× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কল্যাণের নামে মার্কেট বাণিজ্য

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে

দোকান বরাদ্দ, জমি ব্যবহারের বৈধতা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও সুবিধাভোগীদের তালিকা নিয়ে বেবিচকেই জমে উঠেছে ব্যাপক অসন্তোষ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দোকান বরাদ্দ, জমি ব্যবহারের বৈধতা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও সুবিধাভোগীদের তালিকা নিয়ে বেবিচকেই জমে উঠেছে ব্যাপক অসন্তোষ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে গঠিত ইউনিট কমিটির নামে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকায় একাধিক বহুতল বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে এসব মার্কেটের দোকান বরাদ্দ, জমি ব্যবহারের বৈধতা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও সুবিধাভোগীদের তালিকা নিয়ে সংস্থাটিতেই জমে উঠেছে ব্যাপক অসন্তোষ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই অসন্তোষের উত্তাপ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিমানবন্দর সংলগ্ন আশকোনা হজ ক্যাম্পের সামনে বেবিচকের মালিকানাধীন জমিতে কয়েকটি বহুতল বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। এসব মার্কেট নির্মাণে অনুমোদন, জমি বরাদ্দ ও দোকান বণ্টনের পুরো প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল তা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।

অভিযোগ, সাবেক সরকারের সময় সংস্থার প্রভাবশালী এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং পরে দোকান বরাদ্দেও বড় অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। এর ফলে বিপুলসংখ্যক কর্মচারী বঞ্চিত হয়েছেন। 

কল্যাণ কমিটির নামে বাণিজ্যিক স্থাপনা

বিমানবন্দর ইউনিট কমিটির নামে বেবিচকের জমিতে প্রথমে একটি বহুতল মার্কেট ও পরে একই এলাকায় আরও একটি ছয়তলা বাণিজ্যিক ভবন গড়ে তোলা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এগুলোকে উপস্থাপন করা হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে। বাস্তবে এসব দোকানের বরাদ্দ ও মালিকানা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ কর্মচারীর দাবি, কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য গঠিত একটি কমিটির নামে বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ এসব মার্কেট থেকে কারা অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই।

‘দোকান গেছে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচকের কয়েকজন কর্মচারী অভিযোগ করেন, মার্কেট নির্মাণের সময় সাধারণ কর্মীদের স্বার্থের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত দোকান বরাদ্দে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী সুবিধা নিয়েছে।

তাদের ভাষ্য, “বিগত সরকারের সময় কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে দোকানের অবস্থান, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিজেদের অনুকূলে নিয়েছেন। অথচ যারা দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছেন, তাদের অনেকেই দোকান বরাদ্দ পাননি। এসব নিয়ে সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।’

পরিচালক নুরুল ইসলামের দোকান নিয়ে প্রশ্ন

বিতর্কের কেন্দ্রে আসা নামগুলোর মধ্যে অন্যতম মো. নুরুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি বেবিচকের অডিট বিভাগের পরিচালক। অভিযোগ রয়েছে, আশকোনা মার্কেটের নিচতলার সবচেয়ে মূল্যবান অবস্থানের দোকানটি তার নামে বরাদ্দ হয়েছে। দোকানটি তিনি একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে মাসিক ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া দেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি কর্মচারীদের কল্যাণ প্রকল্প হলে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কীভাবে দোকানটিকে ব্যক্তিগত বিনিয়োগের বা বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত করেন, তা যাচাই করা দরকার।’ তবে নুরুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, তিনি যথাযথ নিয়ম মেনে দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

‘ফাইল আটকে রেখে সুবিধা নেওয়ার’ অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, মার্কেট নির্মাণের অনুমোদন ও জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো হয়েছে। তাদের দাবি, বিভিন্ন পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে পরোক্ষভাবে দোকানের অংশীদার হয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো নথি এখনও সামনে আসেনি। তবে অনেক কর্মচারীই মনে করেন, পুরো বিষয়টির একটি স্বাধীন নিরীক্ষা প্রয়োজন।

৫ হাজার সদস্য, দোকান মাত্র ৩২০টি

বিমানবন্দর ইউনিট কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও অ্যারোড্রাম অফিসার মো. শাহাদাত হোসেন অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ইউনিট কমিটির সদস্য সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। কিন্তু হজ ক্যাম্পের সামনে নির্মিত মার্কেটে দোকানের সংখ্যা মাত্র ৩২০টি। তাই সবাইকে দোকান দেওয়া সম্ভব হয়নি।” তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে দোকান বণ্টনের অভিযোগ সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেছেন। 

এদিকে প্রশ্ন উঠেছে, দোকান বণ্টনের জন্য তা হলে কী ধরনের নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে, কারা অগ্রাধিকার পেয়েছেন এবং কীভাবে চূড়ান্ত তালিকা করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা এসব বিষয়ে কোনো কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। 

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ও ইউনিট কমিটির সভাপতি গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদ জানান, তার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমার সময়ে জমি বরাদ্দ কিংবা দোকান বণ্টনের কোনো প্রক্রিয়া হয়নি।”

উত্তেজনার পেছনে জমে থাকা ক্ষোভ

সম্প্রতি বেবিচকে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে শতাধিক কর্মচারী বিক্ষোভ করেন সদর দপ্তরের সামনে। একপর্যায়ে মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে মানববন্ধনও করে তারা। এতে বিমানবন্দর সড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই ঘটনার পেছনে কেবল তাৎক্ষণিক কারণ নয়, দীর্ঘদিনের অসন্তোষও ভূমিকা রেখেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বেবিচক কর্মকর্তা বলেন, “মার্কেট, দোকান বরাদ্দ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই পুরোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।”

তার মতে, বিষয়গুলোর সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিমানবন্দর ইউনিট কল্যাণ কমিটির মূল উদ্দেশ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণ নিশ্চিত করা।”

তিনি জানান, এই কমিটি সাধারণত চিকিৎসা সহায়তা, আর্থিক অনুদান, আবাসন সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তার প্রশ্ন, “যদি কল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে কোনো সম্পদ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে সেই সম্পদের আয়-ব্যয়ের হিসাব কতটা স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”

প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্তের

বিমান খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে নির্মিত যেকোনো বাণিজ্যিক স্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের মতে, কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজনÑ কোন নীতিমালার ভিত্তিতে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, মার্কেট নির্মাণে মোট ব্যয় কত, অর্থের উৎস কী ছিল, দোকান বরাদ্দের মানদণ্ড কী, বর্তমানে মার্কেট থেকে কত আয় হচ্ছে, সেই আয় কোথায় ও কীভাবে ব্যয় হচ্ছে। তারা বলছেন, এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিতর্ক অনেকটাই কমে আসবে। তা ছাড়া কর্তৃপক্ষ ও বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যে দূরত্ব, বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে তা দূর করার একমাত্র পথ হতে পারে নিরপেক্ষ তদন্তÑ যেখানে জমি বরাদ্দ থেকে শুরু করে দোকান বণ্টন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা হবে। কারণ প্রশ্নটি কেবল ৩২০টি দোকানের নয়Ñ প্রশ্নটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা