অরিত্র কুণ্ডু, ঝিনাইদহ
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
ঝিনাইদহে শহরাঞ্চল পেরিয়ে এখন গ্রাম পর্যায়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক। গ্রাফিক্স: সংগৃহীত
ঝিনাইদহে শহরাঞ্চল পেরিয়ে এখন গ্রাম পর্যায়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক।
এতে তরুণ ও যুবসমাজ বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে, পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এর কারণ হিসেবে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে দায়ী করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও গ্রামে প্রচলিত জুয়ার ঘটনা সীমিত থাকলেও বর্তমানে অনলাইন বেটিং, ক্যাসিনো গেমসহ বিভিন্ন ডিজিটাল জুয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে ঝিনাইদহ সদর, শৈলকুপা ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে চায়ের দোকান, মোবাইল রিচার্জ পয়েন্ট ও বিকাশ এজেন্টের আশপাশে মোবাইল ফোনে এসব জুয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, ফেসবুক গ্রুপ, টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই তরুণরা এসব প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছে।
শুরুতে অল্প টাকার খেলার মাধ্যমে আকর্ষণ তৈরি হলেও ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের অর্থ হারানোর প্রবণতা বাড়ছে। এতে অনেকেই সঞ্চয় হারানোর পাশাপাশি গরু-ছাগল বা জমিজমা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও জানান তারা।
সম্প্রতি শৈলকুপা উপজেলায় অনলাইন জুয়ার টাকা জোগাড় করতে নিজ বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, এক যুবক ১০ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যা অনলাইন জুয়ার কারণে ঘটেছে বলে দাবি পুলিশের।
প্রতিবেদক তার নিজস্ব সূত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছে, ঝিনাইদহসহ আশপাশের জেলাগুলোতে অনলাইন জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের শুভঙ্কর কুমার ও হাফিজুল ইসলাম হ্যাপি। তারা মূলত ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু, শৈলকুপা, কোটচাঁদপুর ও চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অনলাইন জুয়া জুয়া সাইটের প্রতিনিধিত্ব করে।
প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, জুয়া খেলে একজন যত বেশি অর্থ হারায়, তার নির্দিষ্ট একটি শতাংশ সরাসরি ওই এজেন্টের অ্যাকাউন্টে জমা হয়। ফলে দিন দিন অনলাইন জুয়াড়ির সংখ্যা বাড়ছে এবং তারাই এই জুয়ার নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে গ্রামে গ্রামে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে শুভঙ্কর কুমার ও হাফিজুল ইসলাম হ্যাপির ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিক বার কল করলেও তারা রিসিভ করেননি। এমনকি তাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েও পাওয়া যায়নি।
কেউ হারিয়েছেন সর্বস্য, কেউবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন
স্থানীয় ব্যবসায়ী পারভেজ ইসলাম জানান, অনলাইন জুয়ার কারণে তিনি তার ব্যবসা ও সম্পদ হারিয়েছেন।
অন্যদিকে ইলেকট্রিশিয়ান ফাহিম হোসেন বলেন, নিয়মিত আয় থাকা সত্ত্বেও তিনি এখন ঋণের ভারে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং আসক্তি থেকে বের হতে পারছেন না।
‘জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের’ প্রতিনিধি আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, অনলাইন জুয়া শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, মানসিক চাপ ও অপরাধ প্রবণতাও বাড়াচ্ছে। ফলে চুরি, ছিনতাই ও প্রতারণার ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন জানান, অনলাইন জুয়ার অধিকাংশ প্ল্যাটফর্ম বিদেশি হওয়ায় এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তবে স্থানীয় এজেন্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।