× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নিজেদের সম্পত্তি রক্ষায় ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ রাজউক

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ঢাকার উত্তরায় শতকোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি জালিয়াতির মাধ্যমে চোখের সামনেই বেহাত হয়ে গেলেও কার্যত ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ হয়ে বসে আছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।

নিজেদের বিশাল সম্পত্তি বেদখল হওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় সংস্থাটির চরম দুর্বলতা, গাফিলতি ও রহস্যজনক নীরবতার চিত্রই প্রকট হয়ে উঠেছে। একটি ভুয়া অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ও আইনি মারপ্যাঁচকে ঢাল করে সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুসহ একটি প্রভাবশালী চক্র বিনা বাধায় জমিটির মালিকানা নিজেদের নামে নিয়ে নিয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, দিনের পর দিন এই দখলদারত্ব চললেও রাজউক তা টেরই পায়নি। এমনকি জমি হাতছাড়া হওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পরও জালিয়াতদের চিহ্নিত করতে বা অভ্যন্তরীণ কোনো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত কি না, তা খুঁজে বের করতে কোনো তদন্ত কমিটিও গঠন করেনি সংস্থাটি।

জালিয়াতির দুঃসাহসিক ছক ও ভুয়া এনওসি

প্রতিদিনের বাংলাদেশের হাতে আসা রাজউকের ওই জাল এনওসির সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামতেই ধীরে ধীরে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করে। দেখা যায়, জমি বিক্রির জন্য রাজউক থেকে নেওয়া একটি অনাপত্তিপত্রের ওপর ভিত্তি করেই এই মহাজালিয়াতির শুরু। নথিপত্রে সই ও সিল রয়েছে ২০১৬ সালের মে মাসের। অথচ যে কর্মকর্তার সই ও সিল ব্যবহার করে জমিটির ওপর রাজউকের দাবি ত্যাগ করা হয়েছে, তিনি সংশ্লিষ্ট ‘এস্টেট ও ভূমি’ দপ্তরে দায়িত্ব গ্রহণই করেছেন এর দুই বছর পর।

কথিত ওই এনওসি পর্যালোচনা করলে জালিয়াতির দুঃসাহসিক ধরনটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৬ সালের ২৮ মে তারিখের একটি স্মারক চিঠিতে দেখানো হয়েছে, রাজউকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক (এস্টেট-২ ও ভূমি) মো. আসাদুজ্জামান বিশ্বাসের সইয়ে জমির দাবি ত্যাগ করা হয়েছে। অথচ দাপ্তরিক রেকর্ড বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। এ বিষয়ে মো. আসাদুজ্জামান বিশ্বাস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ওই সময়ে আমি জোন-২-এর সহকারী পরিচালক হিসেবে অথরাইজ সেকশনে ছিলাম। আমার নাম ব্যবহার করে কোনো একটি চক্র এই অনাপত্তিপত্র দিয়েছে। এর স্মারক নম্বরেও অসঙ্গতি রয়েছেÑ সেখানে এস্টেট ও ভূমি শাখা-১ উল্লেখ করা হলেও সইয়ের জায়গায় শাখা-২ লেখা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ ভুয়া। জমিটি বিক্রির জন্য ভুয়া অনাপত্তিপত্র তৈরি করা হয়েছে।”

রেকর্ডের ফাঁকফোকরে রাজউকের গাফিলতি

দাপ্তরিক নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, পাকিস্তান আমলে আব্দুল্লাহপুর মৌজার সিএস ১২৮ (আরএস ১২৬) দাগের মোট ৩.৩৮ একর জমির মধ্যে এলএ কেস নং ৮/৬৪–৬৫-এর মাধ্যমেই ৩.০৯ একর জমি ‘উত্তরা মডেল টাউন’ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে আরএস খতিয়ান নং ৩-এ জমিটি সরকারের পক্ষে পূর্ত ও নগর উন্নয়ন বিভাগের (বর্তমান রাজউক) নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। কিন্তু জমিটি অধিগ্রহণ করা হলেও চূড়ান্ত গেজেটভুক্ত করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি রাজউক। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারই সুযোগ নেয় ভূমিখেকো চক্র।

বাংলাদেশ রিভিশনাল সার্ভে (বিআরএস) বা ঢাকা সিটি জরিপে সিএস ১২৮ দাগটি ভেঙে একাধিক সিটি দাগে বিভক্ত হয়। এর মধ্যে ৩৩০১ নম্বর দাগকে ঘিরেই গড়ে ওঠে একাধিক রহস্যময় দখল চক্র। এই দাগে মোট জমি ১ একর ৪৭ শতাংশ। এর মধ্যে ১ একর ২৩.৩৬ শতাংশ গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগের নামে এবং বাকি ২৪ শতাংশ মাহবুব ও কাদের গং-এর নামে রেকর্ড হয়। এই দাগের ১১৩০, ১০৯১, ১০৭৮ ও ৭৫৪ নম্বর সিটি খতিয়ানে যথাক্রমে আমির হোসেন আমু, মো. ইউসূফ আলী গং, মো. নবী নেওয়াজ গং এবং মো. মাহবুব হোসেন গং-এর নামে জমি নামজারি করা হয়। এর মধ্যে আমির হোসেন আমুর নামে প্রায় ৮ দশমিক ৯ কাঠা (০.১৪৬৭ একর) এবং মো. ইউসূফ আলী গংয়ের নামে প্রায় ৪৬ দশমিক ৮ কাঠা (০.৭৭৩৬ একর) জমি নামজারি হয়। অথচ নিজেদের রেকর্ডকৃত জমি বিআরএস জরিপে গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগের নামে রেকর্ড হলেও কোনো আপত্তি তোলেনি রাজউক।

আমুর নামে জমি ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ভূমিকা

ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর আম-মোক্তারনামার ভিত্তিতে এ কে এম মজিবুর রহমান থেকে সাফ কবলা দলিলের মাধ্যমে এক কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকায় এই জমি কেনেন আমির হোসেন আমু। ২০২১ সালের ৯ জুন মজিবুর রহমানকে পাওয়ার দেন দিলারা ও মনোয়ারা নামে দুই নারী। দলিলে তাদের পৈত্রিক সূত্রে জমির মালিকানা পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। মো. নবী নেওয়াজ যে ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়েছে, তিনি ওই দুই নারীর ভাই। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-হত্যা মামলায় আমির হোসেন আমু বর্তমানে কারাগারে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

উত্তরা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের নথিপত্র যাচাই করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আমির হোসেন আমুর নামে দলিল সম্পন্ন করা হয়। সরকারের সমুদয় রাজস্বও যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। অফিসের উচ্চমান সহকারী ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা সুলতানা রাজিয়া জানান, ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট মূল দলিলটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিস থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রভাবশালী মহলের চাপে মূল দলিলের ভিত্তি অর্থাৎ রাজউকের ভুয়া এনওসি ও পৈতৃক সূত্রের ভুয়া মালিকানার কাগজপত্রগুলো শনাক্তই হয়নি

স্থানীয়দের ভাষ্যে দখলদারত্বের চিত্র

উত্তরার ৮ নম্বর সেক্টরে মহাসড়কসংলগ্ন এই সরকারি জমির বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন উন্মুক্ত থাকায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও তার নাম ব্যবহার করে গড়ে ওঠা চক্রটি সহজেই থাবা বসায়। আমুর নামে দলিল হওয়ার পর সেখানে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়।

উত্তরা আব্দুল্লাহপুরের এলাকার চার দশকের বাসিন্দা সফুর উল্লাহ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এই পুরো এলাকা আগে ডোবা ও নিচু জলাশয় ছিল। আমরা জানতাম এসব জমি রাজউকের আর কেরু মাদবর নামে এক ব্যক্তির কিছু অংশ ছিল। চার বছর আগে হঠাৎ দেখি আমির হোসেন আমুসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এখানে মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর সেই সাইনবোর্ড আর নেই।”

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা স্বপন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এই জমিতে আমির হোসেন আমুর নামে সাইনবোর্ড লাগানো ছিল। তারা পুরো জমি দখলের চেষ্টা করেছিল। নামমাত্র মূল্যে আমাদের জমিও নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তাদের একজন মজিবুর রহমান, আরেকজন আমুর পিএ পরিচয় দিত। এখন তারা পালাতক বলে শুনেছি।”

উদ্ধার তৎপরতায় দায়সারা ভাব

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১০ সালে জমিটি হাতছাড়া করার আইনি ছক তৈরি হয়। বিজ্ঞ জেলা জজ ১ম আদালতের ‘৪৩৪/২০১০’ নম্বর মোকদ্দমার ‘১৫০২’ নম্বর আদেশে ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর জমিটি ইদ্রিস আলী নামের এক ব্যক্তির নামে রেকর্ডভুক্ত করার রায় দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তা ইউসুফ আলী ও আম-মোক্তারনামার ক্ষমতাবলে অন্যের নামে চলে যায়। মামলায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে বিবাদী করা হলেও আইন শাখায় এর কোনো রেকর্ড বা নথি নেই। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, শতকোটি টাকার এই মামলায় রাজউককে পক্ষভুক্তই করা হয়নি।

এ ছাড়া ৩৩০১ নম্বর সিটি দাগে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও ‘আব্দুল্লাহপুর-গাবতলী মহাসড়ক’-এর জমিও দখলের চেষ্টা হয়। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এমএল সৈকত ১ জানুয়ারি জালিয়াতি ঠেকাতে সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) চিঠি দেন। কিন্তু শতকোটি টাকার জমি হাতবদল হয়ে গেলেও রাজউক এখানে কেবলই দর্শকের ভূমিকায় ছিল।

রাজউকের এস্টেট-২ বিভাগের কানুনগো জায়েদ বিন আরাফাত প্রতিদিনের বাংলাদেশকে স্পষ্টভাবে জানান, সরকারি জমি অন্য কারও নামে নামজারির আগে নোটিস দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এই জমির ক্ষেত্রে রাজউক কোনো নোটিস পায়নি।

জমি উদ্ধারে চলতি বছরের ২৩ মে রাজউকের এস্টেট-২ ও ভূমি শাখার উপ-পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান ক্যান্টনমেন্ট রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে একটি আবেদন পাঠিয়ে নামজারি বাতিলের অনুরোধ জানান।

রাজউকের পরিচালক (এস্টেট-১) ডা. মো. শাহাদাত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ভুল তথ্য দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি জমিটি নামজারি করে নিয়েছে। এসব নামজারি বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ‘মিস কেস’ করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সম্পত্তি উদ্ধারে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা