× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রচার না থাকায় পিছিয়ে পড়েছে পোস্ট অফিস

মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

‘কত চিঠি লেখে লোকে, কত সুখে প্রেমে আবেগে স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে’Ñ সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ‘রানার’ কবিতার এই একটি লাইন থেকেই বোঝা যায়, চিঠির সঙ্গে মানুষের আবেগের সম্পর্ক কত গভীর।

মাত্র কয়েক বছর আগেও মানুষ প্রতিদিন অপেক্ষা করত চিঠিপত্রের জন্য। অপেক্ষা ছিল টাকাপয়সার জন্যও। ছেলে পড়ে কলেজে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়েÑ বাবা তার মাসিক খরচ পাঠাতেন ডাকযোগে। চাকরিজীবী সন্তান শহর থেকে তার বাবা-মায়ের জন্য টাকা পাঠাতেনÑ তাও ওই ডাকযোগে। যোগাযোগবিচ্ছিন্ন গ্রামে বসে বই কিংবা পত্র-পত্রিকা কিনবেন, সে জন্য ছিল ডাক বিভাগের ভ্যালু পেঅ্যাবল পার্সেল সার্ভিস। শহর থেকে কোনো জিনিস কিনে পার্সেল করে বাড়ি পাঠাবেনÑ সেজন্যও নির্ভর করতে হতো ডাকবিভাগের ওপর। 

কিন্তু অবস্থা পাল্টে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের এই যুগে চিঠির আদান-প্রদান। ফোন আর মেসেজের বিস্তৃতি চিঠির প্রয়োজনীয়তাকে শূন্যের ঘরে নিয়ে গেছে। মোবাইল ব্যাংকিং অভাবনীয় গতিশীলতা এনেছে টাকার আদান-প্রদানে। কিন্তু তার পরও ডাক বিভাগের প্রতি মানুষের আকর্ষণ এখনও কমেনি। সাধারণ মানুষ চায় ডাক বিভাগকে ঢেলে সাজানো হোক, সেবা কার্যক্রমে সক্রিয় হোক।

অবশ্য ডাকবিভাগও সেবা কার্যক্রম পরিচালনার নানা প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। যদিও তা যথেষ্ট নয়। গত ৪ জুন বিকালে মোহাম্মদপুর পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখা গেল সাতক্ষীরা থেকে দুই ঝুড়িতে ৪০ কেজি আম এসেছে পোস্টাল সার্ভিসের ‘স্পিড পোস্ট’ সেবার আওতায়। মাত্র ৪০০ টাকায় এ পণ্য পরিবহন করা হয়েছে বলে জানালেন পোস্টমাস্টার মো. মাহমুদুন নবী। তিনি জানান, বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একই পরিমাণ পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এর থেকে তিন-চারগুণ বেশি নিচ্ছে।

ঢাকার আরেকটি পোস্ট অফিসে ৬০ কেজি গরুর মাংস এসেছে খুলনা থেকে। প্রথম ১ কেজি ২০ টাকা ও অবশিষ্ট ১৯ কেজি ১০ টাকা দর হিসেবে ২০ কেজি পণ্যের ডেলিভারি চার্জ পড়েছে ২১০ টাকা এবং মোট ৬০ কেজি মাংস পরিবহনে খরচ হয়েছে ৬৩০ টাকা। ডাক বিভাগের ‘স্পিড পোস্ট’ নামের সেবার আওতায় ৬০ কেজি মাংস পরিবহনে চার্জ হবে মোট ৩১৫ টাকা। তবে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসে পরিবহনের জন্য এ চার্জ আসবে দেড় হাজার থেকে দু’হাজার টাকা। ডাক বিভাগে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পোস্ট অফিসের দরদাম করার কোনো সুযোগ নেই, এটাই সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা জানিয়েছেন একাধিক পোস্টমাস্টার। তাদের মতে, এ সেক্টর পণ্য লোকসানি খাতে পরিণত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণও এটি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সময়োপযোগী আধুনিকায়নের অভাবে লোকসানি খাতে নাম লিখিয়ে চলছে ডাক বিভাগ। সরকারি বৃহৎ অবকাঠামো নিয়ে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাল মেলাতে পারছে না এ বিভাগের পণ্য পরিবহন সেবা সার্ভিস। প্রচার না থাকা এবং পুরনো আইনি কাঠামো এ ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিও প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম সীমাবদ্ধতা। ডাক বিভাগ নিয়ে সরকারের উদাসীনতাও এর বড় কারণ। অথচ বেসরকারি খাতে পণ্য পরিবহন ডাক বিভাগের চেয়ে সীমিত অবকাঠামো নিয়েও এগিয়ে গেছে

ডাক বিভাগের রয়েছে মোট ১৪০টি ছোট-বড় কাভার ভ্যান, ৮৯টা মোটরসাইকেল, ৫টা থ্রি-হুইলারÑ যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এর মধ্যে বেশকিছু গাড়িই অচল বা ত্রুটিপূর্ণ। ফলে দেশের দূরদূরান্তে ডাক ও পার্সেল পাঠাতে বেসরকারি গাড়ি বা বাস-ট্রাক ভাড়া করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে লজিস্টিকস ও পরিবহন খাতে ডাক বিভাগের বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। 

একটি সূত্র জানায়, ডাক বিভাগে দ্রুতগতির কম খরচে পার্সেল পাঠানোর সেবা থাকলেও দক্ষ বিপণন, বাণিজ্যিক মানসিকতা, বিজ্ঞাপন ও প্রচারাভিযানের অভাবে সাধারণ মানুষ সে সম্পর্কে কিছুই জানে না। দেশজুড়ে ডাক বিভাগের সাড়ে আট হাজারেরও বেশি স্থায়ী কার্যালয় রয়েছে। তবে এই বিশাল অবকাঠামো এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সচল রাখতে যে পরিমাণ খরচ হয়, ডাকঘরগুলোর রাজস্ব আয় থেকে তা উঠে আসে না।

ডাক বিভাগগুলো দ্রুত বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। প্রতিষ্ঠানটিকে একটি সেবার ফি মাত্র এক টাকা বাড়াতে হলেও সরকারি অনুমোদন ও মন্ত্রণালয়ের ফাইল চালাচালির দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব সাঈদা আফরোজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, ‘পোস্ট অফিস চাইলেই পণ্য পরিবহনের মূল্য তৎক্ষণাৎ পুনর্নির্ধারণ করতে পারে না। এজন্য অর্থ বিভাগের অনুমোদনের দরকার হয়।’ বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস পোস্ট অফিসের তুলনায় প্রায় ৬-৭ গুণ দামে পণ্য পরিবহন করছে। সরকারিÑবেসরকারি ক্ষেত্রে এত পার্থক্য কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকার লাভ করার জন্য চিন্তা করছে না।’

ডাক অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ ডাক বিভাগে স্থায়ী এবং অতিরিক্ত বিভাগীয় কর্মচারীসহ সব মিলিয়ে প্রায় চল্লিশ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত আছেন। গ্রামীণ ও চরাঞ্চলের সাড়ে আট হাজারেরও বেশি ইডি (ED) উপ-ডাকঘরেও কাজ করছেন কর্মীরা। দেশজুড়ে ৮ হাজার ৫০০টির বেশি স্থায়ী কার্যালয় ও বিপুল জনবলের বেতন-ভাতা সচল রাখতে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হলেও, সেই তুলনায় বাণিজ্যিক আউটপুট আসছে না। হাজার হাজার কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ডাকপিয়নের স্থায়ী বেতন-ভাতা এবং পেনশন দিতেই বাজেটের সিংহভাগ অর্থ চলে যায়। এই প্রশাসনিক ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত রাজস্ব আয় ডাকঘরের নিজস্ব সেবা থেকে আসে না। ফলে ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমানো যাচ্ছে না।

ডাক অধিদপ্তরের একজন পরিচালক জানান, পোস্ট অফিসগুলোর মাধ্যমে বিদেশে পার্সেল ও পণ্য পাঠিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৮০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এর চেয়ে ৫ গুণ বেশি আয় করে। এখানে সিস্টেম ঘাটতি প্রকট, যা প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডাক বিভাগের পরিচালক পদমর্যাদার আরেকজন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, ‘ডাক বিভাগের একটি গাড়ি ঢাকা থেকে রাজশাহী চলাচল করলে ৫ টন পণ্য পরিবহন করা যায়, খরচ হয় ৩০ হাজার টাকা। ৯ হাজার টাকা প্রতি ট্রিপে ঘাটতি থেকে যায়। একই রুটে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়ির কাঠামো পরিবর্তন করে ৮ টন মাল বহন করতে পারে, কিন্তু ডাক বিভাগের গাড়িতে সর্বোচ্চ ৫ টন মালামাল পরিবহন করা যায়। আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে গাড়ির কাঠামো পরিবর্তন (গাড়ির বডিতে অতিরিক্ত ‘পাতি’ সংযোজন করা) করা যাচ্ছে না।’ 

চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের সসময় ব্রিটিশ আমলের ১২৭ বছরের পুরনো ‘দ্য পোস্ট অফিস অ্যাক্ট-১৮৯৮’ পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ নতুন ও আধুনিক ‘ডাকসেবা অধ্যাদেশ-২০২৬’ চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। তবে অধ্যাদেশটি এখনও সংসদে পাস হয়নি।

ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জাকির হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, ‘২০২১ সালে নির্ধারিত পণ্যের রেট ‘রিভাইজ’ বা পুনর্নিরীক্ষণ করা হচ্ছে। ২০২৬ সালে তৈরি হওয়া ‘ডাক অধ্যাদেশ’ সংসদে পাস হলে পরিস্থিতি পালটাবে। আরেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক কেএইচএম ইকবাল মাসুদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “রাজধানীতে গ্রাহকের দোরগোড়ায় যেতে ডাক বিভাগ এজেন্ট নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এতে অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা করা যায়।” 

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি বলেন, “ডাক মাশুলের বিদ্যমান হার পুনর্নির্ধারণে ২০২৫ সালে প্রেরিত একটি প্রস্তাবে সম্প্রতি সম্মতি দিয়েছে সরকারের অর্থ বিভাগ। গত ১২ মে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ডাক মাশুলের নতুন হার অনুমোদন করেছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নতুন হার কার্যকর করা হবে।” সচিব আরও বলেন, ডাক মাশুলের নতুন হার কার্যকর হলে সরকারের নন-ট্যাক্স রেভিনিউ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যাবে। ‘খসড়া ডাক অধ্যাদেশ-২০২৬’ অনুমোদন বিষয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি এটি অনুমোদন করেননি। তাই ‘খসড়া ডাক সেবা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা