ ছিল ৫.৬৭ শতাংশ, যা চলতি প্রস্তাবিত বাজেটে ৩.০৮ শতাংশে নেমেছে। কৃষিতে বরাদ্দের এ ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মুন্সীগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা এস এম আকাশ বলেন, জমি লিজ নিয়ে ফল ও সবজি উৎপাদনের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন কৃষিকাজ কতটা কষ্টসাধ্য। কিন্তু কৃষকরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না। তাই বাজেটে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, কৃষি খাতের ভর্তুকির প্রায় ৮০ শতাংশ রাসায়নিক সারে ব্যয় হয়। চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন খাতে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী কৃষি গড়ে তুলতে কৃষিযন্ত্র আমদানিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও দক্ষ জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগ জরুরি।
কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, কৃষকরা বাম্পার ফলন পেলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় পরের বছর উৎপাদনে আগ্রহ হারান। এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি সৌরশক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কৃষি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় কৃষিতে বর্তমান বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান কৃষিনির্ভর হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি গবেষণা, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কৃষি খাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।