× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশ বাড়লেও মিলছে না স্বস্তি

দিলীপ মজুমদার, কুমিল্লা

প্রকাশ : ৭ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৬ ঘণ্টা আগে

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক লোড বৃদ্ধির কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক লোড বৃদ্ধির কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকরের প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো কুমিল্লা বিভাগীয় বিতরণ এলাকাতেও বিদ্যুৎ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। 

তীব্র গরম, সেচ মৌসুম-পরবর্তী উচ্চ চাহিদা এবং জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনীয় সরবরাহ না পাওয়ায় কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

এমনকি শুধু কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১, ২, ৩, ৪-এর আওতাধীন প্রায় ২১ লাখ গ্রাহকের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, কৃষি উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষুদ্র শিল্প কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে কুমিল্লা অঞ্চলে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ১ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াটের মতো। 

এতে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি মোকাবিলায় ফিডারভিত্তিক রোটেশন পদ্ধতিতে লোডশেডিং করা হচ্ছে বলও জানায় সূত্রটি।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক লোড বৃদ্ধির কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি বেশি নাজুক।

গ্রামে গ্রামে দীর্ঘ লোডশেডিং

কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১, ২, ৩, ৪-এর আওতাধীন ১৭ উপজেলার গ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন।

বরুড়া উপজেলার গালিমপুর গ্রামের বাসিন্দা মাহবুবর রহমান আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাই না। সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।

“অভিযোগের নম্বরে ফোন করলেও আমাদের অভিযোগ কেন্দ্র  ‘একবাড়ীয়া’ সাবসেন্টারের সংশ্লিষ্টরা ফোন রিসিভ করেন না বললেই চলে।”

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এলাকায় (চান্দিনা, দেবীদ্বার, মুরাদনগর ও বরুড়া) রাতের চাহিদা প্রায় ১৬৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ ঘাটতির কারণে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মহাব্যবস্থাপক মো. রাশেদুজ্জামান জানান, গত কাল ৪ জুন তীব্রগরমে আমার এলাকায় ১৬০ এর স্থলে সর্বোচ্ছ ১৬৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ডিমান্ড ছিল। এ অবস্থায় আমাকে বিকের ৩ টার দিকে ৩ঘন্টা লোড শেডিং দিতে হয়েছে।

কুমিল্লা শহরের দেবপুর একটি বিকল গ্রিড রয়েছে। ঈদের আগে এটি পরিবর্তনের কথা  থাকলেও তা সম্ভব হয়নি, এটি ঠিক করা হলে গ্রাহকদের ভোগান্তি হবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সমিতি-২ এলাকায় (আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, লালমাই ও চৌদ্দগ্রাম) চাহিদা ১৫০ থেকে ১৬০ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১২৫ থেকে ১৩৫ মেগাওয়াট। ফলে তুলনামূলক কম হলেও নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।

সমিতি-৩ এলাকায় (দাউদকান্দি, হোমনা ও মেঘনা) ১৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে ১১২ মেগাওয়াটে। 

অন্যদিকে সমিতি-৪ এলাকায় (লাকসাম, মনোহরগঞ্জ ও নাঙ্গলকোট) ৮০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ফলে এসব এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা সবচেয়ে বেশি।

লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোট  নিয়ে  সমিতি-৪ এর জি এম মো. শহীদউদ্দীন জানান, তার এলাকায় বিদ্যুৎ ডিমান্ড ৬৫-৭৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত, এখানে ঈদের পর থেকে কোন লোডশেডিং নেই। 

কৃষি ও শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব

বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেচনির্ভর কৃষি, মৎস্য খামার, হিমাগার, রাইস মিল, ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ, ছোট কারখানা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

নাঙ্গলকোটের এক ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তা জানান, দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে সেচ কার্যক্রম ও কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

শহরে তুলনামূলক স্বস্তি

অন্যদিকে কুমিল্লা শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

বিপিডিবি সূত্রে জানা যায়, ক্যান্টনমেন্ট, শাসনগাছা, রানীর বাজার, পুলিশ লাইন, ফৌজদারি, চকবাজার, কান্দিরপাড় ও টমছমব্রিজ কেন্দ্রিক তিনটি ডিভিশনে বিদ্যুতের চাহিদা ১১০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট।

এ অঞ্চলে সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে ভারতের ত্রিপুরা থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ থেকে। আন্তঃদেশীয় সংযোগ লাইনের মাধ্যমে জাঙ্গালিয়া সাবস্টেশনে যুক্ত হয়ে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রবাহ নিশ্চিত হওয়ায় শহরাঞ্চলে সংকট তুলনামূলক কম অনুভূত হচ্ছে বলেও জানায় সূত্রটি।

এর  পাশাপাশি সন্ধ্যা ৭টার পর ব্যবসা-বাণিজ্যের কার্যক্রম কমে যাওয়ায় রাতের দিকে শহরে বিদ্যুতের চাপও কিছুটা হ্রাস পায়।

বিল বাড়ছে, সেবা নিয়ে প্রশ্ন

সরকারের বিদ্যুতের মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। 

গ্রাহকদের অভিযোগ, একদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে নিয়মিত বিদ্যুৎ না পেয়ে তাদের বাড়তি আর্থিক ও মানসিক চাপ সহ্য করতে হচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেবার মান নিশ্চিত না করে শুধু মূল্য বৃদ্ধি করলে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে। বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের সংকট ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের তাগিদ

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট কেবল উৎপাদন ঘাটতির ফল নয়; বরং গ্রিড সীমাবদ্ধতা, বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাব।

দ্রুত নতুন সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ, আঞ্চলিক সাবস্টেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

তাদের মতে, গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি মূল্য আদায়ের আগে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে কুমিল্লা অঞ্চলের লাখো গ্রাহকের প্রধান প্রশ্ন—‘বিল বাড়লেও বিদ্যুৎ কবে স্বাভাবিক হবে?’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা