মিরপুরে কৃষিকাজ ও মৃৎশিল্পের জায়গাটুকু দখল করে নিয়েছে আকাশচুম্বী দালানকোঠার ধুন্ধুমার রাজত্ব।
উঁচু-নিচু লাল মাটির টিলা, নিচু জলাশয় আর ঘন ঝোপজঙ্গলে ঘেরা এক নৈসর্গিক জনপদ ছিল মিরপুর। তুরাগ নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা সেই প্রান্তিক জনপদ এখন আর আগের মতো নেই। কৃষিকাজ ও মৃৎশিল্পের জায়গাটুকু দখল করে নিয়েছে আকাশচুম্বী দালানকোঠার ধুন্ধুমার রাজত্ব।
নগরায়ণের এই দাপটে ভূপ্রাকৃতিক ইতিহাসের পাতায় আশ্রয় নিয়েছে লাল মাটির টিলা। হারিয়ে গেছে পর্যাপ্ত খেলার জায়গা, জলাশয় ও উন্মুক্ত প্রান্তর। আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম বা ইনডোর স্টেডিয়াম গড়ে উঠলেও এই বিশাল জনপদে সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য তৈরি হয়নি কোনো স্থায়ী কেন্দ্র। ফলে বদলে গেছে মিরপুরের আবহমান সংস্কৃতি। কিছু বাণিজ্যভিত্তিক পাঠাগার ও ক্যাফে-কেন্দ্রিক সাহিত্য আড্ডার জায়গা গড়ে উঠলেও সার্বিকভাবে এখানকার সংস্কৃতিচর্চা ভয়াবহভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকা হিসেবে মিরপুর নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র ছিল। নাটক, সংগীত, সাহিত্যচর্চা, আবৃত্তি, চিত্রকলা ও পথনাটকের মতো আয়োজন একসময় নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলন এখন দৃশ্যমানভাবেই স্তিমিত। এর পেছনে শুধু নগরায়ণ নয়, প্রযুক্তির প্রভাব, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও মানুষের সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও সমভাবে দায়ী।
মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরামের প্রথম নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ও সাত্ত্বিক নাট্যসম্প্রদায়ের সভাপতি, নাট্যকার ও নির্দেশক সগীর মোস্তফা বলছিলেন সেই সোনালি দিনের কথা। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘একসময় মিরপুরে মুকুল ফৌজ, চাঁদের হাট, ফুলকুঁড়ির আসর, সবুজ মেলা, খেলাঘর, কচিকাঁচার আসরসহ জাতীয় পর্যায়ের প্রায় সব শিশু সংগঠনের শাখা ছিল। এখন মুকুল ফৌজ ছাড়া বাকিগুলোর কার্যক্রম নেই বললেই চলে। নব্বইয়ের দশকে এখানকার তরুণদের হাত ধরে সংস্কৃতিচর্চার যে জোয়ার এসেছিল, তাতে অনেক নাটকের ও গানের দল গড়ে উঠেছিল। সেগুলোও এখন প্রায় ধ্বংসের পথে।’
এর কারণ হিসেবে সগীর মোস্তফা বলেন, শুধু নগরায়ণ বা পৃষ্ঠপোষকতার অভাব নয়, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক বিনোদন হাতের মুঠোয় চলে আসাও একটি বড় কারণ। আগে বিকালে খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক সংগঠনে সময় দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। এখন ঘরে বসেই মানুষ সিনেমা, নাটক বা গান উপভোগ করছে। তবে সবচেয়ে বড় সংকট হলো মিরপুরে সংস্কৃতিচর্চা বা পরিবেশনের কোনো সুনির্দিষ্ট জায়গা না থাকা। একসময় এখানে একটি ‘টাউন হল’ ছিল, যেখানে নিয়মিত নাটক মঞ্চায়ন ও অনুষ্ঠান হতো। ২০০১ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণার পর তা ভেঙে ফেলা হয়। বহু আন্দোলন করেও মিরপুরের সংস্কৃতিচর্চার একমাত্র সেই স্থানটি বাঁচানো যায়নি।
মিরপুরের নাট্যকর্মী মনজুর আলম সিদ্দিকীর মতে, নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় মিরপুর রাজধানী ঢাকার অন্যতম সংস্কৃতিচর্চার প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বর্তমানে টিকে থাকা হাতে গোনা কয়েকটি সংগঠনের অবস্থাও নিভু নিভু প্রদীপের মতো। এই নাট্যকর্মী সংস্কৃতিচর্চা সংকুচিত হওয়ার কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেন। যেমনÑ দ্রুত নগরায়ণ ও বাণিজ্যিকীকরণের ফলে নাটক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের খোলা মাঠ ও স্থানগুলো হারিয়ে গেছে। মোবাইল ফোন ও সামাজিক মাধ্যমের সহজলভ্যতা মানুষকে ঘরে বন্দি করে ফেলেছে, ফলে সরাসরি সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ কমেছে। পড়াশোনা, কোচিং ও ক্যারিয়ারের চাপে তরুণরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। পরিবারগুলোও এখন কেবল একাডেমিক সাফল্যকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। মহড়া কক্ষের অভাব, নিয়মিত চর্চার জায়গার সংকট এবং আর্থিক দুর্বলতার কারণে অনেক সংগঠন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এবং নিরাপত্তা ও অনুমতির নানা জটিলতার কারণে আগের মতো উন্মুক্ত মঞ্চ বা পথনাটকের আয়োজন এখন আর সহজ নয়।
অবশ্য কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেন ২০১৫ সাল থেকে রূপনগরে বসবাস করা কবি ও লেখক আরিফ রহমান। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বিগত এক দশকে মিরপুরের বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখেছি। কিছু ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক চর্চা সংকুচিত হলেও কিছু ক্ষেত্রে তা বেড়েছে। ১০ বছর আগে সাহিত্য নিয়ে আড্ডা দেওয়ার মতো কোনো কফিশপ বা ক্যাফে ছিল না। এখন ঋদ্ধ ক্যাফে, রিডিং ক্যাফে, আলোর ভুবন ও সৃষ্টি পাঠাগারসহ মিরপুরজুড়ে বেশ কিছু সাহিত্য আড্ডার জায়গা গড়ে উঠেছে। সেখানে নিয়মিত গান, কবিতা ও সাহিত্যের আসর বসছে। তবে আমরা সবচেয়ে বেশি অভাব বোধ করছি উন্মুক্ত খেলার মাঠের। ঈদগাহ মাঠে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারকাজ চলায় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে।’
মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরামের প্রথম নির্বাচিত সভাপতি ও বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের বর্তমান সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, ‘একটি জাতিরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সংস্কৃতি। স্বাধীনতার পর থেকে যারা নিজেদের গাঁটের পয়সা খরচ করে সংস্কৃতিচর্চা বেগবান রেখেছিলেন, রাষ্ট্র তাদের বা সংগঠনগুলোর জন্য সেভাবে কিছুই করেনি। বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় সংস্কৃতির জন্য সেই উদ্যমী মানুষগুলো আর আগের মতো ত্যাগ স্বীকার করতে পারছে না। নতুন প্রজন্মও সেভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছে না।’
এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মনে করেন, এই অবস্থা থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতন উদ্যোগ, তরুণদের সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোর পুনর্জাগরণের মাধ্যমেই কেবল এই সাংস্কৃতিক চর্চাকে আবারও প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনোভাবেই একটি এলাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব নয়।