× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এক দশক পর রিজার্ভ চুরির চার্জশিট প্রস্তুত

আহমেদ তোফায়েল ও তানভীর হাসান

প্রকাশ : ৯ ঘণ্টা আগে

ডিজিটাল জালিয়াতি, হ্যাকিং, অর্থ চুরি ও আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) সুনির্দিষ্ট ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ডিজিটাল জালিয়াতি, হ্যাকিং, অর্থ চুরি ও আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) সুনির্দিষ্ট ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও চাঞ্চল্যকর আর্থিক অপরাধÑ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি ও হ্যাকিং মামলার তদন্তে দেশি-বিদেশি অপরাধী চক্রের বিশাল নেটওয়ার্কের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ মিলেছে। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে রাজধানীর মতিঝিল থানায় করা এই মামলার নথিপত্র, আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন এবং ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধের অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এরই মধ্যে ১০ হাজার পৃষ্ঠার মামলার ডকেট এবং খসড়া চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট নথির তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের বিস্তার বাংলাদেশসহ বিশ্বের সাতটি দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। ডিজিটাল জালিয়াতি, হ্যাকিং, অর্থ চুরি ও আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) সুনির্দিষ্ট ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে।

আইনি নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় করা ১৩ নম্বর মামলার অধীনে এই তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে। মামলাটিতে ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের (২০১৫ সালের সংশোধনীসহ) ৪ ধারা, ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৪ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

রিজার্ভ চুরি ও অর্থ পাচারের এই বৈশ্বিক অপরাধে বাংলাদেশসহ সাতটি দেশের হ্যাকার ও আর্থিক খাতের কর্মকর্তারা জড়িত। চুরি হওয়া অর্থ বৈধ (মানি লন্ডারিং) করার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় চক্রটি ছিল ফিলিপাইনে। সেখানকার ৩৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই তালিকায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল সিস্টেমে অনুপ্রবেশ ও হ্যাকিং প্রক্রিয়া সফল করতে কারিগরি ও কৌশলগত সহায়তা দেওয়ার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে ভারতের চার নাগরিকের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া এই বিশাল নেটওয়ার্কে উত্তর কোরিয়া, চীন, শ্রীলঙ্কা ও জাপানের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে।

আন্তর্জাতিক এই চক্রের পাশাপাশি খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ জন সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাকে এই মামলার চার্জে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেনÑ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, ব্যাংকার আনিস এ খান, কেএম আবদুল ওয়াদুদ, শুভঙ্কর সাহা, রেজাউল করিম, জোবায়ের বিন হুদা, এএফএম আসাদুজ্জামান, মেজবাউল হক, আবুল কাসেম এবং মো. সুলতান মাসুদ আহম্মেদ।

তদন্তের নথিতে দেখা যায়, এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সংগৃহীত সুইফট করেসপনডেন্স ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ রেজাউল করিম ও জোবায়ের বিন হুদার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্তে বলা হয়েছে, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করেÑ কর্তব্যে অবহেলা বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ না থাকলে এত বড় বৈশ্বিক হ্যাকিং সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না।

তদন্ত কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ

রিজার্ভ চুরির মামলায় ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান। সাত বছরের তদন্তের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘তদন্তের শুরুতে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। বিশেষ করে চুরির ৪১ দিন পর মামলা করা হয়। এ জন্য শুরুতে আমরা প্রকৃত ঘটনাস্থলে (ক্রাইম সিন) প্রবেশ করতে পারিনি। তার আগেই একটি অননুমোদিত বিদেশি আইটি ফার্ম ও দেশি অননুমোদিত ব্যক্তি ঘটনাস্থলে প্রবেশ করেছিলেন। এর পরও আমাদের দল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেশ ও বিদেশ থেকে মামলা প্রমাণের জন্য সব আলামত সংগ্রহ করে এবং আদালতের অনুমতিসাপেক্ষে ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য সিআইডির আইটি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠায়। ২০২৩ সালের ৮ এপ্রিল আমরা ফরেনসিক রিপোর্ট পাই। এমএলএআরের মাধ্যমে ফিলিপাইন থেকে সাড়ে ৪ হাজার পাতা এবং ভারত ও জাপান থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছি। এরপর ফিলিপাইনের আরসিবিসির ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মায়া দেগুইতোর স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করি, যেখানে তিনি অনেক বিদেশি আসামির জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১৬ সালে চুরি হওয়া রিজার্ভের ৩৪.৪ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়, যা এখন পর্যন্ত বিদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে দেশের যেকোনো মামলায় সর্বোচ্চ। এসব তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৬৪ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। কিন্তু ২০২০ সালের ১ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে রিজার্ভ চুরি-সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। সেখানে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্র সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, গভর্নর, বিএফআইইউ প্রধান, সিআইডি প্রধান ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তারা বাংলাদেশের অপরাধীদের নাম বাদ দিয়ে চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ দেন। এতে রাজি না হওয়ায় একপর্যায়ে ওই সভা থেকে আমাকে ও মামলা তদারককারী কর্মকর্তা বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তফা কামালকে বের করে দেওয়া হয়।’

রায়হান উদ্দিন খান বলেন, ‘পরে ২০২২ সালের আগস্টে মোহাম্মদ আলী সিআইডি প্রধান হিসেবে যোগ দেন। তিনি একাধিকবার এই মামলা নিয়ে বসেন। প্রথম থেকেই তার কথা ছিল, বাংলাদেশি কোনো আসামির নামে চার্জশিট দেওয়া যাবে না। এরপর ২০২৩ সালের এপ্রিলে ফরেনসিক রিপোর্ট আসার পর তিনি বলেন, এই রিপোর্ট ইংরেজিতে অনুবাদ করে একটি বিদেশি ল ফার্মকে দিতে হবে। কিন্তু এই রিপোর্ট কাউকে দেওয়া সম্ভব নয় বলে আমি জানাই। ওই বছরের জুলাইয়ে তিনি বাংলাদেশি আসামিদের বাদ দিয়ে চার্জশিট দিতে কয়েকবার চাপ দেন। তখন আমি তাকে বলি, সব অপরাধীর সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। এ অবস্থায় কোনোভাবেই কারও নাম বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। এরপর ৫ আগস্ট আমাকে মামলা থেকে সরিয়ে সিআইডির জয়পুরহাট জেলায় বদলি করা হয়। আগস্টের শেষ সপ্তাহে আমাকে আবারও বদলি করে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটে (এটিইউ) পাঠানো হয়। এরপর মামলার পরবর্তী আইও নিয়ম অনুযায়ী সব নথিপত্র বুঝে নেন। পরে জানতে পারি, ফরেনসিক রিপোর্টটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে বিদেশি ওই ল ফার্মকে সরবরাহ করা হয়েছিল; যা ঠিক হয়নি বলে আমি মনে করি। অবশ্য পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমি এই মামলায় সহায়তাকারী কর্মকর্তা (এসও) হিসেবেও কাজ করেছি।’

ড. আসিফ নজরুলের নেতৃত্বাধীন পর্যালোচনা কমিটির অন্যতম সদস্য এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এ বিষয়ে বলেন, ‘সাত বছরের বেশি সময় ঝুলে থাকা রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত এগিয়ে নিতে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। পরে ওই কমিটির পক্ষ থেকে আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শন করেছি, তাদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং টেকনিক্যাল বিষয়গুলো খতিয়ে দেখেছি। এরপর তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেছি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ আমলে শুরুতে যিনি তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছিল। তাদেরকে চার্জশিট থেকে কিছু নাম বাদ দিতে বলা হয়েছিল। আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, তদন্তে দেশি ১০ জনের নাম এসেছিল; যাদের নাম বাদ দিতে চাপ দেওয়া হয়। তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খান অনেক ভালো কাজ করেছিলেন। পরে তাকে সরিয়ে দিয়ে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। নতুন করে এমন একজনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যিনি মূলত তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য কর্মকর্তার সচেতনতার কারণে সেটি আর সম্ভব হয়নি।’

রিজার্ভ চুরির মামলার সবশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে তিনি এই দায়িত্বে আছেন। তিনি বলেন, ‘এই মামলার তদন্তের ৮০ শতাংশ কাজ প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তাই সম্পন্ন করে গেছেন। পরে দুজন কর্মকর্তা আরও কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সবশেষে আমি চেষ্টা করেছি নির্ভুল একটি চার্জশিট প্রস্তুত করতে। তদন্তে আমাদের আর কোনো কাজ পেন্ডিং নেই। ইতোমধ্যেই শতভাগ তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে খসড়া চার্জশিট প্রস্তুত করে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি আইনি পরামর্শও চাওয়া হয়েছে। পরামর্শ পেলেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুনের আগে মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফরহাদ কবির। ২০২৫ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে তিনি মামলা সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ করেন এবং রিজার্ভ চুরির প্রধান অভিযুক্তকে চিহ্নিত করেন। তদন্তের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে এলেও প্রধান অপরাধীকে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা যাচ্ছিল না। পরে একটি ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এফবিআই উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিন হিয়ক ও তার নেতৃত্বে পরিচালিত লাজারাস গ্রুপকে চিহ্নিত করে। পরবর্তী সময়ে তদন্ত তদারক কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খানের সহযোগিতায় এফবিআইয়ের বিশেষ এজেন্ট নাথান পি শিল্ডের কাছ থেকে রিপোর্টটি সংগ্রহ করে প্রধান আসামিকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করি। এর পাশাপাশি আরসিবিসি ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত করা হয়।’

অভিযুক্তদের তালিকায় যারা 

অভিযুক্তদের তালিকায় ফিলিপাইন, উত্তর কোরিয়া, চীন, শ্রীলঙ্কা, জাপান, ভারত ও বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক কর্মকর্তা ও বৈশ্বিক হ্যাকিং চক্রের সদস্যরা রয়েছেন। সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণ, ফরেনসিক প্রতিবেদন, এফবিআই রিপোর্ট, সুইফট করেসপনডেন্স ও ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় নেওয়া জবানবন্দির সমন্বয়ে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।

তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভের অর্থ ফিলিপাইনে পাচার ও তা ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় চক্রটি সক্রিয় ছিল। ফিলিপাইনের মোট ৩৬ জন ব্যক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এই মামলায় মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

এই তালিকায় আরসিবিসি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মায়া সান্তোস দেগুইতো, রাউল ভিক্টর বি তান, ব্রিজিট আর কাপিনা, নেস্টর ও পিনেদা, রমুয়ালদো এস আগারাদো, অ্যাঞ্জেলা রুথ এস তোরেস ও লরেঞ্জো তানসহ ব্যাংকটির একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন। এর পাশাপাশি কাম সিন ওং, ন্যান্সি জাও কিউগে, ডেনিস সি ব্যাংকড, ইসমাইল আর রেয়েস, সাবিনো এম ইকো, লিজেট জে রাসেলা, রিচার্ড ইনসিগনে, স্যালুড রেয়েস বাউতিস্তা শেবা, মিশেল বাউতিস্তা কনকন, অ্যান্থনি এ পেলেজো, জন ইউ, লুইস ফ্যাব্রেগাস খো, ম্যান পো চি চ্যান, মিং ইয়ে সাইমন সি, রোজালিও পারান্থাদ তান্দুয়ান, এনরিকে কে রায়ন, থমাস আরাসি, জোসে এডুয়ার্ডো জে আলারিল্লা, ক্রিশ্চিয়ান আর গঞ্জালেস, ডোনাতো সি আলমেদা এবং ফ্লিন্ট রিচার্ডসনকে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ফিলিপাইনের ব্যবসায়ী উইলিয়াম সো গো-এর নামও এই তালিকায় ছিল, তবে তদন্ত চলাকালেই তিনি মারা যান।

ফিলিপাইনের এই বিশাল চক্রটির অপরাধ প্রমাণের জন্য ফিলিপাইন ও মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্টের (এমএলএআর) মাধ্যমে পাওয়া অর্থ ফেরতের রেকর্ড, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের তদন্ত রিপোর্ট, সুইফট করেসপনডেন্স এবং প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রকে প্রধান দলিল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটির মূল ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি), ফিলরেম সার্ভিস করপোরেশন, সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং, আব্বা কারেন্সি এক্সচেঞ্জ ইনকরপোরেটেড, বিকন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ এবং জুয়ার আখড়া হিসেবে পরিচিত মিডাস ক্যাসিনো ও সোলায়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোকে প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধী হিসেবে এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই চুরি হওয়া অর্থ আন্তর্জাতিক ক্যাসিনো ও বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে বৈধ করার অপচেষ্টা বা মানি লন্ডারিং করা হয়েছিল।

রিজার্ভ চুরির পেছনে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট বা আন্তর্জাতিক হ্যাকার গ্রুপ জড়িত ছিল, তার প্রমাণ মিলেছে উত্তর কোরিয়া ও চীনের অভিযুক্তদের সংশ্লিষ্টতায়। মামলার নথিতে উত্তর কোরিয়ার কুখ্যাত হ্যাকিং দল ‘লাজারাস গ্রুপ (এপিটি৩৮)’ এবং পার্ক জিন হিয়ককে সরাসরি মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা এফবিআইয়ের বিশেষ তদন্ত রিপোর্টে এই লাজারাস গ্রুপের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ও সুইফট বার্তার অবৈধ ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।

অন্যদিকে চীনের নাগরিক ডিং ঝিজে, গাও শুহুয়া এবং ওয়েইকাং শু-কে এই পাচার প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংগৃহীত সুইফট করেসপনডেন্স ও দালিলিক প্রমাণাদি বলছে, হ্যাকিংয়ের পরপরই এই অর্থ এশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলে স্থানান্তরের পেছনে তাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

তদন্তের আরেকটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে শ্রীলঙ্কা ও জাপান। শ্রীলঙ্কার একটি অলাভজনক সংস্থা ‘শালিকা ফাউন্ডেশন’ এবং এর সঙ্গে যুক্ত হেগোদা গামাগে শালিকা পেরেরা, ইমিজেজ ডন মিজুরিন রানাথুঙ্গে, রামানায়াকা আরাচ্চিগে ডন প্রদীপ রোহিত দামকিন, বুলুগাহা আরামবেগেদারা সঞ্জীবা তিসা বান্দারা, উইরাপ্পুলি মুহান্দিরমগে প্রিয়াঙ্কা জয়দেবা, লুউইস হান্নাদিগে শিরানি ধাম্মিকা ফার্নান্দো এবং নিশান্ত নলকা ওয়ালাকুলুলু আরাচ্চিকে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো অর্থের একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থার সতর্কতার কারণে আটকে যায় এবং তা ফেরত আনা সম্ভব হয়। এই চক্রের বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কা থেকে অর্থ ফেরতের রেকর্ড ও সুইফট নথিপত্র আদালতে উপস্থাপন করা হবে। একইভাবে জাপানের নাগরিক সাসাকিকে এই আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তার অপরাধ প্রমাণের জন্য ফরেনসিক রিপোর্ট, জাপানের পাঠানো লেটার অব রিকোয়েস্ট (এলওআর) এবং সুইফট করেসপনডেন্সকে ভিত্তি ধরা হয়েছে।

ডিজিটাল হ্যাকিং ও সিস্টেমের ভেতরে অনুপ্রবেশের সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগটি এসেছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কয়েকজন নাগরিকের বিরুদ্ধে। ভারতের নীলাভান্নান মাদুক্কুরি আনন্দন, প্রীতম রেড্ডি, সুধিন্দ্র আথ্রেশ এবং রাকেশ আস্থানাÑ এই চারজনকে হ্যাকিংয়ে সহায়তা, মানি লন্ডারিং এবং সরাসরি চুরির (দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারা) অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তের নথিপত্র বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল সিস্টেমে প্রবেশ ও হ্যাকিং প্রক্রিয়া সফল করতে এই ব্যক্তিরা কারিগরি ও কৌশলগত সহায়তা প্রদান করেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ভারতের লেটার অব রিকোয়েস্ট (এলওআর), ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্ট, সুইফট তথ্য ও দালিলিক প্রমাণাদি সংগ্রহ করা হয়েছে, যা মামলার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা