রাজু আহমেদ, রাজশাহী, মেহেদী হাসান শিয়াম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, এম আর ইসলাম রতন, নওগাঁ ও প্লাবন শুভ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
দেশের ‘আমের রাজধানী’খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিল্কসিটি রাজশাহী ও উত্তরের আরেক জেলা দিনাজপুরের আম ঘিরে এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার মহোৎসব চলছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোর আমের বাজারগুলোতে। শঙ্কা কাটিয়ে পুরোপুরি জমে উঠেছে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক।
দেশের ‘আমের রাজধানী’খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিল্কসিটি রাজশাহী ও উত্তরের আরেক জেলা দিনাজপুরের আম ঘিরে এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার মহোৎসব চলছে।
বাগানমালিক, চাষি, আড়তদার থেকে শুরু করে পরিবহনশ্রমিকÑ কারোরই যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। প্রশাসনের নজরদারিতে নিরাপদ আম পেয়ে খুশি ভোক্তারাও।
ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। তবে এত বিপুল আয়োজনের পরও একটি আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে আমের কাঙ্ক্ষিত মূল্যবৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে আক্ষেপ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ
মৌসুমের শুরুতেই জমজমাট বেচাকেনা দেখে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম-সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এবার শুধু আমের মূল বাণিজ্যই ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। আনুষঙ্গিক খাত মিলিয়ে এই জেলায় ৫-৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হতে যাচ্ছে। গত দুই দশকে এই জেলায় আমবাগানের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে বর্তমানে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। জেলার প্রায় ৮২ লাখ গাছ থেকে গুটি, গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, আম্রপালি, বোম্বাই, কাঁচামিঠাসহ হরেক জাতের আম উৎপাদন হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় আমের মোকাম ঐতিহ্যবাহী কানসাট ছাড়াও সদরঘাট, রহনপুর ও ভোলাহাটের বাজারগুলোতে দিনরাত চলছে কোটি কোটি টাকার কেনাবেচা। বাজারে গুটি জাতের আম ৬০০-৮০০ টাকা, গোপালভোগ ১৬০০-২২০০ টাকা ও ক্ষীরশাপাতি ২০০০-২৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার পুরনো বাজারের আড়তদার সুকুমার জানান, আমের বাজার প্রতিদিনই ওঠানামা করে। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা আসতে শুরু করায় বাজার এখন পুরোপুরি জমে উঠেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াসিন আলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত বছর জেলায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হয়েছিল। এবার উৎপাদন বেশি এবং বাজারে দামও ভালো থাকায় সামগ্রিক বেচাকেনা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি হবে। মাঠের পরিস্থিতি দেখে আশা করা হচ্ছে, এবার উৎপাদন সাড়ে চার লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে।’
তবে এই বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও একটি বড় আক্ষেপ রয়ে গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, ‘বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জেই উৎপাদিত হয়। পৃথিবীতে আম একটি বড় শিল্পপণ্য হলেও আমরা এখনও একে পুরোপুরি শিল্প হিসেবে নিতে পারিনি। এখানে যদি আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা যায়, তবে আমের বর্তমান বাজারমূল্য এক ধাক্কায় অন্তত তিনগুণ বেড়ে যাবে এবং জেলায় বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।’
রাজশাহীর বাজারে ম্যাংগো ক্যালেন্ডারে স্বস্তি
রাজশাহীর আমের সুখ্যাতি দেশজুড়ে। এখানকার প্রশাসন প্রতিবছর ‘ম্যাংগো ক্যালেন্ডার’ বা আম পাড়ার সময়সূচি প্রকাশ করায় ভোক্তারা ভেজালমুক্ত ও পরিপক্ব আম পাচ্ছেন। পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর হাটে বর্তমানে গোপালভোগ ও লক্ষণভোগ ১ হাজার ২০০ টাকা, ক্ষীরশাপাতি ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা, ল্যাংড়া ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং আম্রপালি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানান, রাজশাহীর অর্থকরী ফসল আমের সুনাম যেন ক্ষুণ্ন না হয় এবং ভোক্তারা যেন রাসায়নিকমুক্ত নিরাপদ আম পান, সেজন্যই প্রতিবছর ম্যাংগো ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা হয়। রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত বছর সারা দেশ থেকে ২ হাজার ১৯৪ মেট্রিক টন আম রপ্তানি হয়েছে, যার মধ্যে রাজশাহী থেকে গেছে মাত্র ১৩ টন। এবার রপ্তানি বাড়াতে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। এই অঞ্চলে ম্যাংগো প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন জরুরি। এটি করা গেলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনি আমচাষি ও ব্যবসায়ীরাও দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবেন।’
একই সুরে কথা বলেন রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘শুধু কাঁচা ফল হিসেবে বিক্রি না করে এটি প্রক্রিয়াজাত করে মোরব্বা, আমসত্ত্ব, আচার, জুস বা কোফতার মতো খাদ্যসামগ্রী তৈরি করা গেলে উৎপাদনকারীরা আরও বেশি লাভবান হবেন। এতে বিপুল কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।’
নওগাঁয় বাম্পার ফলন, তবে ‘ঢলন’ ও সিন্ডিকেটের থাবা
উৎপাদনের দিক থেকে গত কয়েক বছর ধরে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে উত্তরের জেলা নওগাঁ। বরেন্দ্রভূমির সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও পত্নীতলায় এবার প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বাম্পার ফলনের পরও জেলার কৃষকদের মুখে হাসি নেই।
সাপাহার উপজেলার জিরো পয়েন্ট মোকামে গিয়ে দেখা যায়, প্রতি মণ আম্রপালি বিক্রি হচ্ছে ২,২০০ থেকে ৩,২০০ টাকায়, যা গত বছর ছিল ৪ হাজার টাকার ওপরে। এর প্রধান কারণ হিসেবে চাষিরা দুষছেন ‘ঢলন’প্রথাকে। আমচাষি নজরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “৫ মণ আম এনে দাম পেলাম চার মণের। প্রতি মণে ১০ কেজি করে ঢলন (ফ্রি বা অতিরিক্ত) দিতে বাধ্য করেছেন ব্যবসায়ীরা। ৪ হাজার টাকা মণের আম মাত্র ২ হাজার ৪০০ টাকায় বেচতে হলো।” আরেক চাষি রেদওয়ানুর রহমান বলেন, “বাজারে সরবরাহ বাড়লেই ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেন। হিমাগার না থাকায় পচনশীল এই ফল আমরা ধরেও রাখতে পারি না।”
ব্যক্তিগত উদ্যোগে নওগাঁ থেকে আম বিদেশে রপ্তানি হলেও এবার তা বাধার মুখে পড়েছে। সাপাহার উপজেলার ‘বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্ক’-এর স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা জানান, ভারত ও পাকিস্তান থেকে এক কেজি আম ইউরোপে পাঠাতে উড়োজাহাজ ভাড়া লাগে ২০০ টাকা, আর আমাদের লাগে ৪০০ টাকা। এর পাশাপাশি ফ্রুট ব্যাগের দাম ৩ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বেড়ে ৬ টাকা ২০ পয়সা হওয়ায় এবার অনেক চাষি আমে ব্যাগ পরাতে পারেননি।
সার্বিক বিষয়ে নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল বলেন, “জেলায় এবার আমের চমৎকার ফলন হয়েছে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ভারী শিল্প ও হিমাগার স্থাপনের বিষয়ে আমরা বিভিন্ন সমন্বয় সভায় প্রস্তাব তুলে ধরছি। রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের আওতায় সাপাহার অঞ্চলে কুলিং হাউস ও প্যাকিং হাউস নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।”
রপ্তানির দিগন্ত ও আগামী দিনের প্রত্যাশা
বাণিজ্যের এই চাঙ্গা ভাব এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাজারেও ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি মৌসুমেও বিদেশে আম পাঠানো শুরু হয়েছে। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চাষি ও রপ্তানিকারক শামীম রেজা সোহাগ দুই টন আম ইতালিতে রপ্তানি করেছেন।
সার্বিক চিত্র পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, উত্তরের আম অর্থনীতি এখন এক শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের নিরলস পরিশ্রম আর কৃষি বিভাগের তদারকিতে উৎপাদন বাড়ছে। এখন শুধু প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বড় পরিসরে ‘ম্যাংগো প্রসেসিং জোন’ বা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ও কার্গো বিমানের সুবিধা সহজলভ্য করা গেলে বাংলাদেশের আম বিশ্ববাজারে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছবে এবং কৃষি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।