আসছে আইএমএফ মিশন
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদর দপ্তর। ছবি: সংগৃহীত
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন করে ঋণ আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে বহুপক্ষীয় এই দাতা সংস্থার সঙ্গে প্রায় ৪০০ কোটি (৪.০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি নতুন ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আনুষ্ঠানিক দরকষাকষি শুরু হবে বলে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইএমএফের সঙ্গে সম্পাদিত চলমান ঋণ কর্মসূচিটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইএমএফের বকেয়া কিস্তি ছাড় এবং বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়ায় বিদ্যমান চুক্তিটি কার্যত গতি হারিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার পুরনো কর্মসূচিটি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেছে। এর পরিবর্তে তিন বছর মেয়াদি একটি সম্পূর্ণ নতুন ঋণ প্যাকেজের আওতায় প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম এবং নীতিগত অগ্রাধিকারের একটি নতুন কাঠামো নির্ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।
এই নতুন আর্থিক সহায়তার রূপরেখা নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আগামী মাসে ঢাকা সফরে আসছে। আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে এই দল আগামী ১২ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করবে। সফরকালে তারা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডা এবং অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বর্তমানে এসব আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পাশাপাশি তিন বছর মেয়াদি সংস্কার কার্যক্রমের একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুত করছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পূর্ববর্তী চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত বেশকিছু সংস্কার শর্ত বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা কঠিন। তবে নতুন কর্মসূচিতে আইএমএফ এসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব পুরোপুরি বাদ দেবে না; বরং সেগুলোর বাস্তবায়নের সময়সীমা কিছুটা বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে।
অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সংস্কার করা, ব্যাংকিং খাতের বড় ধরনের সংস্কার এবং বিনিময় হারে অধিকতর নমনীয়তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো নতুন ঋণ প্যাকেজের শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকছে।
এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে এক বিবৃতিতে আইএমএফের মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার জানান, বাংলাদেশের নতুন কর্তৃপক্ষের সংস্কার এজেন্ডা এবং নীতিগত অগ্রাধিকার বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে কাজ করছে আইএমএফ। তবে যেকোনো নতুন চুক্তি মূলত বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) এবং একটি নির্ভরযোগ্য সংস্কার কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে এই চুক্তি আইএমএফের নিজস্ব নীতিমালা ও নির্বাহী বোর্ডের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল।
সংস্থাটি স্বীকার করেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ঋণ অনুমোদনের সময়কার তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে বর্তমান সরকারকে আরও জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং নিম্ন রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি টেকসই ও নবায়নকৃত সংস্কার উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা দেখছে আইএমএফ।
প্রসঙ্গত, কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশের রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস নামে, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন সরকার আইএমএফের কাছে ৪৭০ কোটি (৪.৭ বিলিয়ন) ডলারের ঋণের আবেদন করে, যা পরবর্তীতে আরও ৮০ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়ে মোট ৫৫০ কোটি (৫.৫ বিলিয়ন) ডলারে উন্নীত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে সাতটি কিস্তিতে এই অর্থছাড়ের কথা ছিল। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩.৫৯৫ বিলিয়ন ডলার গ্রহণ করেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বকেয়া কিস্তির ওপর নির্ভর না করে, এখন নতুন অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থনীতির বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পথ অনুসন্ধান করছে নতুন সরকার।