গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রায় হয়নি। অপরাধ প্রমাণ হয়নি। আদালতও এখনও কাউকে দোষী বলেনি। অথচ বছরের পর বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেই দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।
বিচারিক প্রক্রিয়ায় এখনও যাদের অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি, কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাদের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের কারাগারগুলোর বর্তমান চিত্র এমন এক বাস্তবতার কথা বলছে, যেখানে সাজা পাওয়া কারাবন্দির চেয়ে বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা আড়াইগুণ বেশি। এভাবে ধীরে ধীরে সংশোধনাগার হয়ে ওঠা দূরে থাক, বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষাকক্ষে পরিণত হচ্ছে দেশের কারাগারগুলো
গতকাল সোমবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে দেওয়া কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,
দেশে বর্তমানে ৭৪টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগার এবং ৫৯টি জেলা
কারাগার। এসব কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৩৬ জন। অথচ বর্তমানে বন্দি রয়েছেন
৭৮ হাজার ৫০০ জন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার চেয়ে ৩৩ হাজার ৩৬৪ জন বেশি বন্দি কারাগারে অবস্থান
করছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য, এই বিপুল বন্দির মধ্যে ৫৫ হাজার ৮০০ জনই বিচারাধীন।
বিপরীতে সাজাপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা ২২ হাজার ৭০০ জন। অর্থাৎ কারাগারে থাকা প্রতি ১০
জন বন্দির মধ্যে প্রায় ৭ জন এখনও আদালতের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত হননি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান শুধু কারাগারের অতিরিক্ত ভিড়ের চিত্র
নয়; এটি দেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, মামলা জট, তদন্ত বিলম্ব এবং জামিনব্যবস্থার
সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন।
কারাগার নাকি বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষাকক্ষ:
দেশের কারাগারগুলোতে বর্তমানে মোট বন্দির প্রায় ৭১ শতাংশই বিচারাধীন। অথচ সংবিধান ও
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি অনুযায়ী বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত
একজন ব্যক্তি নির্দোষ বলেই বিবেচিত হবেন। বাস্তবে বহু মানুষকে বছরের পর বছর কারাগারে
থাকতে হচ্ছে শুধুমাত্র বিচার শেষ না হওয়ার কারণে।
মামলা জটের ভার কারাগারে: বিচারাধীন বন্দির
সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ বিচারে বিলম্ব ঘটা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ
ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের
বাংলাদেশকে বলেন, “আমাদের দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বন্দির সংখ্যা অনেক
বেশি। এর অন্যতম কারণ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে না পারা। বিচার দ্রুত
নিষ্পত্তি করা গেলে অতিরিক্ত বন্দির সংখ্যা অনেকাংশে কমে আসত।” তিনি বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদন
দিতে বিলম্ব, আদালতে মামলা জট, বিচারকের স্বল্পতা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে
বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।”
ড. তৌহিদুল হক বলেন, “অনেক ছোটখাটো বিরোধ ও মামলাও বছরের পর বছর আদালতে
ঝুলে থাকে, যা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজেই সমাধান করা
সম্ভব। অনেক মামলায় মূল বিষয় অপরাধ নয়, বরং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও প্রতিশোধের মানসিকতা।
এসব মামলার বড় অংশ আদালতের বাইরে বিকল্প পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করা গেলে বিচারব্যবস্থা
ও কারাগার দুই ক্ষেত্রেই চাপ কমবে।”
বিনা রায়ে বন্দিত্ব, মানবাধিকারের প্রশ্ন:
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিচারাধীন বন্দিদের বড় অংশই নিম্ন-আয়ের মানুষ। তাদের অনেকেই
জামিন পাওয়ার যোগ্য হলেও অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, আইনি সহায়তার অভাব অথবা মামলার জটিলতার
কারণে কারাগারে আটকে থাকেন। এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। পরিবারের উপার্জনক্ষম
ব্যক্তি কারাগারে থাকলে স্ত্রী-সন্তানকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, “একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিরও আইনগত অধিকার রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই অধিকারগুলো নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। যাকে বাইরে রেখেও
বিচার শেষ করা সম্ভব, তাকেও বছরের পর বছর কারাগারে রাখা মানবাধিকারের গুরুতর প্রশ্ন
তৈরি করে।”
নিরাপত্তা ঝুঁকিতে কারাগার: ধারণক্ষমতার তুলনায়
১৭৪ শতাংশ বন্দি থাকার কারণে কারাগারগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে। কারা প্রশাসনের
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “অতিরিক্ত
বন্দির কারণে আবাসন সংকট তীব্র হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে
পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে এবং বন্দিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়ছে।”
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (এআইজি) জান্নাত উল ফরহাদ
বলেন, “অন্য কোনো সমস্যা না হলেও কারারক্ষীদের ওপরও অতিরিক্ত চাপ বাড়ছে। বন্দি নিয়ন্ত্রণ,
বন্দির হিসাব রাখা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা অনেকটাই
কঠিন হয়ে উঠছে।”
তিনি বলেন, “পুলিশের তদন্ত থেকে শুরু করে বিচারিক কার্যক্রমে ধীরগতির
কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সামাল
দিচ্ছে।”
সংশোধনের বদলে বন্দিত্ব: বিশ্বের আধুনিক কারাব্যবস্থার
অন্যতম লক্ষ্য হলো বন্দিদের সংশোধন এবং পুনর্বাসন। কিন্তু অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে সেই
লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, “কারাগারের ভেতরে এমন একটি জীবনব্যবস্থা তৈরি
করা প্রয়োজন, যা একজন মানুষকে সংশোধন করে সমাজে ফিরতে সহায়তা করবে। কিন্তু শিক্ষা,
প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার না হওয়ায় অনেক বন্দি কারাগার থেকে
বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।”
নারী ও বিদেশি বন্দিদের বাস্তবতা:
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের কারাগারে ৩৯৩ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন।
এ ছাড়া নারী বন্দির সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। নারী বন্দিদের একটি বড় অংশও বিচারাধীন। তাদের
মধ্যে কেউ কেউ শিশু সন্তান নিয়ে কারাগারে বসবাস করছেন। ফলে বিচার বিলম্বের প্রভাব শুধু
বন্দির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়ছে শিশুদের জীবন ও ভবিষ্যতের ওপরও।
বাড়ছে রাষ্ট্রীয় ব্যয়: কারাগারে অতিরিক্ত বন্দি
থাকার আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ওপর। খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, আবাসন
এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিন বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা
কমে এলে কারাগারে চাপ কমার পাশাপাশি রাষ্ট্রের ব্যয়ও কমে আসবে।
সমস্যার সমাধানের বিষয়ে ড. তৌহিদুল হক বলেন, “নতুন কারাগার নির্মাণ
সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কারা প্রশাসনের
সমন্বিত সংস্কার। যেসব মামলায় অভিযুক্তকে বাইরে রেখেও বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব, সেসব
ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। এডিআর ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে। দীর্ঘদিন ঝুলে
থাকা মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা যেতে পারে।”
তিনি বলেন, “কারা ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে
একসঙ্গে বসে একটি সমন্বিত সংস্কার পরিকল্পনা করতে হবে।”