× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইলিশ

সরকারি খাতায় আছে, বাজারে নেই

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ৯ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৯ ঘণ্টা আগে

জেলেদের জালে কম ধরা পড়ছে, বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হচ্ছে এবং ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে জাতীয় মাছ ইলিশ। ছবি: সংগৃহীত

জেলেদের জালে কম ধরা পড়ছে, বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হচ্ছে এবং ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে জাতীয় মাছ ইলিশ। ছবি: সংগৃহীত

দেশে ইলিশ উৎপাদন নিয়ে সরকারি পরিসংখ্যানে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির চিত্র দেখা গেলেও বাস্তবে জেলেদের জালে মাছ কম ধরা পড়ছে, বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হচ্ছে এবং ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে জাতীয় মাছ ইলিশ।

জেলে, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে এসেছে উৎপাদনের সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। সরকারি কিতাবি হিসাবে দেশে চার দশকে ইলিশের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন হয়েছে। অথচ জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে না। ইলিশ কিনতে গেলে পুড়ে যায় ক্রেতার পকেট। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ মেট্রিক টন। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ২ কোটি ৬ লাখ টন।

২০০৭-০৮ অর্থবছরে উৎপাদন দাঁড়ায় ২ কোটি ৯০ লাখ টনে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন লাফিয়ে বেড়ে ৫ কোটি ১৭ লাখ টনে পৌঁছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ৫ কোটি ৭১ লাখ টনে উন্নীত হয়। তবে এরপর উৎপাদন কমতে শুরু করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ৭১ লাখ টন কমে ৫ কোটি টনে নেমে আসে।

দাম বেড়েছে কয়েকগুণ

উৎপাদন বৃদ্ধির দাবি থাকলেও বাজারে ইলিশের দাম ক্রমাগত বেড়েছে। ২০১৬ সালে ভরা মৌসুমে ঢাকার বাজারে ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৫০০ টাকা এবং ১ কেজি ওজনের ইলিশ ৭০০-৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম ২২০০ থেকে ২৭০০ টাকা, ৭৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৮০০ টাকা এবং ২৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, ৪০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ১৪০০ থেকে ২৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত মাসে এ দাম ছিল ১২০০ থেকে ২৭০০ টাকা এবং ২০২৫ সালের জুনে ছিল ১০০০ থেকে ২৪০০ টাকা।

জেলেদের জালে মাছ নেই

দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চাঁদপুরের পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীতে মাছ ধরেন জেসমিন আক্তার। তিনি বলেন, এখন নদীতে মাছের সংকট তীব্র। অনেক দিন খালি হাতে ফিরতে হয়। চাঁদপুরের প্রায় ২৭০টি বেদে পরিবারের ১২ হাজার ৫০০ সদস্য মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান নাজমা বেগম ও বুলু বেগম।

চাঁদপুরের কল্যাণপুর ইউনিয়নের জাহাঙ্গীর হোসেন প্রায় ৪০ বছর ধরে ইলিশ ধরছেন। বর্তমানে তিনি তিনটি ট্রলারের মালিক। তার ভাষ্য, নদীতে ইলিশ কমে গেছে, সাগরেও অনেক গভীরে যেতে হয়। এতে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায় এবং লাভ কমে যায়। দাদন ঋণের ওপর নির্ভর করে নৌকা ও জাল কিনতে হয়। তিনি কম সুদে বা সুদমুক্ত ঋণের দাবি জানান।

ব্যবসায়ীরা সংকটে

রাজধানীর মহাখালী কাঁচাবাজারে ২৩-২৫ বছর ধরে ইলিশ বিক্রি করেন মো. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, আগে প্রচুর ইলিশ বিক্রি হতো, হালি ধরে বিক্রি করা যেত। ২০২১-২২ সালেও ব্যবসা ভালো ছিল। কিন্তু ২০২৪ সাল থেকে সরবরাহ কমে গেছে। দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতাও কমেছে।

একই কথা বলেন দীর্ঘদিনের মাছ ব্যবসায়ী ডালিম বর্মণ ও শহিদুল হক। শহিদুল জানান, আগে এ বাজারে ৭-৮ জন ইলিশ বিক্রি করতেন, এখন মাত্র তিনজন ব্যবসায়ী রয়েছেন।

সাগরেও দেখা দিয়েছে সংকট

কক্সবাজারের জেলে, ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের দাবি, বঙ্গোপসাগরেও ইলিশের সংকট তৈরি হয়েছে। গত ১৪ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরা শুরু হলেও আশানুরূপ ইলিশ মিলছে না।

কক্সবাজার ফিশারী ঘাট মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, দুই যুগের ব্যবসায়িক জীবনে এমন সংকট তিনি দেখেননি। সম্প্রতি গভীর সাগর থেকে ফিরে আসা ১২টি ট্রলারের প্রতিটিতে মাত্র ১০-১২টি ছোট আকারের ইলিশ পাওয়া গেছে।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আশীষ কুমার বৈদ্য জানান, ১২ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত ১১ দিনে ঘাটে ২১২ দশমিক ৮০ টন মাছ এসেছে। এর মধ্যে ইলিশ ছিল মাত্র ৯ দশমিক ৩৯ টন।

চাঁদপুরেও ইলিশের সংকটের কারণে মৌসুম শুরু হলেও দাম কমেনি। বর্তমানে ৪০০-৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৪০০-১৮০০ টাকা, ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের ২৩০০-২৪০০ টাকা, ৯০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ২৭০০-২৯০০ টাকা এবং ১ কেজির বেশি ওজনের ইলিশ ৩ হাজার টাকার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মতিউর রহমান বলেন, ইলিশ একটি পরিযায়ী মাছ। ডিম দিতে সাগর থেকে নদীতে আসার পথে ডুবোচর, বিভিন্ন জাল ও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। নদীর পানিদূষণও এর খাদ্য ও প্রজনন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আগে হাওর-বাঁওড়সহ বিভিন্ন জলাশয়ে ইলিশ পাওয়া গেলেও এখন দূষণের কারণে তাদের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল ওয়াহাব বলেন, বর্তমানে ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশও ডিম দিচ্ছে। ইলিশের আকার ছোট হয়ে যাওয়া ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত। এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

উৎপাদন বাড়িয়ে রপ্তানির লক্ষ্য

ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। সোমবার ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্পের সমাপনী কর্মশালায় তিনি বলেন, স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ইলিশ রপ্তানির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পানির গুণগত মান নিশ্চিত এবং শিল্পবর্জ্য নিঃসরণ বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাংলাদেশে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ইলিশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদনের পরিসংখ্যান নয়, বাস্তবে নদী ও সাগরে ইলিশের প্রাপ্যতা এবং বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা