তানভীর হাসান ও নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬ ২৩:৩৮ পিএম
প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার মিরপুর এলাকা এখন কার্যত ‘ফোর স্টার গ্রুপ’-এর নিয়ন্ত্রণে। গ্রিাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঢাকার মিরপুরে এখন প্রতিদিনের চিত্রÑ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ও দখল। অপরাধের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে এই এলাকা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অনেককে গ্রেপ্তার করলেও পরিস্থিতি কোনোভাবেই স্বাভাবিক হচ্ছে না। এক প্রকার আতঙ্ক নিয়েই মিরপুরের বাসিন্দাদের এখন দিন কাটাতে হচ্ছে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৃহত্তর এই এলাকা এখন কার্যত ‘ফোর স্টার গ্রুপ’-এর নিয়ন্ত্রণে। আর মাঠপর্যায়ে তাদের হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৩২টি কিশোর গ্যাং। খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জমি দখল, ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে মাদক কারবারÑ সব মিলিয়ে অপরাধ সাম্রাজ্যের নাটাই মূলত বিদেশে অবস্থান করা চার সন্ত্রাসীর হাতে। তারা হলেনÑ মফিজুর রহমান মামুন, কিলার ইব্রাহিম, শাহাদাত ও সিন্ডিকেট মুক্তার। এদের প্রত্যেকেরই রয়েছে শতাধিক সদস্যের আলাদা সশস্ত্র বাহিনী।
১৪ জোনে ত্রাসের রাজত্ব
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরো মিরপুরকে ১৪টি জোনে ভাগ করে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে এই চার গ্রুপ। ৩২টি কিশোর গ্যাং তাদের অস্ত্র ও জনবলের জোগান দিচ্ছে। রাজনৈতিক পরিচয়, অস্ত্রের মহড়া, মাদকের সিন্ডিকেট আর ভয়ভীতি দেখিয়ে মিরপুরজুড়েই এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। ওই চার সন্ত্রাসী নিজেদের মধ্যে এলাকাও ভাগ করে নিয়েছেন। মামুনের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর ১২, পল্লবী, বাউনিয়া ও সাগুফতা এলাকা। ইব্রাহিমের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর ১৩, ১৪, ভাসানটেক ও কালশী। শাহাদাতের রাজত্ব মিরপুর ১, ২, ৬ ও ৭ নম্বরে। আর মুক্তারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মিরপুর ১০ ও ১১ নম্বর এলাকা। বিদেশে বসে কলকাঠি নাড়লেও দেশে তাদের বিশ্বস্ত সহযোগীরা এই অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন।
আতঙ্ক ছড়াচ্ছে খুনের পরিসংখ্যান
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শুধু মিরপুর-২-এর প্যারিস রোডে সিটি করপোরেশনের একটি পরিত্যক্ত মার্কেট ঘিরেই ঘটেছে ১২টি খুনের ঘটনা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত শুধু মিরপুর জোনেই খুন হয়েছে অন্তত ৪০ জন। এর মধ্যে পল্লবীতে ১৫, মিরপুর মডেল থানায় ৯, দারুস সালামে ৭, কাফরুলে ৩, ভাসানটেকে ২, শাহ আলী এলাকায় ২ ও রূপনগর এলাকায় ২ জন খুন হয়েছে।
চাঁদাবাজি ও দখলের ভয়ালচিত্র
২০২৫ সালের জুলাইয়ে পল্লবীর সাগুফতা এলাকায় ‘এ কে বিল্ডার্স’-এর কাছে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে মামুন বাহিনী। চাঁদা না পেয়ে তারা সেখানে হামলা চালায়, যাদের অধিকাংশই ছিল কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। সবার হাতে ছিল দেশি-বিদেশি অস্ত্র। সিসিটিভি ফুটেজে গোলাপি পাঞ্জাবি পরা এক যুবককে রিভলবার উঁচিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে দেখা যায়। ওই হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শরিফুল ইসলাম নামের এক যুবকের পায়ের হাড় ভেঙে যায়। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে এখন তিনি ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।
এর আগে ভাসানটেকে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে বেলায়েত হোসেন নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে কয়েক দফা হামলা চালিয়েছে কিলার ইব্রাহিম বাহিনী। টিনশেডের বাড়িটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি লুটে নেওয়া হয়েছে মূল্যবান মালামাল। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ফ্রান্সে বসে কিলার ইব্রাহিম ফোনে চাঁদা দাবি করেছিলেন। টানা কয়েক দিন হামলা চললেও সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশ কার্যত নির্বিকার ছিল।
রাজনৈতিক ঢাল ও ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই এখন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। মিরপুরজুড়ে বিএনপি নেতাদের ছবি ব্যবহার করে বড় বড় ব্যানার টাঙানো হয়েছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়াকেই তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।
সম্প্রতি রূপনগরে ঝুট ব্যবসা দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ঝুট ব্যবসায়ী বীথি বেগম সংবাদমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করেছেন, চাঁদা না দেওয়ায় তাকে আটক রেখে ব্যবসা দখল করা হয়েছে। গত ২৫ এপ্রিল রূপনগর ও পল্লবী থানা স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের কয়েকজন নেতা তার প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হুমকি দেন। পরে ৪ মে তার কর্মচারীদের মারধর করে ঝুট বিক্রির ৫২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া নেয়। তিনি বিষয়টি নিয়ে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হকের দ্বারস্থ হন। তার পরামর্শে রূপনগর থানায় লিখিত অভিযোগও দেন। কিন্তু অভিযোগের পর অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা তো প্রতিদিনই কাজ করছি। কোনো সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ কাউকেই আমরা ছাড় দিচ্ছি না। প্রত্যেক অপরাধীর বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপরাধীদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু শীর্ষ নিয়ন্ত্রকদের আইনের আওতায় আনা না গেলে এই জনপদের আতঙ্ক দ্রুতই কাটবে না বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।