রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর তিস্তা সেতুর রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ধস দেখা দিয়েছে।
গত শনিবার সন্ধ্যা থেকে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতের কারণে সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের রক্ষা বাঁধের অন্তত ৪০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এতে ভাঙন হুমকিতে পড়েছে বাঁধের আশপাশের গ্রাম। অনেকে বাদামসহ বিভিন্ন অপরিপক্ব ফসল ঘরে তুলে নিয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তিস্তাপাড়ের বাসিন্দারা।
উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদীর পানি বাড়ায় গত বছর করা বাঁশের পাইলিংও ভেঙে গেছে। এতে হুমকিতে পড়েছে দ্বিতীয় তিস্তা সেতুসহ রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক। সড়কটির অন্তত দশটি পয়েন্টে ভাঙন দেখা গেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগ ব্যবস্থা যেকোনো সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
সরেজমিন দেখা যায়, উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। রবিবার বেলা ৩টায় তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ও কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধিতে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উজানের ঢলে গঙ্গাচড়ায় তিস্তা সেতুরক্ষা বাঁধের ব্লক ধ্বসে যাচ্ছে। বাঁধ ভাঙতে থাকায় লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চর শংকরদহ, চর ইচলী, চর বাগেরহাট, চর কেল্লাবন্দ গ্রামের ১ হাজারের বেশি পরিবারের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ-মাদ্রাসা, অস্থায়ী স্কুল হুমকিতে পড়েছে। হুমকিতে পড়েছে রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়কে ও ১২১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিস্তা সড়ক সেতুও।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যার পর নদীর পানির চাপ বাড়তে থাকলে বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেয়। পরে অল্প সময়ের মধ্যেই বড় অংশ ধসে পড়ে নদীতে চলে যায়। ধসের স্থানে প্রায় ৬০ ফুট গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সেতুর সংযোগ সড়ক এবং আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত বছরও একই স্থানে প্রায় ১০০ ফুট এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছিল। তখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানালেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ টেকসই সমাধানের পরিবর্তে অস্থায়ীভাবে বাঁশের পাইলিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সেই কাজ করা হলেও এবার পানির তীব্র স্রোতে পাইলিং ভেঙে গেছে।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, গত বছর এক লাখ টাকার জিও ব্যাগ ফেললে সেতু রক্ষা বাঁধ আর ভাঙত না। শুকনা মৌসুমে এখানে বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে ১৪ লাখ টাকার বাঁশের পাইলিং করে এলজিইডি। কিন্তু বর্ষায় সেই পাইলিং টিকতে না পারায় এলাকাবাসীর ১৪ টাকারও উপকার হয়নি। আমি মনে করি, সেতুরক্ষা বাঁধে ১০ লাখ টাকার জিও ব্যাগ ফেললে এখনও ভাঙন ঠেকানো যাবে। কিন্তু এলাকার দায়িত্বশীল কোনো জনপ্রতিনিধি না থাকায় তিস্তাপাড়ের মানুষের দুঃখ শেষ হচ্ছে না।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার জানান, কিছুদিন আগে এলজিইডি তিস্তা সেতুরক্ষা বাঁধ রক্ষার জন্য ১৪ লাখ টাকার বাঁশের স্পার দিয়েছিল। সেটি শনিবার পানির তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ও জেলা প্রশাসক স্যারকে জানিয়েছি। ইতোমধ্যে এলজিইডি ঢাকায় চিঠি লিখেছে। আশা করছি, দ্রুত সেতুরক্ষা বাঁধ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসা বলেন, তিস্তায় বাঁশের যে প্রতিরক্ষা তৈরি করা হয়েছিল, উজানের ঢলে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিস্তা সেতুরক্ষা বাঁধে ভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এ নিয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞ দল গঙ্গাচড়ায় আসছে।
সুনামগঞ্জ ও লালমনিরহাটে বন্যার শঙ্কা
এদিকে টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের সব নদ-নদীগুলোর পানি বেড়েছে। এতে জেলার নিম্নাঞ্চলগুলোতে সাময়িক বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে তাহিরপুরের আনোয়ারপুর সড়ক। এতে সুনামগঞ্জের সঙ্গে তাহিরপুর উপজেলার সরাসরি সড়ক পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নদীর পানি বাড়ছে। তবে বৃষ্টিপাত হলে স্বল্প মেয়াদি বন্যা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এখনও কোনো নদনদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি।
অপরদিকে, উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে চরাঞ্চল ও নিম্ন অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে সকাল ৯টায় পানি বিপদসীমার ২৩ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পাউবো জানিয়েছে, উজানের ঢল এবং অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। কয়েকটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে তিস্তা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমাত্রার বন্যা দেখা দিতে পারে।