বোরহান উদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ১৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৯ ঘণ্টা আগে
বাংলাবাজারে বইপাড়ায় নেই ক্রেতাদের তেমন আনাগোনা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বছর কয়েক আগেও বই প্রকাশনা, মুদ্রণ ও বিপণনের প্রাণকেন্দ্র ছিল পুরান ঢাকার বাংলাবাজার। লেখক, প্রকাশক, পরিবেশক ও বই-ব্যবসায়ীদের প্রধান মিলনস্থল ছিল এই ঐতিহ্যবাহী এলাকা। নতুন-পুরনো বইয়ের ঘ্রাণে ভরপুর বাংলাবাজারে আসতেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বই-ব্যবসায়ীরা, দেখা মিলত প্রতিষ্ঠিত লেখক থেকে শুরু করে যশকামী নবীনদেরও।
কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই চিত্র বদলেছে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর
অধিকাংশই এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। ফলে বাংলাবাজারের আগের সেই ব্যস্ততা
আর দেখা যায় না বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে প্রকাশনা খাত সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, ঢাকা
মহানগর এখন অনেক বিস্তৃত হয়েছে। পাশাপাশি গত দুই দশক ধরে ধীরে ধীরে হলেও রাজধানীর বই
ব্যবসার কেন্দ্র বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এখন আর তা বাংলাবাজার-কেন্দ্রিক নয়। বরং ছড়িয়ে পড়েছে
শাহবাগ, আজিজ সুপার মার্কেট, বাংলামোটর, ধানমন্ডি, কাটাবন থেকে শুরু করে উত্তরাতেও।
এমনকি বড় বনেদী পুরনো অনেক প্রকাশনীও যোগাযোগ-যানজটসহ বিভিন্ন ঝামেলার কারণে বাংলাবাজারের
পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে কার্যালয় স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অনেক
প্রকাশক আবার স্থায়ীভাবে অন্যখানে স্থানান্তরিতও হয়েছেন আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার সুবিধা
নিতে।
বাংলাবাজারে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন এমন কয়েকজন প্রকাশক জানান,
আগে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ক্রেতারা বই কিনতে আসতেন। বর্তমানে সেই
সংখ্যা অনেক কমেছে। কারণ অনেক প্রকাশনীই অন্য কোথাও নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলেছে
এবং সরাসরি জেলা পর্যায়ে বই সরবরাহ করছে। ফলে বাংলাবাজারের ওপর নির্ভরশীলতা আগের তুলনায়
কমে গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রযুক্তির প্রসারও এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ।
এখন সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন বুকস্টোর এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বই বিক্রির
প্রবণতা বেড়েছে। পাঠকরা ঘরে বসেই বই অর্ডার করতে পারছেন। ফলে বই কেনার জন্য বাংলাবাজারে
আসার প্রয়োজনীয়তা অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে।
এ ছাড়া পুরান ঢাকা যানজট, সংকীর্ণ সড়ক এবং পার্কিং সংকটও বাংলাবাজারের
ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন অনেকেই। অনেক ক্রেতা ও পরিবেশক যোগাযোগের
সুবিধা বিবেচনা করে অন্য এলাকাভিত্তিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন করছেন।
বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলার বিস্তৃত পরিসরও প্রকাশনা খাতের
ব্যবসায়িক কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে। বাংলাবাজারের বাইরেও বিভিন্ন স্থানে নতুন বই প্রকাশের
কেন্দ্র বিকশিত হয়েছে। এসব প্রকাশনীও বইমেলার অংশীদার হয়ে উঠেছে। অনেক প্রকাশকই সারা
বছর বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন; তবে বইমেলাকে ঘিরেও তার বিপণন পরিকল্পনা
রয়েছে। এ কারণে বইমেলার ওপরও বাংলাবাজারের ঐতিহ্যগত কেন্দ্রীয় ভূমিকা কমে এসেছে।
মাওলা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আহমেদ মাহমুদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে
জানান, বাংলাবাজার বই প্রকাশনার ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে
ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেক প্রকাশনী গড়ে উঠেছে। এটি একদিক থেকে
ইতিবাচক, কেননা এতে বাংলাবাজারের ওপর এত চাপ পড়ছে না। আবার অনেক অনলাইন প্লাটফর্মেই
ই-বুক থাকায় বাংলাবাজারের ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ কমেছেÑ এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই।
বই ব্যবসায়ীদের অনেকেই মনে করছেন, নানা পরিবর্তন ঘটলেও বাংলাবাজারের
গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়নি। এখনও দেশের পাঠ্যপুস্তক, ধর্মীয় গ্রন্থ, গাইড বই ও প্রচুর সাধারণ
বইয়ের পাইকারি বাজার হিসেবে এলাকাটির অবস্থান শক্তিশালী। বহু পুরনো প্রকাশনা ও মুদ্রণ
প্রতিষ্ঠান এখানেই তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার বই এখান থেকেই
বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে।
তারা বলেন, বাংলাবাজারের আধুনিকায়ন ঘটালে এবং উন্নত অবকাঠামো, সহজ
যোগাযোগব্যবস্থা এবং ডিজিটাল বিপণনের সঙ্গে সংযুক্ত করা গেলে আবারও এই কেন্দ্র গতি
ফিরে পাবে। তাদের মতে, প্রকাশনা শিল্পের ঐতিহ্যবাহী এই কেন্দ্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক ওসমান গনি দাবি করেন, ‘বাংলাবাজার তার ঐতিহ্য
এখনও হারায়নি। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রকাশনী গড়ে ওঠায় ও ই-বুক বা অনলাইনে প্লাটফর্মে
বই কেনাবেচার কারণে এর চাহিদা খানিকটা কমছে। তবে বর্তমানে প্রায় প্রতিটি প্রকাশনীই
অনলাইনে নিজেদের বই বিক্রি করে। আধুনিকীকরণের পথ তারাও বেছে নিয়েছে। তাই কার্যত প্রকাশনীগুলোর
বিপর্যয় ঘটেনি।’
প্রকাশনা খাত সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ প্রকাশকদের মতে, আধুনিক অবকাঠামো,
উন্নত বিপণনব্যবস্থা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করতে পারলে বাংলাবাজার আবারও
নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
প্রকাশনা জগতের ইতিহাসে বাংলাবাজার শুধু একটি ব্যবসাকেন্দ্র নয়, এটি
বাংলাদেশের বই ও পাঠ-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের পরিবর্তনে এর চরিত্র বদলালেও
বই ব্যবসার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বাংলাবাজারের গুরুত্ব এখনও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে নতুন বাস্তবতায় টিকে থাকার জন্য এটির আধুনিকায়নও ঘটাতে হবে। প্রশ্ন একটাইÑসময়ের
সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারবে কি বাংলাবাজার? নাকি ইতিহাসের পাতায়
স্বর্ণযুগের কাহিনী হয়ে উঠবে?