× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাস্তবায়নের কঠিন পরীক্ষায় বাজেট

আহমেদ তোফায়েল

প্রকাশ : ১৩ ঘণ্টা আগে

বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত লক্ষ্য কতটা বাস্তবে রূপ পায়, তার ওপর। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত লক্ষ্য কতটা বাস্তবে রূপ পায়, তার ওপর। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

অর্থনীতির জন্য এক কঠিন সময়ে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সামনে এনেছে সরকার। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা এবং ব্যবসা সহজীকরণÑ এসব লক্ষ্য সামনে রেখে বাজেটের কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। কাগজে-কলমে এটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা বলে মনে হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও রাজস্ব আহরণ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ফলে বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত লক্ষ্য কতটা বাস্তবে রূপ পায়, তার ওপর।

বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো করনীতিতে স্থিতিশীলতার বার্তা। আগামী পাঁচ বছর করহার অপরিবর্তিত রাখার উদ্যোগটি ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা প্রত্যাশা করেন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এ পদক্ষেপ বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। 

একই সঙ্গে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সেবাগুলোকে একক কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। নতুন এই উদ্যোগ সেই বাধা কিছুটা হলেও কমাতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

ব্যাংকঋণের বিকল্প হিসেবে করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড এবং সুকুকের মতো অর্থায়ন ব্যবস্থাকে উৎসাহ দেওয়ার পরিকল্পনাও বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। বাংলাদেশের বিনিয়োগ কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকনির্ভর হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়েছে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিতে দেখা গেছে। তাই পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়ন সম্প্রসারণকে অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি বাজেটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তাগুলোর একটি। এ খাতে ব্যয় প্রায় ১৪ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যথাক্রমে জিডিপির ২ শতাংশ এবং ১ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এসব ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে ঘোষিত অগ্রাধিকার এবং বাস্তবায়িত অগ্রাধিকারের মধ্যে প্রায়ই বড় ব্যবধান দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কেবল সাময়িক বিচ্যুতি নয়; বরং দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা। অতীতে বারবার দেখা গেছে, রাজস্ব ঘাটতি সৃষ্টি হলে শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় সংকুচিত করা হয়। ফলে প্রস্তাবিত সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি বরাদ্দের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতার ওপর।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, বাজেটে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের জন্য কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা রয়েছে। তবে, অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে নিয়ে যাওয়ার মতো কৌশলগত গভীরতা বাজেটে অনুপস্থিত। তার পর্যবেক্ষণে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও সেবার মান কীভাবে উন্নত হবে— সে বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।

তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৬৬ শতাংশই পরিচালন ব্যয়ে বরাদ্দ করা হয়েছে। এ                                              তে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা না থাকায় বাস্তব ফল পাওয়া কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। বাজেটে কিছু সংস্কার উদ্যোগের উল্লেখ থাকলেও ব্যাংকিং খাতে চলমান অস্থিরতা সেই উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত। 

ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ— জ্বালানি সংকট— বাজেটে প্রায় অনুপস্থিত। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বারবার বলে আসছে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। কিন্তু গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা ঝুলে থাকা আবেদনগুলোর নিষ্পত্তির বিষয়ে বাজেটে কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। ফলে বিনিয়োগ আকর্ষণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কিছু ইতিবাচক সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ও কর ছাড়ের প্রস্তাবকে এ খাতের জন্য সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের খরচ কমে আসতে পারে এবং শিল্প ও গ্রামীণ পর্যায়ে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রাজস্ব আহরণই এখন বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং মোট রাজস্ব আয় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে প্রকৃত রাজস্ব আদায় এর চেয়ে অনেক কম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নতুন লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।

যদিও করজাল সম্প্রসারণে কিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ব্যবসার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা এবং ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় টিআইএন-এর প্রয়োজনীয়তা বাড়ানোর মাধ্যমে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পেতে সময় লাগবে। সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বাজেট উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ও কিছু ইতিবাচক উদ্যোগে সমৃদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাজেটের সাফল্য কেবল ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে রাজস্ব আহরণ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা