আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
জাতীয় সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি মূলত মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করে থাকে। ছবি: রয়টার্স
বাংলাদেশে প্রচলিত সংসদীয় প্রথা ভেঙে জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে সদস্য করা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত আসছে।
জাতীয় সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি মূলত মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করে থাকে।
দীর্ঘদিনের সংসদীয় প্রথা ভেঙে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রতিমন্ত্রীর এই অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, “কার্যপ্রণালী বিধিতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীদের সংসদীয় কমিটির সদস্য করা যাবে না- এমন কোনো বিধান নেই। সংসদ নেতার অনুমোদন নিয়ে চিফ হুইপের প্রস্তাবক্রমে কণ্ঠভোটে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠিত হয়েছে। এ ব্যাপারে কারও আপত্তি থাকলে তা সংসদে উত্থাপনের সুযোগ ছিল।”
গত ১৫ জুন সম্পূরক কার্যসূচি অনুযায়ী অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংসদ নেতার অনুমতিক্রমে কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের নাম প্রস্তাব করেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানকে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের বর্তমান বয়স ৯০ বছর।
তিনি সরকারের সাবেক সচিব ছিলেন এবং বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এর আগে তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি নিজেও এ কমিটির সদস্য হয়েছেন।
অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মোহাম্মদ জালাল উদ্দীন (চাঁদপুর-২), মঈনুল ইসলাম খান (মানিকগঞ্জ-২), মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন (লক্ষ্মীপুর-১), মোহাম্মদ সাইফুল আলম (ঢাকা-১২), সৈয়দ জয়নুল আবেদীন (ঢাকা-৪) এবং মো. আবুল হাসনাত (কুমিল্লা-৪)।
কমিটি গঠনের পরপরই এতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
প্রতিমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের কর্মকান্ডের জন্য যেখানে স্বীয় সংসদীয় কমিটির কাছে জবাবদিহিতা করবেন, সেখানে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের জবাবদিহিতার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন; যা বিদ্যমান সংসদীয় রীতিবিরোধী।
এর আগে অষ্টম জাতীয় সংসদে কৃষিপ্রতিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সরকারি হিসাব কমিটির সদস্য করা হলে বিতর্কের মুখে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
মির্জা আলমগীর বর্তমানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন বিএনপির মহাসচিব।
কার্যপ্রণালী বিধির ১৮৮ (২) বিধি অনুযায়ী, “এমন কোন সদস্য কমিটিতে নিযুক্ত হইবেন না, যাহার ব্যক্তিগত, আর্থিক ও প্রত্যক্ষ স্বার্থ কমিটিতে বিবেচিত হইতে পারে এমন বিষয়ের সহিত সংশ্লিষ্ট আছে। কিংবা কোন কমিটিতে কাজ করিতে অনিচ্ছুক সদস্যকেও অনুরূপ কমিটিতে লওয়া যাইবে না। প্রস্তাবককে অবশ্যই জানিয়া লইতে হইবে যে, তিনি যে সদস্যের নাম প্রস্তাব করিবেন, সেই সদস্য অনুরূপ কমিটিতে কাজ করিতে রাজি আছেন।”
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “এই উপবিধিতে সদস্যের স্বার্থ বলিতে প্রত্যক্ষ, ব্যক্তিগত বা আর্থিক স্বার্থ বুঝাইবে এবং এমন কোন ব্যক্তি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হইবেন না, যাঁহার অন্তর্ভুক্তিতে আপত্তি রহিয়াছে এবং যাঁহার অন্তর্ভুক্তি সাধারণভাবে জনস্বার্থের অনুকূলে নয়, অথবা কোন শ্রেণী বিশেষ অথবা উহার অংশের পরিপন্থী, অথবা রাষ্ট্রীয় নীতি অনুযায়ী যাঁহার অন্তর্ভুক্তিতে আপত্তি রহিয়াছে।”
জাতীয় সংসদে অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “সংসদ চলে সংবিধান, কার্যপ্রণালী বিধি ও রেওয়াজ দিয়ে। পার্লামেন্টারি প্র্যাকটিসে দীর্ঘ রেওয়াজকে আইনের মতোই অনুসরণ করা হয়। এবং এটা ভঙ্গ করা একটি ‘ব্যাড প্র্যাকটিস’। সংসদীয় ভাষায় 'ব্যাড প্র্যাকটিস' নিন্দনীয়। তার এই নিয়োগের মাধ্যমে সংসদের একটি প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজকে ভঙ্গ করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “জাতীয় সংসদের বিদ্যমান কার্যপ্রণালী বিধিতে নানা অসঙ্গতি বিদ্যমান রয়েছে, এর মধ্যে এটিও একটি। এছাড়া সংসদীয় কমিটির সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকেও কম গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়ে থাকে। আবার ভিন্ন অর্থে দেখলে বিগত সময়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, মন্ত্রণালয়ের কর্মকান্ডে সংসদীয় কমিটির সদস্যরা অযাচিত প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ক্ষেত্রে কোন ফ্যাক্টর কাজ করছে, সেটা পরিষ্কার নয়। তবে নৈতিকভাবে সংসদীয় কমিটির সদস্য হিসেবে একজন প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতি দৃষ্টিকটু।”
প্রসঙ্গত: ১৯৯৭ সালের আগে জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করতেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। সরকারের কর্মকান্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়োগের বিধান করা হয়। যে কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মীর শাহে আলমের নিয়োগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ ভাঙা হয়েছে।