ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও কবির হোসেন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদুল আজহার ছুটির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সচিবালয়। দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকা এটি। এর ভেতরেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের ‘রেড টেলিফোনের’ তার কেটে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো নীরবে অনুসন্ধান চালায়। এর মধ্যে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সচিবালয়ে এক আউটসোর্সিং কর্মী ও ভাঙারি ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। তবে এই চুরির পর সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। চক্রের মূল হোতাদের ধরতে মাঠে নেমেছেন গোয়েন্দারা।
তবে ঘটনাটিকে শুধু একটি সাধারণ চুরি হিসেবে দেখছেন না নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, এটি দেশের প্রশাসনিক নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতার একটি উদ্বেগজনক ইঙ্গিত হতে পারে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঘটনার সময়সীমা নির্ধারণে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঈদের দীর্ঘ ছুটির সময়ে কারা সচিবালয়ে প্রবেশ করেছিলেন, কোন কোন এলাকায় চলাচল করেছিলেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সিটিটিসি সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোন সংযোগের তার চুরির ঘটনায় বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় মামলা করে। মামলা দায়েরের পর ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনার গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা বিবেচনায় সিটিটিসির সিটি ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগ ছায়াতদন্ত শুরু করে।
গোপন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে সচিবালয়ে আউটসোর্সিং কর্মী রঞ্জন চন্দ্রকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে রঞ্জন চন্দ্র স্বীকার করেন, গত ২২ মে সচিবালয়ের ৩ নম্বর ভবন থেকে তিনি তার চুরি করেন। পরে ১ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশে হলের সামনে একটি ভাঙারি দোকানে প্রতি কেজি ৬০০ টাকা দরে মোট ৮ কেজি ২০০ গ্রাম তামার তার বিক্রি করেন।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ঢাবির একুশে হলের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী রেজাকুল ইসলামকে (৩২) গ্রেপ্তার করা হয়।
তার দেখানো তথ্যমতে, চকবাজার থানার ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের হোসেনি দালান রোডে একটি ভাঙারির গুদাম থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোন সংযোগের চুরি যাওয়া তামার তার উদ্ধার করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরির ঘটনায় গত ১ জুন শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাজিম হায়দার।
জিডিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সচিবালয়ের পুরনো ১ নম্বর ভবন থেকে নতুন ১ নম্বর ভবন পর্যন্ত স্থাপিত টেলিযোগাযোগের কপার ক্যাবল অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা কেটে ফেলেছে। এই ক্যাবলের মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের রেড টেলিফোনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন সংযোগ সচল রাখা হতো। ঈদ-পরবর্তী ছুটি শেষে কর্মচারীরা অফিসে এসে টেলিফোন লাইনগুলো বিকল অবস্থায় দেখতে পান। পরে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ভবনের ছাদ ও সংযোগ লাইনের বিভিন্ন স্থানে কপার ক্যাবল কাটা রয়েছে। এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দাপ্তরিক যোগাযোগ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িতদের শনাক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদুল আজহার ছুটির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, প্রয়োজনীয় তারের একটি অংশ অনুপস্থিত। এতে পুরো সংযোগ অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রায় ৭ ঘণ্টার চেষ্টার পর বিটিসিএলের প্রকৌশলীরা সংযোগ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা উইংয়ের তত্ত্বাবধানে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান শুরু করে।
এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, এই রহস্য উদঘাটন করতে পেরেছি। এ ঘটনার প্রথম দিন থেকেই আমাদের তদন্ত অব্যাহত ছিল। সংশ্লিষ্ট রঞ্জন চন্দ্রকে গ্রেপ্তার করেছি। ৮ কেজি তার উদ্ধার করা হয়েছে ভাঙারির দোকান থেকে, যেখানে তার বিক্রি করেছিল রঞ্জন। ভাঙারির দোকান মালিককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা প্রত্যকটি অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেব।
যেভাবে ঘটল ঘটনা
প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রবেশ ও চলাচলের ক্ষেত্রে বহুস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ যোগাযোগ লাইনের মতো স্পর্শকাতর অবকাঠামোয় হাত পড়ল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সচিবালয়ে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। বিশেষ অনুমতিতে অনেকেই প্রবেশ করেন সচিবালয়ে। ফলে দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ আগের তুলনায় জটিল হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, ঈদের ছুটির সময় ভবনগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য কম থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কিছু অংশ তুলনামূলক দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
আগুনের পরও কেন নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে এটি প্রথম বিতর্ক নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। তদন্তের স্বার্থে দর্শনার্থী প্রবেশে কঠোরতা আরোপ, নিরাপত্তা অবকাঠামো আধুনিকীকরণ এবং ওই ভবনের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে সাময়িকভাবে অন্যত্র স্থানান্তরের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর দাবি করা হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, কাগজে-কলমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হলেও বাস্তবে এখনও কিছু দুর্বলতা রয়েই গেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দীন এ বিষয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থার রেড টেলিফোনের তার চুরির ফলে তা অকার্যকর হয়ে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। এটি নিছক একটি তার চুরির ঘটনা নাকি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা যাচাইয়ের কোনো প্রচেষ্টাÑ তদন্তে সেটি স্পষ্ট করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যোগাযোগ অবকাঠামোকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে এ ধরনের ঘটনায় শুধু অপরাধী শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়, কীভাবে ঘটনাটি ঘটল, সেটিও বিশ্লেষণ করা জরুরি।’
এ বিষয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুর মোহাম্মদ মনে করেন, তদন্তে প্রযুক্তিগত ও মানবিকÑ দুই দিকই সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘সাধারণ কোনো সরকারি ভবনে তার চুরির ঘটনা এক ধরনের বিষয়, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষ যোগাযোগ লাইনের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশ্ন হচ্ছে, ঘটনাটি ঘটার আগে কোনো সতর্কসংকেত ছিল কি না এবং নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থেকে কেউ সহযোগিতা করেছে কি না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাঠে নেমেছে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। সেগুলো হচ্ছেÑ টেলিফোনের তারটি ঠিক কোন সময় অপসারণ করা হয়েছে, ঘটনাস্থলের আশপাশে কারা প্রবেশ করেছিলেন, সিসিটিভি ফুটেজে কোনো সন্দেহজনক গতিবিধি ধরা পড়েছে কি না, এটি পরিকল্পিত নাশকতা নাকি অভ্যন্তরীণ অবহেলার ফল। পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণে কোনো ব্যত্যয় ঘটেছিল কি না?
তার চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সচিবালয় প্রাঙ্গণে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করায় নিরাপত্তা মানদণ্ড পুনর্মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।