আবহাওয়া ভবন। ফাইল ছবি
বাইরে বের হলেই তীব্র রোদে চামড়া যেন পুড়ে যাচ্ছে, আর ঘরে থাকলেও ঘাম ঝরছে অবিরাম। মে মাসের শেষ ভাগ থেকে জুনের শুরুতে দেশের আবহাওয়ায় এমন বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের আবহাওয়া বিষয়ক প্রতিষ্ঠান বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এর পেছনে প্রধান কারণ এল নিনোর প্রভাব, যা চলতি বছর আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা মনে করেন, এটি সুপার এল নিনোর রূপধারণ করতে পারে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩১ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। অথচ বর্ষা মৌসুম শুরু হলেও জুন-আগস্ট সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে।
১ জুন প্রকাশিত এক মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জুনে দেশে ৩ থেকে ৫টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে ২ থেকে ৩টি মৌসুমি নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময়ে ১০ থেকে ১৫ দিন বজ্রঝড় এবং ৮ থেকে ১০ দফা মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দিনাজপুরে, ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় ছিল ৩৬ দশমিক ৭, রাজশাহীতে ৩৭ দশমিক ৫, রংপুরে ৩৭ এবং খুলনায় ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রায় সব বিভাগেই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি বা তার বেশি রয়েছে।
রংপুর অঞ্চলে দাবদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছেন। তীব্র গরমে জ্বর, সর্দিকাশি ও পেটের রোগ বাড়ছে। শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছে।
রংপুর সামাজিক বন বিভাগের সাবেক রেঞ্জ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় গাছপালা কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ইকো ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সঞ্জয় চৌধুরীর মতে, দাবদাহ মোকাবিলায় শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, গাছের যথাযথ পরিচর্যাও জরুরি।
বগুড়াতেও তাপপ্রবাহে জনদুর্ভোগ বেড়েছে। নির্মাণশ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। রোদে কাজ করতে গিয়ে শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ভ্যানচালক শাহজাহান আলী জানান, দুপুরের গরমে রাস্তায় থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ বলেন, যে সময়ে গরম পড়ার কথা ছিল, তখন হয়েছে ভারী বৃষ্টি। আবার বর্ষাকালে দেখা দিচ্ছে দাবদাহ। এর পেছনে এল নিনোর প্রভাব ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। তিনি আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষা দেরিতে আসার প্রবণতা আগে থেকেই ছিল, এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এল নিনো।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যা সাধারণত প্রতি ২ থেকে ৭ বছর পর পর দেখা দেয় এবং ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। এর ফলে বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহের ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়ে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হয়।
এদিকে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করে বলেছে, এল নিনো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব আরও তীব্র করতে পারে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিউ গুতেরেস একে উষ্ণায়ন বিশ্বের আগুনে জ্বালানি ঢেলে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এল নিনো সরকার, মানবিক সংস্থা এবং কৃষি, স্বাস্থ্য, শক্তি এবং জল ব্যবস্থাপনার মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল সেক্টরগুলোর জন্য বিশ্বের সবচেয়ে প্রামাণিক উৎস। এল নিনো বিশ্ববাসীকে জরুরি জলবায়ু সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এল নিনোর প্রভাবগুলো আরও শক্তভাবে আঘাত করবে, আরও দূরে ভ্রমণ করবে এবং বিধ্বংসী গতিতে সীমানা অতিক্রম করবে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্যসহায়তা করেছেন রংপুর ও বগুড়া প্রতিবেদক