সচিবালয় ও মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঘিরে বিভাজন, পদায়নে অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ধীরগতির অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
সরকার পরিবর্তনের পর দেশের প্রশাসনের চিত্র ইতিবাচক হবে, কার্যক্রমেও কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে আসবেÑ এমন প্রত্যাশা ছিল বিভিন্ন মহলে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাস পরও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, পদোন্নতি এবং রদবদলকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ কাটেনি। বরং সচিবালয় ও মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঘিরে বিভাজন, পদায়নে অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ধীরগতির অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
প্রশাসনের একাধিক সূত্রে জানাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি না পাওয়া কর্মকর্তাদের একটি অংশ দ্রুত পদায়নের প্রত্যাশায় থাকলেও বাস্তবে সে প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। অন্যদিকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে এখনও সাবেক সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একটি অংশ দায়িত্বে থাকায় প্রশাসনের ভেতরে নানামুখী আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, এসব পদে নিয়োগের জন্য কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সচিবের নাম বিবেচনায় রয়েছে। তবে সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাভাবিকভাবেই ধীরগতি আসে। এতে নিচের পর্যায়ের প্রশাসনও অপেক্ষায় থাকে।’
পদোন্নতি নিয়ে বাড়ছে অসন্তোষ
প্রশাসনের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে পদোন্নতি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি না পাওয়া কর্মকর্তাদের একটি অংশের অভিযোগ, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন কর্মকর্তাকে ওএসডি করা এবং কিছু পদায়ন শেষ মুহূর্তে পরিবর্তনের ঘটনাও প্রশাসনের ভেতরে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, একই ব্যাচের সবাই পদোন্নতি পাবেন নাÑ এটি স্বাভাবিক। তবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজনৈতিক বিভাজনের অভিযোগ
প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভাজনের অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। তবে একাধিক কর্মকর্তা দাবি করছেন, প্রশাসনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মতাদর্শ বা রাজনৈতিক পটভূমির কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই বিভাজনের সুযোগ নিয়ে প্রশাসনের একটি অংশ নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার চেষ্টা করছে।
মাঠ প্রশাসনেও অনিশ্চয়তা
জেলা প্রশাসক (ডিসি), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন পদে রদবদল হলেও অনেক ক্ষেত্রে পদায়ন চূড়ান্ত হতে সময় লাগছে। ফলে কিছু জেলায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠ প্রশাসন সরকারের নীতি বাস্তবায়নের প্রধান স্তম্ভ। সেখানে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা থাকলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সেবাদানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে কিছু রদবদল স্বাভাবিক। তবে সেই প্রক্রিয়া যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে প্রশাসনের ভেতরে সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হতে পারে।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘প্রশাসনের মূলনীতি হওয়া উচিত মেধা, দক্ষতা, সততা এবং পেশাদারত্ব। পদোন্নতি বা পদায়নের ক্ষেত্রে যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অধিকাংশ অভিযোগের অবসান ঘটবে।’ তিনি বলেন, ‘একই ব্যাচের সবাই পদোন্নতি পাবেন নাÑ এটি বাস্তবতা। কিন্তু যারা পদোন্নতি পাবেন, তাদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
এদিকে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক রদবদল নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ সম্পর্কে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন এনেছে এবং কিছু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও বাতিল করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রশাসনে ধাপে ধাপে আরও পরিবর্তন আনার বিষয় বিবেচনায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। রাজনৈতিক পরিচয় নয়, দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি এবং পদায়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়বে এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও গতি আসবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ, মাঠ প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
প্রশাসনের একটি অংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক। যথাসময়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ সম্পন্ন হলে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতা এলে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা অনেকটাই কাটতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকদের ভাষ্য, দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকলে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব সরকারের নীতি বাস্তবায়নেও পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে প্রশাসনের বর্তমান বাস্তবতায় পদোন্নতি, পদায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগÑ এই তিনটি বিষয়ই এখন সবচেয়ে আলোচিত। এসব সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং পেশাদার মানদণ্ডে নেওয়া হয়, তার ওপরই আগামী দিনে প্রশাসনের কার্যকারিতা ও জনআস্থার একটি বড় অংশ নির্ভর করবে।