× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চাটগাঁর মনোরেল

সকলি গরল ভেল

মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ৮ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৮ ঘণ্টা আগে

চট্টগ্রামের মনোরেল। ফাইল ছবি

চট্টগ্রামের মনোরেল। ফাইল ছবি

‘সকলই গরল ভেল’Ñ যার অর্থ সবকিছুই বিষে পরিণত হলো। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রামের মনোরেল প্রকল্প। এ প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ‘গরল’-এ পূর্ণ। মধ‍্যযুগীয় কবি, সংগীতজ্ঞ, জ্ঞানদাসের বিখ্যাত পদ-কীর্তন ‘অমিয় সাগরে সিনান করিতে সকলি গরল ভেল!’-এর সঙ্গে মনোরেল প্রকল্পের যেন বেশ সাযুজ্য।

তথ্য বলছে, বিশ্বখ্যাত দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম-পরিচয় ভাঙিয়ে চট্টগ্রামে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার মনোরেল প্রকল্পের কাজ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে একটি জালিয়াত চক্র। মিসরের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘দি আরব কন্ট্রাক্টরস’ আর বৈশ্বিক নির্মাণ জায়ান্ট ‘ওরাসকম কনস্ট্রাকশন’-এর নাম, লোগো জালিয়াতি করে তৈরি হয়েছে ভুয়া কনসোর্টিয়াম। ঘটনা এখানে শেষ হলে কোনো কথা-ই ছিল না।

জালিয়াত চক্রের লোগো, তথ্য কোনো কিছু যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এখান থেকে ‘মিথ্যা’ গল্পের ডালপালা মহাসত্যের মতো হাজির হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত ওরাসকম কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেÑ বাংলাদেশে তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই এবং কাউছার আলম চৌধুরী নামের কাউকেই তারা চেনেন না। এই প্রতারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে কাজে লাগানো হয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরীর মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতাকেও। যিনি নিজে আমন্ত্রণ জানিয়ে সন্দেহভাজনদের সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নিয়ে যান। জালিয়াতির বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে আসার পর এখন প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্র নতুন করে যাচাই-বাছাই শুরু করেছে চসিক। প্রতারণার ঘটনা ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমেও। 

আর মূল হোতা কাউছার আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলছেন, প্রেস ব্রিফিং করে প্রমাণ দেবো।

৩০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে জালিয়াতির ছায়া

চট্টগ্রাম নগরীতে মনোরেল নির্মাণের নামে যে প্রকল্পের কাজ পেতে জালিয়াত চক্র চেষ্টা করছে, তার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। অথচ ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে মেট্রোরেলের সম্ভাব্যতা যাচাই এখনও শেষ করেনি। সেটি শেষ না হতেই রহস্যজনকভাবে মনোরেল প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

জালিয়াতির মূল হোতা ও ভুয়া কনসোর্টিয়াম

 এই চক্রের মূল হোতা কাউছার আলম চৌধুরী নিজেকে ‘দি আরব কন্ট্রাক্টরস’ ও ‘ওরাসকম কনস্ট্রাকশন’-এর একমাত্র অনুমোদিত প্রতিনিধি দাবি করে চসিকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেন ২০২৫ সালের ২৪ জুন। সিটি করপোরেশনের পক্ষে স্বাক্ষর করেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। ‘দি আরব কন্ট্রাক্টরস-ওরাসকম-পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’-এর নামে বিওটি ও পিপিপি পদ্ধতিতে ৭১.৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চারটি রুটে ৭০টি স্টেশনসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের রূপরেখা দেখানো হয়।

ওরাসকমের স্পষ্ট অস্বীকৃতি

বিষয়টি যাচাই করতে ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের কর্মকর্তাদের ই-মেইল করা হলে কায়রো হেডকোয়ার্টারের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর শেরিফ শ্যারোবিম জানিয়ে দেন, বাংলাদেশে তাদের কোনো উপস্থিতি, কার্যক্রম বা অনুমোদিত প্রতিনিধি নেই এবং কাউছার আলম চৌধুরী তাদের পরিচিত কোনো ব্যক্তি নন। তথাকথিত কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকায় নাম ব্যবহারকে বেআইনি বলে আইনি অধিকার সংরক্ষণের কথাও জানায় ওরাসকম।

গাজীপুরের ট্রেড লাইসেন্স ভুয়া দাবি

মিসরের অস্বীকৃতির পরও কাউছার আলম দাবি করেন, বাংলাদেশে নিবন্ধিত ‘ওরাসকম কনস্ট্রাকশন বাংলাদেশ’ নামে তাদের প্রতিষ্ঠান আছে— যার প্রমাণ হিসেবে দেখান মেয়াদোত্তীর্ণ একটি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স। যেখানে ব্যবসার ধরন ‘প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার ও সরবরাহকারী’। তবে বিডা বা আরজেএসসির বাধ্যতামূলক কোনো অনুমোদনপত্র তিনি দেখাতে পারেননি।

দণ্ডপ্রাপ্ত প্রতারকও ছিল কনসোর্টিয়ামে

এই কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এম আলী নাজির শাহীন। যিনি ২০২২ সালে গ্রেপ্তার হন এবং এর আগে সামরিক বাহিনীর লোকজনের কাছ থেকে কোটি টাকা প্রতারণার অভিযোগে কারাদণ্ড পেয়ে সেনানিবাস এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষিত হন।

চসিকের তৎপরতা

মনোরেল জালিয়াতির বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর মনোরেল প্রকল্প নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কর্তৃপক্ষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চসিকের বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, জালিয়াতি নিয়ে এখন জোরালো তৎপরতা চলছে সংস্থাটিতে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্র নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। সমঝোতা স্মারক সইয়ের সময় কাউছার আলম চৌধুরীর দেখানো নথিপত্র, তার প্রতিনিধিত্বের দাবি এবং কনসোর্টিয়ামের পেছনের সব তথ্য নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সূত্রের ভাষ্য, প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সমঝোতা চুক্তি বাতিল করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে আইনি ব্যবস্থা।

তবে চসিকের অভ্যন্তরের অপর একটি সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, মনোরেল প্রকল্পের বিষয়টি প্রথমে বিডাই চসিকের কাছে নিয়ে আসে এবং বিডার সুপারিশ ও আশ্বাসের ভিত্তিতেই সিটি করপোরেশন সমঝোতা স্মারকে সই করে। তাদের ভাষ্য, যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব মূলত বিডার, কারণ বিদেশি বিনিয়োগ-সংক্রান্ত প্রস্তাব যাচাইয়ের আইনগত এখতিয়ার ও দায়িত্ব তাদেরই। সে কারণে এই জালিয়াতির পুরো দায়ভার বিডার ওপরই পড়ে বলে মনে করে এই সূত্রটি। নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে ও দায় এড়াতে দুই সংস্থার মধ্যে এখন চলছে আনুষ্ঠানিক চিঠি আদান-প্রদান।

আমন্ত্রণে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতার সংশ্লিষ্টতা 

এই জালিয়াত চক্রের বিস্তৃত যোগাযোগের আরেকটি দিক উঠে আসে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতায়। আগ্রাবাদের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে অনুষ্ঠিত সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য তিনিই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন স্থপতি আশিক ইমরানকে। যাওয়ার ব্যাপারে আশিক ইতস্তত করলে তাকে আশ্বস্ত করা হয়, আলী নাজির শাহীন প্রতারক হওয়ায় তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে— এই বলে। অর্থাৎ একজন প্রতারককে বাদ দিয়ে আস্থা তৈরির চেষ্টা হলেও আসল হোতা কাউছার আলম চৌধুরীর বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। ব্যবসায়ী মহলে প্রভাবশালী ও পরিচিত মুখ হিসেবে আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরীর এই আমন্ত্রণ জানানোর ভূমিকা স্পষ্ট করে দেয়, কীভাবে চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক ও সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছিল এই প্রতারক চক্র।

‘মনোরেল নিয়ে কাউছারের জালিয়াতি চক্রে আপনারও সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে এসেছে?’ এমন প্রশ্নের জবাবে আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এখন একটা অনুষ্ঠানে আছি। এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে রাতে কথা বলব।”

আগেও দুই মেয়রের কাছে গিয়েছিল প্রতারণার প্রস্তাব

বর্তমান মেয়র শাহাদাত হোসেনের আগে আ জ ম নাছির উদ্দীন ও রেজাউল করিম চৌধুরীর কাছেও মেট্রোরেল-সংক্রান্ত ভুয়া প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল প্রতারক চক্র। স্থপতি আশিক ইমরানের সতর্কতায় আ জ ম নাছির সরে আসেন, আর রেজাউল করিম ১০ শতাংশ কমিশন দাবি করায় সটকে পড়ে জালিয়াত চক্রটি।

‘অতি উৎসাহই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা’Ñ সুজন

বিডা ও সিটি করপোরেশনের এই ব্যর্থতাকে কীভাবে দেখছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিষয়টি দুইভাবে দেখা যায়— একটি হলো অতি উৎসাহ, যা কিছু ক্ষেত্রে ভালো হলেও তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক কাজ করতে হয়। যেমন এ সম্পর্কে তথ্য নেওয়া ও সত্যতা নিশ্চিত করা। সেটি তাদের দায়িত্ব ছিল, যা তারা পালন করতে পারেনি— যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিডার ভিন্ন সুরের জবাব

জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ার পর বিডা কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে বিডার বিনিয়োগ গবেষণা ও অর্থনীতি পর্যবেক্ষণ এবং নীতি ও পরিকল্পনা উইংয়ের পরিচালক (উপসচিব) ড. মো. হুমায়ুন কবির খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। বিডার তথ্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।” পরে এ প্রতিবেদক ‘আপনিও কি এই জালিয়াতির সঙ্গে সম্পৃক্ত?’ এমন প্রশ্ন করলে তিনি মুঠোফোনের সংযোগ কেটে দেন।

কাউছারের দাবি, দুই দিন পরই ‘প্রেস ব্রিফিং’

ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের কায়রো হেডকোয়ার্টার স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশে তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই এবং কাউছার আলম চৌধুরীকে তারা চেনে না’-এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউছার আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “আগামী দুই দিন পর এই বিষয়ে প্রেস ব্রিফিং করব। সেখানে আমি নিজের বক্তব্যসহ সব ডকুমেন্ট দেখাব।” 

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা