চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একশ্রেণির সুযোগসন্ধানীর হাত ধরে শুরু হয়েছে নির্মম ও অনৈতিক ‘মামলা বাণিজ্য।’ গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার দাবিতে একটি সম্মিলিত আন্দোলন। বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাবে জর্জরিত দীর্ঘ ১৬ বছরের নিপীড়নের অবসান ঘটাতে এবং ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন তরুণরা।
কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একশ্রেণির সুযোগসন্ধানীর হাত ধরে শুরু হয়েছে নির্মম ও অনৈতিক ‘মামলা বাণিজ্য।’ সারা দেশে এ ধরনের হাজারো মামলায় নিরীহ মানুষকে ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। অপরাধী চক্র সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে। এজাহার থেকে নাম কাটার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, শীর্ষ শিল্পপতি, আইনজীবীÑ এমনকি খোদ পুলিশ সদস্যরাও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মামলা বাণিজ্যের কারণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য আজ ভেস্তে যেতে বসেছে।
ইব্রাহীম হ্ত্যার ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়। মামলা নম্বর ৪৭/৭/২৫। কিন্তু ইব্রাহীমের বাবা হানিফ মিয়া জানান, তিনি মামলা দায়ের করলেও এজাহারভুক্ত আসামিদের কাউকেই চেনেন না এবং কোনো আসামির বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত অভিযোগও নেই। হানিফ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যাত্রাবাড়ী থানায় যাওয়ার পর পুলিশের একজন কর্মকর্তা তড়িঘড়ি করে মামলার কাগজে জোর করে আমার স্বাক্ষর নেন এবং আশ্বস্ত করেন, পরবর্তীতে নাম বাদ দেওয়া যাবে।”
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইব্রাহীম নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোনারগাঁ এবং ফতুল্লা থানায় দুটি ভিন্ন মামলা করা হয়েছে। সোনারগাঁ থানার মামলায় বাবা হানিফ বাদী হলেও ফতুল্লা থানায় একই ঘটনায় বাদী হয়েছেন অজ্ঞাত এক ব্যক্তি। আর এই জালিয়াতি মামলার খপ্পরে পড়েছেন সোনারগাঁর স্থানীয় সাংবাদিক এনামুল হক বিদ্যুৎ। তিনি ওই মামলার ২২১ নম্বর আসামি।
অন্যদিকে যাত্রবাড়ী থানায় দায়ের হওয়া মামলায় তিনি ২০৮ নম্বর আসামি। জানা গেছে, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সমঝোতা করে ইতোমধ্যে আদালত থেকে প্রায় ২০০ আসামির নাম প্রত্যাহার করার জন্য হলফনামা জমা দিয়েছেন হানিফ মিয়া। এসব নাম প্রত্যাহারের বিনিময়ে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলা বাণিজ্য শুধু সাধারণ অপরাধী চক্রেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির কর্মকর্তাও জড়িত। এ বিষয়ে অকাট্য তথ্যপ্রমাণও মিলেছে। ইব্রাহীম হত্যায় যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আশরাফুজ্জামান। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলা থেকে একজন আসামির নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন।
এমন একটি সুপরিকল্পিত জালিয়াতি ধরা পড়ে মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা ফাতেমা হত্যা মামলায় (৬২/২/২৫)। ফাতেমার স্বামী সুমন ওই মামলার বাদী। তিনি দাবি করেন, তার স্ত্রী ফাতেমাকে বছিলা ব্রিজের নিচে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং লাশ ঢাকার আশুলিয়ার ইয়ারপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
সরেজমিন আশুলিয়ার ইয়ারপুর কবরস্থান কমিটির সভাপতি ফারুক এই প্রতিবেদকে জানান, সেখানে ফাতেমা নামের কোনো নারীকে কবরস্থ করা হয়নি। এছাড়া সেখানে বহিরাগতদের দাফন করার সুযোগ নেই। সরকারি জুলাই গেজেট এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় জুলাই মাসে নিহত ২৩ ব্যক্তির তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেখানে কোনো নারীর নাম নেই, নিহতদের সবাই পুরুষ। মূলত অর্থের প্রলোভনে পড়ে সুমন নামের ওই ব্যক্তি ‘বাদী’ সেজেছিলেন। কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগে মামলা হচ্ছেÑ সে ধারণাও তার ছিল না। জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পর থেকে কথিত বাদী সুমন এখন বাসাবাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের হওয়া এক মামলায় (সিআর-৭৮৪/২০২৫) ৩৪৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির আইনজীবী ব্যারিস্টার সরোয়ার হোসেনকে ‘ঢাকা দক্ষিণ মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা’ সাজিয়ে আসামি করেন বাদী ছিনোরা বেগম। ছিনোরা বেগম টেলিফোনে এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেন, অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে জামায়াতের এক লোক তার স্বাক্ষর নিয়ে এই মামলা করিয়েছেন, যদিও প্রতিশ্রুত কোনো টাকাই তিনি পাননি।
একইভাবে উত্তরা পশ্চিম থানার এক মামলায় (সিআর মামলা নং-৪৫/২৪) ৩৬২ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকশ মানুষকে আসামি করা হয়েছে, যাদের সিংহভাগই দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী। অথচ ঘটনার দিন ও সময়ে বাদী মকবুল হোসেন নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না বলে তথ্যপ্রমাণ মিলেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আসাদ বিন রনি এই মামলা বাণিজ্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “একটি স্বার্থান্বেষী অপরাধী চক্র আমাদের ভাইদের পবিত্র রক্ত ও মহান ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে নিজেদের উপার্জনের হাতিয়ার বানিয়েছে। সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব জালিয়াতি চক্রের বিচার হওয়া উচিত।”
এসব মামলা বাণিজ্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক।
তিনি বলেন, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে বাণিজ্যের হাতিয়ার বানিয়ে অপরাধী চক্র সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে। মিথ্যা মামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। রাষ্ট্রকে অবিলম্বে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
গণঅভ্যুত্থানের মামলা বাণিজ্যে পুলিশ কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এএইচএম শাহাদাত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মামলা বাণিজ্য বা এজাহার নিয়ে অনৈতিক বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তা বা বহিরাগত চক্রের কেউ ছাড় পাবে না। বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’