× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রিজার্ভ চুরির এক দশক পর বিবি’র উদ্যোগ

সুইফট নিরাপত্তায় বড় সংস্কার

তানভীর হাসান

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে

বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রধান কার্যালয়। ফাইল ছবি

বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রধান কার্যালয়। ফাইল ছবি

বহুল আলোচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার এক দশক পর আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম সুইফট ব্যবস্থার নিরাপত্তায় ব্যাপক সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাইবার সুরক্ষা জোরদার, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের (বিভাগ-১) প্রস্তুত করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সুইফট সার্ভার রুম পরিদর্শনকারী তদন্ত দলের পর্যবেক্ষণ ও আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির সুপারিশের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের (বিবি) সুইফট সার্ভার রুম পরিদর্শন করেন। সে সময় রিজার্ভ চুরি তদন্তের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন দল সার্ভার কক্ষের বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রাথমিক পর্যালোচনা করে। পরবর্তীতে কেপিএমজির বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোও সংস্কার পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়।

সার্ভার ও পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি

সুইফট ব্যবস্থার পরিচালনায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো সার্ভার সার্বক্ষণিক চালু রাখার আগের পুরোনো চর্চা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। এখন কেবল প্রয়োজন অনুযায়ী সার্ভার ব্যবহারের নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক বার্তা ও লেনদেন নিষ্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলকভাবে আধুনিক হার্ডওয়্যার সিকিউরিটি মডিউল (এইচএসএম) ব্যবহার শুরু হয়েছে।

পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনাতেও আনা হয়েছে নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে সুইফট সিস্টেমের মূল পাসওয়ার্ড প্রতি ৩০ দিন পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রতিটি লগ-ইনের সময় ‘মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন’-এর মাধ্যমে ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কর্মকর্তারা যাতে কোনোভাবেই পাসওয়ার্ড লিখে সংরক্ষণ না করেন, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। প্রিভিলেজড অ্যাকসেস ম্যানেজমেন্টের আওতায় জাস্ট-ইন-টাইম অ্যাকসেস চালু করা হয়েছে, যার ফলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সিস্টেমে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় এবং সময়সীমা শেষ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্নকরণ ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন

সাইবার হামলা প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে সুইফট সার্ভার ও ওয়ার্কস্টেশন রুমকে ব্যাংকের সাধারণ ইন্টারনেট ও ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। এর ফলে বাইরের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হ্যাকারদের অননুমোদিত প্রবেশের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। আগের তুলনায় আরও নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে পুরনো ও দুর্বল ভিপিএনের পরিবর্তে সুইফটের সরাসরি সরবরাহ করা আন্তর্জাতিক মানের ভিপিএন বক্স সংযুক্ত করা হয়েছে।

প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি সার্ভার রুমের ভৌত ও পরিবেশগত অবকাঠামো উন্নয়নেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। পুরনো তার ও নেটওয়ার্ক র‍্যাক অপসারণ করে এক্সহস্ট ফ্যান সংবলিত আধুনিক র‍্যাক স্থাপন করা হয়েছে। সার্ভার রুম, পাওয়ার রুম ও ওয়ার্কস্টেশন রুমের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের জন্য চালু হয়েছে ডিজিটাল এনভায়রনমেন্টাল মনিটরিং সিস্টেম।

সাইবার সুরক্ষায় নতুন প্রযুক্তি

আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি নতুন সুইফট ব্যবস্থার ওপর পর্যালোচনা করে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এর বেশির ভাগ সুপারিশই ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অর্থ পাচার প্রতিরোধে সুইফটের জন্য বিশেষ অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং টুল কেনা হয়েছে, যা নতুন ব্যবস্থা চালুর পর পুরোপুরি একীভূত করা হবে।

এসব প্রযুক্তিগত রূপান্তর কার্যকর রাখতে দক্ষ জনবল তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আইটি কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও পদায়নে আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা সনদকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রযুক্তি স্থাপন করলেই সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; এর সঙ্গে প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি ও দক্ষ জনবল। চলমান উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে আস্থা বাড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

আলোর মুখ দেখছে মামলার তদন্ত

একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন তাদের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তায় আমূল পরিবর্তন আনছে, অন্যদিকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় এই আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্তও দীর্ঘ এক দশক পর আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এই ডিজিটাল ডাকাতির ঘটনার তদন্ত শেষ করে প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার একটি সুনির্দিষ্ট ও বিশদ চার্জশিট চূড়ান্ত করেছে, যা শিগগিরই আদালতে দাখিল করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চূড়ান্ত এই চার্জশিটে দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ ব্যাংকের ১০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে তৎকালীন গভর্নরের দায়িত্বে চরম গাফিলতি, চুরির ঘটনা প্রাথমিকভাবে গোপন রাখা এবং আলামত ধ্বংসের চেষ্টার প্রমাণ মিলেছে। এই অপরাধচক্রে বাংলাদেশ ছাড়াও ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, চীন, জাপান, ভারত ও উত্তর কোরিয়ার বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ এই তদন্ত প্রক্রিয়া মোটেও সহজ ছিল না। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশীয় আসামিদের আড়াল করতে রাজনৈতিকভাবে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং তৎকালীন সিআইডি প্রধানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশিদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য তীব্র চাপ প্রয়োগ করা হয়। এমনকি এই অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় প্রথম তদন্ত কর্মকর্তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠক থেকে বের করে দেওয়া এবং পরবর্তীতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করার মতো ঘটনাও ঘটে।

ফরেনসিক প্রতিবেদন, সুইফটের ডাটা, বিভিন্ন দেশের আইনি সহায়তা চুক্তির (এমএলআর) মাধ্যমে প্রাপ্ত নথিপত্র এবং আসামিদের জবানবন্দির ভিত্তিতে সিআইডি এই অকাট্য প্রমাণাদি দাঁড় করিয়েছে। বর্তমানে চার্জশিটটি আইনি পর্যালোচনার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে সবুজ সংকেত পেলেই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে দাখিল করা হবে।


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা