নুর মোহাম্মদ মিঠু ও সৌরভ হোসেন
প্রকাশ : ৫৭ মিনিট আগে
আপডেট : ৫২ মিনিট আগে
বাংলাদেশে এর আগে শতাধিক নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হলেও কোনো নারী আসামির ফাঁসিই কার্যকর হয়নি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি সোহেল রানার পাশাপাশি তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায়ের পর দেশজুড়ে দ্রুততম সময়ে এ দণ্ড কার্যকরের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। তবে এ রায় ঘোষণার পর পরই আরেকটি বিস্ময়কর বাস্তবতা সামনে এসেছে; বাংলাদেশে এর আগে শতাধিক নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হলেও কোনো নারী আসামির ফাঁসিই কার্যকর হয়নি।
সরকারি হিসাব জানাচ্ছে, স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দেশের বিভিন্ন আদালত শতাধিক নারীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। বর্তমানে বিভিন্ন কারাগারেও রয়েছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৯২ জন নারী। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪৪৫ জন পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও কোনো নারীর ফাঁসি হয়নি। দেশের একমাত্র মহিলা কারাগার গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে ৫৪ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দি থাকলেও সেখানে নেই কোনো ফাঁসির মঞ্চ।
রামিসা হত্যা মামলায় স্বপ্না আক্তারের ফাঁসির আদেশ হয়েছে নিম্ন আদালতে। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলেই কেবল নিশ্চিত হওয়া যাবে তার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে। তবে এই রায়কে কেন্দ্র করে প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দিদের সংখ্যা, তাদের কারাজীবন, ফাঁসি কার্যকর না হওয়ার কারণ ইত্যাদি বিষয়।
৯২ নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, পুরুষ ২ হাজার ৬১৫ : কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে মোট ফাঁসির আসামি ২ হাজার ৭০৭ জন। এর মধ্যে নারী ৯২ জন এবং পুরুষ ২ হাজার ৬১৫ জন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঢাকা বিভাগে ১ হাজার ৭০০, ময়মনসিংহে ৪০০, চট্টগ্রামে ২৫০, খুলনায় ২০০, সিলেটে ১৫০, রংপুরে ১৫০, রাজশাহীতে ১৩০ এবং বরিশালে ৪০ জন ফাঁসির আসামি রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৪৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তবে আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি।’
স্বপ্নার সামনে এখন কোন পথ : আইন অনুযায়ী, নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার আগে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স শুনানি বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি আসামির আপিল, রিভিউ এবং রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বপ্না আক্তারের ক্ষেত্রেও একই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। ফলে রায় ঘোষণার পরপরই দণ্ড কার্যকরের সুযোগ নেই। বরং মামলাটি এখন উচ্চ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করবে, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দীর্ঘ হয়ে থাকে। কারা কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতের উদাহরণ অনুযায়ী নারী আসামিদের ক্ষেত্রে আপিল পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ড কমে যাবজ্জীবন হওয়ার ঘটনা কম নয়।
মিন্নি থেকে ঐশীÑ মৃত্যুদণ্ড আছে, ফাঁসি নেই : বাংলাদেশের আলোচিত বহু মামলায় নারী আসামিরা মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারও ফাঁসি কার্যকর হয়নি। যেমন, রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় ২০২০ সালে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে মিন্নি কাশিমপুর মহিলা কারাগারে বন্দি।
এ ছাড়া নুসরাত জাহান হত্যা মামলার কামরুন্নাহার মণি ও উম্মে সুলতানা পপি, ইডেন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী হত্যা মামলার দণ্ডিত রীতা আক্তার ও রুমা, মা-বাবা হত্যা মামলার দণ্ডিত ঐশী রহমানসহ আরও অনেক নারী বিভিন্ন কারাগারে রয়েছেন। তাদের কেউ ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায়, কেউ আপিল করেছেন, আবার কারও মামলা এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
নারী ফাঁসির মঞ্চ নেই কারাগারে : ২০০৭ সালে চালু হওয়া কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দি রয়েছেন ৫৪ জন। তবে কারাগারটিতে কোনো ফাঁসির মঞ্চ নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, বাংলাদেশে এখনও কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি। তাই মহিলা কারাগারে ফাঁসির মঞ্চও নেই। তারা বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দিদের জন্য আলাদা ভবন রয়েছে। সেখানে তাদের সাধারণ বন্দিদের থেকে পৃথকভাবে রাখা হয়।
কনডেম সেলে নারীবন্দিদের জীবন : কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, ‘কনডেম সেল বলতে আলাদা কোনো স্থাপনা নেই। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে যেখানেই রাখা হয়, সেটাই তার জন্য কনডেম সেল।’ কারা কর্মকর্তারা জানান, ‘নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সাধারণত আলাদা কক্ষে রাখা হয়। অবসর সময়ে তারা বই পড়েন, ধর্মচর্চা করেন এবং নির্ধারিত নিয়মে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।’
নারী আসামির ফাঁসি কার্যকর হয় না কেন : এ ক্ষেত্রে আইনজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কয়েকটি কারণ সামনে এনেছেন। এর মধ্যে একটি হলো, উচ্চ আদালতে অনেক ক্ষেত্রেই নারী আসামির মৃত্যুদণ্ড কমে যাবজ্জীবন হয়ে যায়। এ ছাড়াও রয়েছে দীর্ঘ আপিল ও রিভিউ প্রক্রিয়া, মানবিক ও সামাজিক বিবেচনা, বিচারিক ধীরগতি ইত্যাদি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপ ও গর্ভবতী নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে আইনি বাধাও এর বড় কারণ। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮২ ধারা অনুযায়ী, গর্ভবতী নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায় না। অন্যদিকে ৪৯৭ ধারায় নারী আসামিদের জামিনের ক্ষেত্রেও বিশেষ বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
ভারতেও নেই নারীর ফাঁসির নজির : প্রতিবেশী ভারতেও স্বাধীনতার পর কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি। ২০০৮ সালে পরিবারের সাত সদস্যকে হত্যার দায়ে উত্তরপ্রদেশের আমরোহা জেলার বাসিন্দা, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শবনমের ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও আইনি জটিলতার কারণে এখনও তার বাস্তবায়ন হয়নি।
নতুন ইতিহাস, নাকি পুরনো ধারার পুনরাবৃত্তি : রামিসা হত্যা মামলার রায়ের পর এখন একটি বড় প্রশ্ন, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো নারী আসামির ফাঁসি কার্যকরের নজির কি তৈরি হবে? আইনজ্ঞরা বলছেন, সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে এখনও অনেক পথ পেরুতে হবে। কারণ নিম্ন আদালতের রায় থেকে ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছাতে রয়েছে ডেথ রেফারেন্স, আপিল, রিভিউ এবং প্রাণভিক্ষার মতো একাধিক আইনি ধাপ।