× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এক জনপদের জেগে ওঠা

আসাদুজ্জামান সম্রাট

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬ ২৩:১১ পিএম

তুরাগের অববাহিকায় গড়ে ওঠা  বিচ্ছিন্ন  জনপদ মিরপুর কালের পরিক্রমায় ঢাকার অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

তুরাগের অববাহিকায় গড়ে ওঠা বিচ্ছিন্ন জনপদ মিরপুর কালের পরিক্রমায় ঢাকার অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

নগরের প্রাণভোমরা লুকিয়ে থাকে তার বিবর্তনের গল্পে। ঢাকার মানচিত্রে উত্তর-পশ্চিম কোণে যে মিরপুর আজ স্পন্দিত এক মহানগর, কয়েক দশক আগেও তার চেহারা মোটেও এমন ছিল না। উঁচু-নিচু লাল মাটির টিলা, গহিন জঙ্গল আর নিচু জলাভূমিÑ সব মিলিয়ে ছিল এক ভুতুড়ে, অবহেলিত প্রান্তর। তুরাগের অববাহিকায় গড়ে ওঠা সেই বিচ্ছিন্ন  জনপদই কালের পরিক্রমায় ঢাকার অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই রূপান্তর কেবল ভৌগোলিক নয়; এটি মূলত একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের এক অনন্য মহাকাব্য।

মূল শহর থেকে দূরত্ব আর যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে একসময় মিরপুরে মানুষের স্থায়ী বসবাস ছিল সামান্যই। তুরাগের তীরঘেঁষা কিছু অংশে কৃষিকাজ আর কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পীদেরই কেবল দেখা মিলত। বিচ্ছিন্নতার সুযোগে এটি অনেক সময় হয়ে উঠত অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

মিরপুরের এই রূপান্তর হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো জাদুকরী ঘটনা নয়। এর শিকড় ছড়িয়ে আছে কয়েকশ বছরের ইতিহাসের গভীরে। ১৫ শতকে বাগদাদ থেকে প্রখ্যাত সুফি সাধক হজরত শাহ আলী বাগদাদী (রা.) যখন এই অঞ্চলে আসেন, চারপাশটা ছিল নিবিড় অরণ্যে ঘেরা। মানবসেবা ও ধর্মপ্রচারের ব্রত নিয়ে তিনি এখানেই আস্তানা গাড়েন। ১৪৮০ সালে তার মৃত্যুর পর সেখানে মাজার শরিফ গড়ে ওঠে। মূলত এই মাজারকে ঘিরেই মিরপুরে প্রথম জনবসতির গোড়াপত্তন হয়।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ঢাকা সমগ্র-১ বইয়ে বলেছেন, ১৬১০ সালে ঢাকা প্রতিষ্ঠার সময় থেকে মিরপুরের উত্থান ঘটে। শুরুতে মিরপুর তুরাগ নদীর পাশে অবস্থিত একটি শান্ত গ্রাম ছিল। মূলত ঢাকায় প্রবেশের জন্য নৌকার টোলঘাট হিসেবে ব্যবহৃত হতো মিরপুর। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ব্যবসার কাজে ডিঙি বা নৌকায় যাতায়াত করে মিরপুরের খেয়াঘাটে এসে নামতেন।

১৬১০ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান ঢাকাকে সুবাহ বাংলার রাজধানী ঘোষণা করেন। তখন প্রতিরক্ষার কৌশল হিসেবে চারপাশের নদীপথগুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। তুরাগের তীরবর্তী হওয়ায় মিরপুর দ্রুতই মোগলদের নজরে আসে। সে সময় ‘মীর’ উপাধিধারী বেশ কয়েকজন মোগল কর্মকর্তা ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এখানে বসতি গড়েন। ফারসি শব্দ ‘মীর’ (প্রধান বা নেতা) আর ‘পুর’ (নগর বা গ্রাম)Ñ এই দুইয়ের সন্ধিতেই জন্ম নেয় আজকের ‘মিরপুর’।

ব্রিটিশ আমল পেরিয়ে পাকিস্তান আমলেও মিরপুর ছিল মূলত প্রত্যন্ত কৃষি অঞ্চল। তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। ভারত থেকে আসা লাখ লাখ মুসলিম শরণার্থী, বিশেষ করে বিহার, উত্তর প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা উর্দুভাষী মুসলিমরা (যারা ‘বিহারি’ নামে পরিচিত) তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নেন। ১৯৫৭ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) এই অবাঙালিদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে মিরপুরের জঙ্গল ও টিলা কেটে প্লট তৈরি করে। একে একে গড়ে ওঠে মিরপুর ১ থেকে শুরু করে ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর সেকশন। রাতারাতি মিরপুর পরিণত হয় উর্দুভাষী অধ্যুষিত এক বিশাল উপশহরে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মিরপুর এক রক্তাক্ত ও শোকাবহ অধ্যায়ের নাম। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকেই মিরপুরের উগ্রপন্থী বিহারিরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মেলায়। শুরু হয় নিরীহ বাঙালিদের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও লুণ্ঠন। জল্লাদখানা, শিয়ালবাড়ী ও মুসলিম বাজারÑ পুরো মিরপুর যেন পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরীতে। হাজার হাজার বাঙালিকে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হয় কুয়া ও ডোবায়।

১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। গোটা দেশ যখন স্বাধীনতার উচ্ছ্বাসে ভাসছে, মিরপুর তখনও অবরুদ্ধ। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনা, আলবদর, রাজাকার ও বিহারি মিলিশিয়ারা মিরপুরকে নিজেদের দখলে রেখেছিল। এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.) বীরবিক্রমের লেখা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে। এতে লেখা হয়, ১৯৭২ সালে মিরপুর মুক্ত করতে গিয়ে লেফটেন্যান্ট সেলিম সামরিক বাহিনীর ৪১ সদস্য, শতাধিক পুলিশ ও মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেন। ওই দিনই নিখোঁজ বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে মিরপুরে গিয়ে নিখোঁজ হন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, যার সন্ধান আর কখনোই মেলেনি।

অবশেষে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর ৩১ জানুয়ারি মিরপুর পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয়। স্বাধীন বাংলার আকাশে ওড়ে লাল-সবুজ পতাকা। দীর্ঘ লড়াই আর অপেক্ষার পর পাওয়া এই বিজয়ের কারণেই মিরপুরকে বলা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের ‘শেষ রণাঙ্গন’।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা