বিশ্লেষকরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্ধের দিনে বস্তিতে আগুন দেওয়ার কারণ ওই সময় বস্তিতে মানুষজন থাকে না বললেই চলে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে টানা সাত দিনের সরকারি ছুটি শুরু হয় গত ২৫ মে। ঠিক ওইদিন সন্ধ্যায়ই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে মিরপুরের কালশি বস্তিতে।
পানির তীব্র সংকটের কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো বস্তিতে। পুড়ে যায় তিনশ ঘর।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর বস্তিবাসী অভিযোগ করেন, স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার ইন্ধনে দখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে বস্তিতে আগুন লাগানো হয়েছে।
শুধু এই অগ্নিকাণ্ডই নয়, গত ছয় বছরে ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে ৭০৩ বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুন লাগার এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২১ জন, আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৯৩ জন।
সবগুলো ঘটনাই ঘটেছে সরকারি ছুটির দিন অথবা গভীর রাতে। বস্তি দখলের উদ্দেশ্যে এমন সময় বেছে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এসব অগ্নিকাণ্ড ঘটানো হয় বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্ধের দিনে বস্তিতে আগুন দেওয়ার কারণ ওই সময় বস্তিতে মানুষজন থাকে না বললেই চলে। বেশিরভাগ বস্তিবাসী ঘরে তালা দিয়ে বাইরে বেড়াতে কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছে যান। জনশূন্য বস্তিতে আগুন ছড়িয়ে পড়লেও তাৎক্ষণিকভাবে তা নেভানো কিংবা জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলার কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় না বস্তিবাসীদের পক্ষে। ফিরে এসে তারা দেখতে পান, অধিকাংশ ঘরই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই বস্তিতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকে না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পেশাদার অপরাধীরা দ্রুত বস্তিতে আগুন দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। এই আগুন দেওয়ার কাজে একটা ম্যাচই যথেষ্ট। এজন্যও অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের চিহ্নিত করা যায় না।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “বস্তিতে বারবার আগুন লাগার ঘটনাগুলোকে শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব আগুনের পেছনে কারা লাভবান হতে পারেন, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
“কারণ বস্তি পুড়ে যাওয়ার পর দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট জমি বা এলাকা ঘিরে নতুন করে উন্নয়ন, বাণিজ্যিক ব্যবহার বা দখল-সংক্রান্ত আলোচনা শুরু হয়। স্বাভাবিক কারণেই জনমনে এসবের উদ্যোক্তাদের ঘিরে সন্দেহ দেখা দেয়।”
তিনি বলেন, “যদি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহলকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়, তাহলে সেটি প্রচলিত তদন্তে সবসময় প্রমাণ করা সহজ হয় না।
“অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটনাগুলো বৈদ্যুতিক ত্রুটি, অসাবধানতা বা দুর্ঘটনা হিসেবেই নথিভুক্ত হয়ে যায়। তাই শুধু আগুনের উৎস নয়, আগুনের পর কারা লাভবান হচ্ছেÑ সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে।”
ড. তৌহিদুল হক বলেন, “রাজধানীর অনেক বস্তি একসময় কম মূল্যমানের জমিতে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু নগরায়ণ ও জমির মূল্য বৃদ্ধির কারণে এখন সেসব জায়গা অত্যন্ত দামি হয়ে উঠেছে।
“ফলে বিভিন্ন সময় এসব জমির ওপর প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের আগ্রহ তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।”
তিনি বলেন, “বস্তিকে শুধু দরিদ্র মানুষের আবাসন হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। এসব এলাকা ঘিরে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ঘরভাড়া, পরিবহনÑ এমনকি বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমেও বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়। ফলে বস্তির নিয়ন্ত্রণ ও জমির মালিকানা ঘিরে নানা ধরনের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।”
তার মতে, “শুধু অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান নয়, প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট জমির ব্যবহার, মালিকানা পরিবর্তন, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং কারা লাভবান হচ্ছেÑসেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। তাহলেই প্রকৃত চিত্র অনেক বেশি স্পষ্ট হবে।”
বারবার আগুন জ্বলে কালশী বস্তিতে
মিরপুর-১১ ও ১২ নম্বরের মাঝামাঝি কালশী রোডের পাশে বাউনিয়াবাদ এলাকায় কালশী বস্তির অবস্থান। এক সময় এই এলাকাটি জলাভূমি ও ডোবা-নালাবেষ্টিত থাকলেও, বর্তমানে আশপাশের এলাকায় নগরায়ণের ছোঁয়া পেয়েছে। কালশী বস্তির ঠিক পাশেই রয়েছে ইসিবি চত্বর, যা আধুনিক ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাব হিসেবে বিকশিত হয়েছে।
১৯৭১ সালের শেষ দিকে আটকে পড়া পাকিস্তানি ও বিহারিদের জন্য ছোট ছোট টিনের ঘর নির্মাণের মধ্য দিয়ে এই বস্তির যাত্রা শুরু হয়। পরে নিম্ন আয়ের মানুষের পছন্দের আবাস হয়ে ওঠে এই কালশী বস্তি। তবে সময়ের পরিক্রমায় এ জমির চাহিদা বেড়েছে। সেই চাহিদা থেকে প্রায়ই এই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সবশেষ গত ২৫ মে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় বস্তির ৩০০ ঘর। নিঃস্ব হন বস্তির সাড়ে ৩ হাজার বাসিন্দা।
কালশী বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর বস্তিবাসী অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন থেকেই পরিকল্পিতভাবে কালশী বস্তি উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে। সে কারণে এখানে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
এর আগে ২০১৫ সাল, ২০১৭ সাল ও ২০১৯ সালেও এখানে তিনবার আগুন দেওয়া হয়। সে সময়ও এ বস্তির অনেক ঘর পুড়ে যায়। সম্প্রতি বস্তির জমি একটি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। মধ্যস্থতার কাজটি করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীরা। তাদের ইশারায় বস্তিতে আগুন লাগলেও পথে যানজট করে আগুন নেভানোর গাড়ি আসতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। পাশাপাশি পানি সরবরাহেও কৌশলে বাধা দেয়া হয়।
এ কারণে কালশী বস্তিতে ২ ঘণ্টার আগুনে ৩০০ ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বস্তিবাসী এক নারী সরাসরি স্থানীয় এক রাজনীতিকের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেন, ৮০০ কোটি টাকায় বস্তির জমি বিক্রি করে দিতে পরিকল্পিতভাবে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
একই কারণে আগুন অন্য বস্তিগুলোতেও
কড়াইল ও ভাষানটেক বস্তির বাসিন্দাদের অভিযোগ, দখল বাণিজ্যের কারণে তাদের বস্তিতেও একইভাবে বারবার আগুন দেওয়া হচ্ছে। ২০০৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর অন্য একটি পক্ষ বস্তির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষ্যে দুই বস্তিতেই আগুন দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব বস্তি ঘিরে মাদক, বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ, পানি ও গ্যাসের লাইন থেকে মাসে কয়েক কোটি অবৈধ টাকা হাতবদল হয়ে থাকে। এসব টাকার ভাগবাটোয়ারা ও বস্তির নিয়ন্ত্রণ নিতেই বারবার বস্তিতে আগুন দেওয়া হয় বলে বস্তির একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান। তাদের মতে, এর পেছনে রয়েছে সরাসরি রাজনৈতিক ইন্ধন।
ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একসময় কল্যাণপুর, বেগুনবাড়ি, লালবাগের শহিদনগর ও আগারগাঁও বস্তিতে প্রায়ই আগুনের ঘটনা ঘটত। ধীরে ধীরে ওই বস্তি থেকে লোকজন সরে যাওয়ার পর এখন সেখানে সরকারি ও বেসরকারি বড় বড় স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এখন আর সেখানে আগুনের ঘটনা ঘটছে না। সম্প্রতি কড়াইল, কালশী ও ভাষানটেকে আগুনের ঘটনা ঘটছে। এর পেছনেও কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তা সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাকে খতিয়ে দেখা উচিত। সক্ষমতা ঘাটতির কারণে ফায়ার সার্ভিসের সদিচ্ছা থাকলেও এগুলো বের করা সংস্থাটির জন্য কঠিন। যে কারণে অনেক আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি সঠিকভাবে তদন্তও করতে পারে না। বেশিরভাগ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি সুপারিশ করেই দায়মুক্তি নেয়।
অনিশ্চয়তায় বঙ্গবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা
২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল ভোরে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে বঙ্গবাজারে। এ সময় ফায়ার সার্ভিসের ৫০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কত ব্যবসায়ীর এবং কত টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার সঠিক তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
তবে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন সে সময় সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছিলেন, আগুনে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার দোকান পুড়ে আনুমানিক দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ঘটনার একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, মার্কেটের একটি স্থান থেকে সন্দেহজনক দুজন যুবক সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবাজারে আগুন দেওয়া হয়েছে। সরকার বঙ্গবাজারে নতুন করে শপিংমল তৈরি করছেন। বলা হয়েছে, নির্মাণ শেষ হওয়ার পর তা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের বরাদ্দ দেওয়া হবে। যদিও তা প্রকৃত ব্যবসায়ীরা পাবেন কি না, তা নিয়ে এরই মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পরিসংখ্যান
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ছয় বছরে সারা দেশের বস্তিতে মোট ৭০৩ বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৯১টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫ জন, আর প্রাণ হারিয়েছেন একজন।
তার আগের বছর বস্তিতে ৮৪টি অগ্নিকাণ্ডে ৪ জন গুরুতর আহত হন। ২০২৩ সালে ১৯৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত হন একজন, আর গুরুতর আহত হন ১২ জন।
২০২২ সালে বস্তিতে আগুনের সংখ্যা কিছুটা কম হলেও হতাহতের ঘটনা বেড়েছিল। সে বছর বস্তিতে ২১টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৬ জন প্রাণ হারান, গুরুতর আহত হন ২৯ জন।
২০২১ সালে ১৯৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১ জন নিহত এবং ১০ জন আহত হন।
২০২০ সালে বস্তির আগুনে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সে বছর বস্তিতে ১০৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ৩৩ জন আহত হন।
সব মিলে ছয় বছরে বস্তির আগুনে ক্ষতি হয়েছে ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯১ টাকা।
অসচেতনতার কারণেই বস্তিতে বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে মনে করেন ফায়ার সার্ভিস মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার।
তিনি বলেন, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের ধারণা, বস্তির আগুন পরিকল্পিতভাবে দেওয়া হয়ে থাকে। বস্তিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানহীন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়, অদক্ষ লোক দিয়ে গ্যাস এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হয়। এসব কারণে এখানে আগুনের ঝুঁকি অনেক বেশি। বস্তিগুলোতে অনেকেই খোলা বাতি ব্যবহার করে, মশার কয়েল ব্যবহার করে, বিড়ি-সিগারেট টানার পর যেখানে সেখানে ফেলে দেওয়া হয়।
“এসব কারণেও বস্তিতে অনেক সময় আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গেলেও অনেক সময় প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। যেমন লোকজন সহযোগিতা করার কৌশল বুঝতে না পেরে উল্টো উদ্ধার অভিযানে ব্যাঘাত ঘটায়। আবার প্রয়োজনীয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় না। এসব সমস্যার কারণে বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে বেশি সময় লাগে।”