গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক ট্রাফিক মামলা চালুর পর একেই হাতিয়ার বানিয়েছে সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারকেরা।
ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন ও জরিমানা পরিশোধের ভুয়া এসএমএস পাঠিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যাংক হিসাব খালি করে দিচ্ছে তারা। এই নতুন প্রতারণার শিকার হয়ে লাখ লাখ টাকা খুইয়েছেন ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক, চালক ও ব্যবসায়ীরা।
প্রতারণার এই কৌশল সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, চক্রটি প্রথমে গাড়ির মালিকদের কাছে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ভুয়া এসএমএস পাঠায়। মেসেজে দ্রুত জরিমানা পরিশোধের তাগাদা দিয়ে একটি লিংক যুক্ত করা হয়। ওই লিংকে ক্লিক করলেই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হুবহু নকল (ক্লোন করা) একটি ওয়েবসাইট চালু হয়। সেখানে জরিমানা দেওয়ার নামে ব্যাংক কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তথ্য ও ওটিপি হাতিয়ে নিয়ে মুহূর্তেই গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়।
সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খুলনা, ফেনী ও ঢাকায় অভিযান চালিয়ে এমন একটি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে।
গ্রেপ্তাররা হলেন, খুলনার বটিয়াঘাটার মো. রাব্বি শেখ, ফেনীর সোনাগাজীর মো. রিয়াদ হোসেন ও ঢাকার দক্ষিণখানের মো. সাজ্জাদ হোসেন।
সিআইডির ডিআইজি সানা শামীনুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, চক্রটি সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে ভুয়া পোর্টাল তৈরি করে হাজার হাজার নম্বরে খুদে বার্তা পাঠাত। তারা শুধু কার্ডের তথ্য নয়, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক অ্যাপের লগইন তথ্যও চুরি করত।
মামলার নথিপত্র ও ভুক্তভোগীদের বিবরণে প্রতারণার ভয়াবহ রূপ উঠে এসেছে। এক ভুক্তভোগী তার অফিসের গাড়ির নামে তিন হাজার টাকা জরিমানার খুদে বার্তা পান। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ করলে অর্ধেক টাকা মওকুফের প্রলোভন দেখানো হয় সেখানে। তা বিশ্বাস করে জরিমানা দিতে গিয়ে তিনি স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ড ও ব্যাংক অ্যাপের তথ্য দিয়ে ফেলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার স্ত্রীর হিসাব থেকে ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা উধাও হয়ে যায়।
একইভাবে ২৮ মে এআই মামলার জরিমানা দিতে গিয়ে ৭০ হাজার টাকা খুইয়েছেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা শাহরিয়ার ইসলাম শাহীন। পরে তিনি জানতে পারেন, প্রাইম ব্যাংকের মতিঝিল শাখার একটি এটিএম বুথ থেকে চক্রটি তার ওই টাকা তুলে নিয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ‘মামলা’, ‘আইনগত ব্যবস্থা’ বা ‘নির্ধারিত সময়সীমা’র মতো শব্দ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মনে আইনি জটিলতার ভয় তৈরি করা হচ্ছে। পোর্টালগুলো এত নিখুঁত যে অনেকেই প্রতারণা ধরতে পারছেন না।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) আগেই জানিয়েছে, ট্রাফিক জরিমানার নামে বিভিন্ন নম্বর থেকে আসা এসব খুদে বার্তার সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। ডিএমপির ট্রাফিক উত্তরা বিভাগের সার্জেন্ট ওমর ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের নির্ধারিত নম্বর ছাড়া অন্য কোনো নম্বর থেকে পাঠানো বার্তায় সাড়া দেওয়া উচিত নয়। ট্রাফিক বিভাগ কখনোই নাগরিকদের কাছে পিন, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি চায় না।
তিনি আরও বলেন, “এআই মামলা হলে শুধু খুদে বার্তা নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঠিকানায় বিস্তারিত তথ্যসহ আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হয়। তাই তড়িঘড়ি করে অর্থ পরিশোধ না করে আগে যাচাই করা প্রয়োজন।”
প্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। তারা সতর্ক করে বলেছেন, অচেনা লিংকে প্রবেশ বা ব্যাংকিং তথ্য শেয়ার করার আগে সচেতন না হলে এ ধরনের ‘ফাঁদে’ পড়ে যে কেউ মুহূর্তেই হারাতে পারেন সারা জীবনের সঞ্চয়।